বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে
মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে
দেবদত্তা ব্যানার্জী
একটু শীতলতার খোঁজে
গরমের ছুটির শুরুতেই আমরা প্রতিবার পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেই একটু শীতলতা খোঁজে। বহু আলাপ আলোচনার পর ঠিক হল এবার যাবো একটু অফ রুটে, পান্ডবরা যে
পথে স্বর্গে গেছিল, সেই মহাপ্রস্থানের পথে বদ্রীনাথ, যদিও মুল আকর্ষণ আউলি। গাড়োয়াল হিমালয়ের এই অঞ্চলের শোভা অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু এ অঞ্চলটি তীর্থ যাত্রীদের সমাগম সবচেয়ে বেশি বলেই আমি এদিকটা এড়িয়েই চলেছি এতদিন। এবারেও বদ্রীনাথ যাবো শুনে অনেকেই বলল বাচ্চাদের নিয়ে তীর্থের পথে!! এ পথে নাকি আমিষ আহার পাওয়া যায় না। এমনকি ডিম ও নেই। কিন্তু প্রকৃতির স্বাদ নিতে গেলে এসব যে তুচ্ছ। পাহাড়, নদী, বরফ, আর গ্লেসিয়ারের ডাক আমি শুনতে পাচ্ছিলাম যেন। তাই সব ভুলে জয় বদ্রী বিশাল বলে বেরিয়ে পড়লাম।
এই মহাপ্রস্থানের পথ যে এতো সুন্দর গাড়োয়াল হিমালয় না ঘুরে এলে বুঝতেই পারতাম না।
উত্তরাখণ্ডের একটা বিশাল অঞ্চল এই গাড়োয়াল হিমালয়। আমাদের ভ্রমণটা ঠিক তীর্থ যাত্রা নয় প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ আহরণ বলে একটি অন্যরকম করে সাজিয়ে নিয়েছিলাম। পুরো গাড়োয়াল এই কদিনে হবে না। আর বাচ্চাদের নিয়ে
হেঁটে তীর্থ করতেও অপারগ। একটু অফ রুটে বদ্রী আর আউলি চললাম অবশেষে।
দিল্লী থেকে প্রথম গন্তব্য ছিল কোট দ্বার। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট সুন্দর ছিমছাম শহর কোট দ্বার। রাতে চড়ে বসেছিলাম মুসৌরী এক্সপ্রেসে। নাজিবাবাদে ট্রেনের কয়েকটা কামরা কেটে নিয়ে পার্বত্য উপত্যকায় পা রাখে এই ট্রেন। বাকি ট্রেন চলে যায় দেরাদুনের পথে। ভোরবেলায় ঘুম চোখে উঠে দেখি ট্রেন পৌঁছে গেছে কোট দ্বারে। স্টেশনের একপাশে অমল তাস ফুলের গাছটা হলুদ ফুলে সেজে উঠেছে। ছিমছাম দুটো রিটেয়ারিং রুম রয়েছে। সামনে ফুলে ফুলে সাদা বেলি ফুলের ঝাড়। তবে রিটেয়ারিং রুম অনলাইন বুকিং হয় এবং খালিও নেই, তাই বলে পেলাম না। অবশ্য আমাদের জন্য ভোর বেলাতেই গাড়ি নিয়ে হাজির ছিল প্রেম ভাই। প্রথম গন্তব্য ল্যান্স ডাউনের পথে হোটেল করবেট হিল রিসোর্ট। প্রেম ভাই কিন্তু পেশায় ড্রাইভার নয়। ওঁর ট্রাভেলিং এজেন্সি রয়েছে। অনেক গুলো গাড়ি ড্রাইভার দিয়ে চলে এ পথে। যে ড্রাইভারের আমাদের ঘোরাবার কথা তার কেউ মারা গেছে বলে গত রাতে সে গ্ৰামে চলে গেছে হঠাৎ। বাকি সব গাড়ি ভাড়া খাটছে। তাই উনি নিজের পার্সোনাল গাড়িটি নিয়েই আমাদের রিসিভ করতে এসেছিলেন। এক রাতের মধ্যে বিশ্বস্ত ড্রাইভার পাননি । ফুল সিজিন। তাই নিজেই এসেছেন।কারণ আমরা অতিথি, আর অতিথি নারায়ণ।তবে কোট দ্বারে থেকেও উনি রুদ্র প্রয়াগের পর আর যাননি কোথাও। চার ধামের এতো কাছে থেকেও ঘোরেননি।
একটু ঘাবড়ে গেছিলাম। উনি তবে ঘোরাবেন কি করে ? তারপরেই মনে হল রুট তো আমার মুখস্থ। ম্যাপ রয়েছে মাথায়। অসুবিধা কি? আর কি কি ঘুরবো সেটা উনিও জানেন।
স্টেশন ছেড়ে বেরিয়েই ছোট্ট বাজার পার করেই খো নদীর পাশ দিয়ে পাকদণ্ডী পথ উঠে গেছে উপর দিকে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছি প্রেম ভাই আমাদের নিয়ে চলল। খো নদীর কোথাও পায়ের পাতা ভেজা জল, কোথাও বা হাঁটু জল। এ পথে নাকি যখন তখন হাতি বার হয়। খো নদীতে জলকেলিও করতে দেখা যায় হাতিদের। উনি দুদিন আগেও দেখেছেন।এছাড়া ময়ূর, হরিণ এসব তো রয়েছে। বেশ কিছু সুন্দর পাখি চোখে পড়ছিল পথের ধারে।
মে মাসে পাহাড় সেজে উঠেছে ফুলে ফুলে। এক ধরনের বেগুনি ফুলের গাছ একটু দূরে দূরেই রয়েছে। অনেকটা রাধাচূড়ার মত ফুলগুলো। পাতা চোখেই পড়ে না এতো ফুল গাছে। প্রেম ভাই বললেন নীলকণ্ঠ ফুল, জ্যাকারেণ্ডা নামেই সবাই চেনে অবশ্য।বেশ কিছু সুন্দর রিসোর্ট রয়েছে এ পথে, করবেট হিল রিসর্ট ও ল্যান্স ডাউনে ঢোকার বেশ কিছুটা আগেই। সেই নীলকণ্ঠ ফুলে ছাওয়া রিসর্ট।
কিন্তু পৌঁছে জানলাম ওদের চেক ইন টাইম দুপুর একটা এবং আপাতত রিসর্ট ফুল। তাই ঘর পেতে একটা বাজবে। কিন্তু ম্যানেজার ছেলেটি হয়তো আমার বাচ্চা দুটো দেখেই একটা সাধারণ মানের ঘর আমাদের খুলে দিল ফ্রেশ হওয়ার জন্য। ততক্ষণে ছেলে মেয়ে ওদের লনের ধারে ছোট্ট পার্কে দোলনা পেয়ে মেতে উঠেছে। খরগোসের পিছনে ছুটছে আমার মেয়ে। আর ওদের বাবা ক্যামেরা হাতে নেমে পড়েছে পাখি শিকারে। চারদিকের অসাধারণ সৌন্দর্য নাম না জানা কত ফুলের মেলা। কিন্তু আমাদের হাতে যে সময় কম। ল্যান্স ডাউন শহরটা ঘুরে দেখতে হবে। তাই তাড়া দিয়ে সবাইকে রেডি করে জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ি পথে সবচেয়ে ভালো খাবার আলুপরাঠা যা আমাদের নিত্যসঙ্গী হতে চলেছে।
পাইনবনের ফাঁকে সবুজ পাহাড় ডাকে
ল্যান্স ডাউন ঢোকার আগে আমাদের প্রথম গন্তব্য তারকেশ্বর শিবের মন্দির। তীর্থ করতে না চাইলেও এ পথে অবশ্যই যাওয়া উচিত। ঘন পাইন বনের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা রডডেনড্রন ফুল পাপড়ি বিছিয়ে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাবে এ পথে। চারদিকের সবুজ পাহাড়ে নাম না জানা চেনা অচেনা পাখির ঝাঁক লুকোচুরি খেলবে সারাটি পথ । শতাব্দী প্রাচীন দেওদার গাছে ঘেরা মন্দিরের ঠিক বাইরে আছে কুণ্ড, স্নান করে পুণ্যার্থীরা মন্দিরে ঢোকেন পুজো দিতে। অসংখ্য ঘণ্টা শোভা পাচ্ছে চারপাশে। পাশে রয়েছে ভক্তদের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অতিথি নিবাস। মনোমুগ্ধকর পরিবেশে ট্রেন জার্নির ক্লান্তি ধুয়ে যায়। শুধু মন্দিরের বাইরে দেওদার গাছের ছায়ায় বসে পাখি দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যায় গোটা একটা দিন। বহু যুগের পুরানো গাছের গায়ে শ্যাওলার আস্তরণ। বনের ভেতর বাতাসের ফিসফিসানি পাখির ডাক আর মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি মিলেমিশে এক অন্যরকম অনুভূতি আনে।
এবার আঁকা বাঁকা চড়াই পথে গাড়ি ছুটে চলল কালুডাণ্ডা, গাড়োয়ালি ভাষায় যার অর্থ কালো পাহাড়। কি বলছেন? এটা আবার কোথায় ?
অতীতে এ নামেই পরিচিত ছিল ল্যান্স ডাউন। ১৮৮৭ সালে ভারতবর্ষের তদানীন্তন ভাইসরয় লর্ড ল্যান্স ডাউন এই অঞ্চলের প্রেমে পড়ে প্রথম এখানে একটি শহর গড়ে তোলেন, নাম বদলে ওঁর নামে হয় ল্যান্স ডাউন। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়োয়াল রেজিমেন্টের কেন্দ্র হয় এই শহর। পুরো শহরেই ছড়িয়ে আছে ব্রিটিশ স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। ঘন ওক আর পাইন বনের ফাঁকে দূরে দূরে রয়েছে পুরানো প্রচুর ব্রিটিশ বাংলো, এগুলি এখন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তাদের আবাসগৃহ। দুটি গির্জা আছে শহরে। সেন্ট মেরী গির্জা তৈরি হয় ১৮৯৫ সালে। স্বাধীনতার পরে এখানে তৈরি হয়েছে প্রাচীন ল্যান্স ডাউন সংক্রান্ত ছোট্ট এক মিউজিয়াম। সেন্ট জন গির্জা এখানকার একমাত্র চালু গির্জা। এটি তৈরি হয়েছে ১৯৩৬ সালে। দুটি গির্জারই স্থাপত্যশিল্প অপূর্ব, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ সৌন্দর্য যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া পাহাড়ের কোলে সিঁড়ি ভেঙে উঠে দেখা যায় সন্তোষী মাতার মন্দির। উপর থেকে নিচের দৃশ্য অসাধারণ। প্যারেড গ্ৰাউণ্ডে প্যারেড দেখে দেখতে পৌঁছে গেলাম দারোয়ান সিং যুদ্ধ-স্মারক মিউজিয়াম – গাড়োয়াল রেজিমেন্টের প্রথম ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রাপক দারোয়ান সিং নেগির নামে তৈরি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে গাড়োয়াল রেজিমেন্টের নানা স্মারক দ্রব্য অস্ত্র শস্ত্র, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কিছু ব্যবহৃত অস্ত্র রয়েছে ওখানে। পুরো শহরটাই খুব পরিষ্কার।
শহরের মাঝে ফুলে ফুলে সাজানো ছোট্ট লেক – ভুল্লা তাল, ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমেছে লেকের ধারে। রয়েছে বোটিংয়ের ব্যবস্থা। এক পাশে শিশুদের জন্য বিনোদনের পশরা সাজানো। তবে ল্যান্স ডাউনের হৃদয় হল টিপ এন টপ। গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের পর্যটন নিবাস রয়েছে এই পাহাড় চূড়ায়। কাঠের কটেজের পাশে পাশে ফুলে সাজানো বাগানে ক্যাম্প চেয়ারে বসে তুষার ধবল হিমালয়ের স্বাদ গ্ৰহন না করলে ল্যান্স ডাউন আসাই বৃথা। ওক, পাইনে ছাওয়া রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই ক্যাফেটেরিয়ায়। গরম মোমো, ম্যাগি কফি পকোরা সব কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। উপর থেকে দেখা যায় ল্যান্স ডাউন শহর আর দূরে পাহাড়ের পর পাহাড়ের স্তর পেরিয়ে বরফে ঢাকা নন্দা দেবীসহ বেশ কিছু শৃঙ্গ। ল্যান্স ডাউনে থাকতে হলে এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর নেই।
এছাড়া থাকার জন্য নানা মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে শহর জুরে। ল্যান্স ডাউন ঢোকার মুখেও বেশ বড় কয়েকটি হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে।
বিকেলে পাইন বনের মাঝে করবেট হিল রিসর্টের বাগানে যেন পাখির মেলা বসেছিল। সন্ধ্যায় পূর্ণিমার গোল চাঁদ উঠতেই পাহাড়গুলো নতুন রূপে সেজে উঠল। আশেপাশের পাহাড়ের গায়ে যেন হাজার চুমকির আলো। মায়াবিনী সে রাত মদির করে তোলে মনপ্রান।
পাহাড় চূড়ায় গহীন বনে সবুজের টানে
অরণ্যের সঙ্গীত যদি শুনতে চান, সবুজের গন্ধে যদি মেতে উঠতে চান তবে চলুন আমার সঙ্গে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য খিরসু, পাউরি থেকে তেরো কিমি দূরে গহীন বনের মাঝে খিরসুকে গাড়োয়ালের অরণ্য কন্যা বলাই যায়। সারাটি পথ পাইন ওক দেওদার যেন শত শত বাহু মেলে জানাচ্ছে সাদর আমন্ত্রণ। পথে গাড়ি খুব কম এবং রাস্তা অসম্ভব সুন্দর তবে
খুব সরু। সেই বেগুনি রঙের নীলকণ্ঠ বা জ্যাকারেণ্ডি ফুলের গাছ সারাটি পথ আমাদের সফর সঙ্গী। পাউরিকে বা হাতে রেখে এক সময় আমরা প্রবেশ করলাম গহীন অরণ্যে। আদিম এ অরণ্য দিনের বেলাতেও ছায়াঘন অন্ধকারে না জানি কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। সবুজের যে কত রকম শেড হয় আর বনের যে কত ধরনের গন্ধ হয় এ পথে না এলে জানাই যাবে না। বার্চ, উইলো, পাইন ছাড়াও রডডেনড্রন রয়েছে প্রচুর। মাঝে হঠাৎ জঙ্গল পাতলা হয়ে এলো, ছবির মত সুন্দর একটি গ্ৰাম, রডডেনড্রন ফুলের রসের সিরাপ ছাড়াও নানা রকমের আচারের পশরা সাজিয়ে বসেছে গ্ৰামবাসিরা পর্যটকদের জন্য। ওদের বানানো আচারের স্বাদ নিয়ে গাড়ি ছুটে চলল আরও ওপরে, সরু সে পথে উল্টোদিক থেকে গাড়ি এলেই পিছতে হয় জায়গায় জায়গায়। অথচ প্রেম ভাইকে হর্ন ব্যবহার করতে দেখছিলাম না খুব একটা। প্রশ্ন করতেই বলল আদিম অরণ্যে হর্ন ব্যবহার উচিত নয়। যে গাড়ি আসবে উল্টো পথে সে ও সাবধানেই আসবে। আমাদের সঙ্গে প্রেম ভাইয়েরও বেশ ঘোরা হয়ে যাচ্ছে। খিরসুর এতো কাছে থেকে উনি আগে আসেননি।
হঠাৎ উঠে এলাম পাহাড়ের মাথায়, সামনেই মেঘে আড়ালে একে একে সুমেরু, চৌখাম্বা, কামের, মানা পিক, কেদারনাথ আরও সব শৃঙ্গ সাদা বরফের চাদরে মোরা। ছোট্ট একটা বাজার পার করে হাসপাতাল। পাশেই গাড়োয়াল মণ্ডলের পর্যটক আবাস। সামনের সবুজ লনে বসেই মনে হয় কেটে যাবে জীবন।কি হবে আর কলকাতায় ফিরে? সত্যি কাগজ কলম পেলে কবি হয়ে যেতাম আমি। হিমালয়ের এমন প্যানোরামিক ভিউ এর আগে দেখেছিলাম চকৌরি থেকে। এ যেন আরও কাছে, হাত বাড়ালেই ছোঁওয়া যাবে। তবে আপাতত ছেড়া ছেড়া মেঘের আড়ালে চলছে লুকোচুরির খেলা। বাকি তিন দিকে গহীন বন। বেলা তিনটেতেই ঝিঁঝিঁ পোকার ঐকতান শোনা যাচ্ছে। গোটা কুড়ি পঁচিশটা ঘর নিয়ে গ্ৰামটি ক্যানভাসে আঁকা ছবি মত সুন্দর। আরও দুটো প্রাইভেট লজ রয়েছে। গাড়োয়াল মণ্ডলের পর্যটক আবাসের অতিথি তৎপর কর্মীরা আমাদের দেখেই গরমগরম রুটি, পনীর ভুজিয়া, মিক্স ভেজ আর আলুগোবি বানিয়ে দিল। মেয়ের জন্য ঝাল ছাড়া ডাল ফ্রাই আর ভাত ও এসে গেলো। পুরো ডাইনিং হলটাই কাচের বড় বড় জানালায় ঘেরা। ঐ নৈসর্গিক শোভার মাঝে বসে যেন মনে হল অমৃত খাচ্ছি।
যদিও আমাদের বুকিং ছিল কটেজ কিন্তু ম্যানেজার ঘুরিয়ে দেখাল লনের ওপর প্রান্তে কটেজ গুলো পাহাড়ের ঢালে। বড় বড় গাছের ডালে ও বাউণ্ডারী ওয়ালে ঢাকা পড়েছে তুষার শৃঙ্গ। তাই চাইলে আমরা মেইন বিল্ডিং এ থাকতে পারি। একই ভাড়া, এবং ঘর রয়েছে। আমরাও রাজি হয়ে উপরের ঘরে উঠে এলাম। মাঝে মাঝেই লনের ধারে ফুলের বাগানে উড়ে আসছে পাখি। আমার কর্তা আবার পাখির ফটোই বেশি তোলেন। কিছুক্ষণের ভেতর তাকে দেখলাম গাছপালার আড়ালে হারিয়ে গেলো। ছেলে মেয়ে হুটোপুটিতেই ব্যস্ত। এতো বড় লনে গড়িয়ে নিচ্ছে মাঝেমধ্যে।
-''ম্যাডাম জি কা'ফল লেঙ্গে? '' কচি গলার আওয়াজে তাকিয়ে দেখি দুটি দশ বারো বছরের আদিবাসী ছেলে মলিন বেশে একটা থলে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
-''ক্যায়া হ্যায় ....'' বলতেই আবার বলল 'কা'ফল'। এ নাম তো শুনিনি কখনো, খায় না মাথায় দেয় কে জানে !!
মায়ায় মাখা কচি মুখ দুটো দেখে বললাম -''দিখাও তো ক্যায়া ফল !! কাহা সে লায়া?''
হাজার বাতির রোশনাই ওদের মুখে। ব্যাগ থেকে এক মুঠো ফল বার করে দেখাল, ওদের ভাষায় বলল -'' খেয়ে দেখুন না, খুব মিষ্টি।''
লাল লাল ছোট বন কুলের সাইজ কিন্তু স্ট্রবেরির মত ফল। একটা মুখে দিতেই টক মিষ্টি স্বাদ পেলাম। জামের মত একটা বীজ রয়েছে মাঝে। ছেলে মেয়ে ছুটে এসেছে ততক্ষণে। নতুন কিছু দেখলেই ওরা উৎসাহিত হয়ে পরে। ওরাও মুখে দিয়ে বলল কিনতে।
ছোট গ্লাসের এক গ্লাস কা ফলের দাম বলল দশ টাকা। বললাম -''স্কুলে যাস ?''
মাথা নাড়ল। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করতেই দূরের পাহাড় দেখিয়ে দিল হাত দিয়ে।
হিন্দিতে বললাম কোথায় পাওয়া যায় এই ফল। দু জনেই হাসি মুখে বলল জঙ্গলের ভেতর গাছে হয়। ওরা পেড়ে আনে।
আমার মনে অসীম কৌতূহল, দুটো দশ বছরের বাচ্চা ঐ জঙ্গলে ফল আনতে যায়। চিতা আছে শুনেছি। কেয়ারটেকার বলেছে রাতে লনেও চলে আসে কখনো।
বললাম -'' কিতনা কামা লেতেহো তুম লোগ?''
স্বর্গীয় হাসি হেসে বলল সত্তুর থেকে আশি টাকা। তাতেই ওদের একদিনের খাবার হয়ে যায়। বাবা মারা গেছে, মা ও অসুস্থ বাড়িতে। আগে ঘাস কাটতে যেত। এখন ঘরে শোওয়া। এই বয়সেই রোজগারের জন্য পথে নেমেছে দুটি কচি প্রাণ। চাহিদা খুব সামান্য।
বললাম ফল দিতে। এক গ্লাসেই এতো ফল। তাও দু গ্লাস নিলাম। একটা সবুজ চকচকে পঞ্চাশ দিতেই ওরা মুখ কালো করে বলল আমিই আজ প্রথম খদ্দের। বললাম ফেরত চাই না। তোমরা কিছু খেও। কিন্তু ওরা মানল না। বলল ম্যানেজারের থেকে খুচরো করে আনবে ওরা।
আর কেউ নেবে কিনা আমায় জিজ্ঞেস করল। এসে থেকে আর কোনও গেস্ট দেখিনি। ম্যানেজার বলেছিল কেউ কেউ ঘুরতে গেছে, অনেকে এখনো এসে পৌঁছায়নি।
হতাশ ছেলে দুটো চলে যাচ্ছিল। ছোট দুটো টফি দিতেই খুশি হয়ে গেলো।
গাড়োয়ালে সূর্য ডোবে শোওয়া সাতটা থেকে সাড়ে সাতটায়। ঐ লনে বসেই সময় কেটে গেল। এক সময় শুরু হল পশ্চিম আকাশ জুরে রঙের খেলা। দেখতে দেখতে লাল বলটা টুপ করে ডুবে যেতেই এক ধূপছায়া মায়া জালে আবদ্ধ হলাম। বাতাসে ঠাণ্ডার কামড় বাড়ছিল। শাল গায়েও আর মানছে না। কিচেন থেকে মন মাতানো চিকেন পকোরার গন্ধ ভেসে আসছে। আস্তে আস্তে চারদিকের পাহাড়ে একটা দুটো করে জোনাকির মত আলো জ্বলতে শুরু করেছে ততক্ষণে। পূর্ণিমার রেশ আজও রয়েছে। গোল থালার মত চাঁদটা যেন ওক গাছের মাথায় নেমে এসেছে।
গরম পকোরা আর কফির কাপ হাতে আমি তখন হারিয়েগেছি গাড়োয়ালের প্রেমে। কিন্তু ম্যানেজার বলল রাতে তেন্দুয়া আসে এখানে, বাচ্চা দিয়েছে পিছনের এক নালায় কদিন আগেই। তাই ঘরে চলে গেলেই ভালো। আর রাতে বাইরে আসতে না।
ছেলে মেয়ে তেন্দুয়া শুনেই ঘরে ঢুকে পড়ল। চিতা বাঘ আছে ছবি আগেই দেখেছি বন দপ্তরের নোটিশ বোর্ডে।
পরদিন ঘুম ভাঙ্গল কর্তার ডাকে, তুষার মুকুট পরে সোনালী রোদ গায়ে মেখে হাসছে হিমালয়ের শৃঙ্গরাজি। মিষ্টি রোদে ঝিকিমিকিয়ে উঠেছে সব কটা শৃঙ্গ। ম্যানেজার বলল বেশ কদিন পর মেঘমুক্ত আকাশ আজ। একটু পরেই জলখাবারে পনীরপরাঠা আর ভেজ স্যান্ডুইচ খেয়ে বাচ্চাদের নিয়ে আমরা চললাম বন বিতানে। আমাদের আবাস গৃহর পিছনেই ঘন জঙ্গলের ভেতর কিছুটা জায়গা সুন্দর সাজিয়ে একটা উদ্যান করেছে বনবিভাগ। প্রথমে কিছুটা পথ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গিয়ে একটা অপূর্ব উপত্যকা। পাহাড়ের ঢালে ফুলের বাগান। ফুলের ভারে নুয়ে পড়া গোলাপের ঝাড়, রঙিন প্রজাপতির মেলা। বাচ্চাদের জন্য দোলনা স্লিপ সব রয়েছে। বসার জন্য রয়েছে কটেজ। বেশ কিছু এডভেঞ্চার রাইড ও রয়েছে।ওখানেই দেখা পেলাম বনের মাঝে সেই কা'ফল গাছের। সবেদা বা লিচু গাছের মত গাছ। লাল হলুদ ক'ফল ফলেছে প্রচুর। তবে গাছে না উঠলে নাগাল পাওয়া যাবে না।
বাচ্চারা জঙ্গলের মাঝে এমন একটা পার্ক পেয়েই খুশি। আমি দোলনায় বসে তুষার ধবল গিরিরাজের শোভা দেখছি মুগ্ধ হয়ে। খিরসুর এই সৌন্দর্য ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু গন্তব্য সেদিন বহু দূরের পথ। পিপল কোটি। প্রেম ভাই খুব মৃদু ভাসি। তাই তাড়া দেয় না।
অবশেষে আবার পাকদণ্ডী পথে ঘন জঙ্গল পার হয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল পিপল কোটির পথে। আজ থেকে আমাদের সঙ্গী হবে মা গঙ্গার মুল ধারা অলকানন্দা। মুল সড়ক শুনেছি ভাঙাচোরা, কাজ হচ্ছে। খুব ধুলো। প্রেম ভাইয়ের গাড়ির ভীষণ যত্ন। এই চড়াই উৎরাই পাহাড়ি পথেও সর্বক্ষণ এসি চলছে। যাতে ধুলো না ঢোকে গাড়িতে। আমরা যতবার দাঁড়াতে বলছি দাঁড়াচ্ছেন।
সঙ্গী যখন অলকানন্দা
যে কোনও জায়গা ঘুরতে গেলে আমি গুগল ম্যাপ থেকে পথটা মুখস্থ করে নেই। পাহাড়ি পথে দিক নির্দেশ বড্ড কম থাকে, গাড়িও কম।একবার পথ ভুল করলে খুব মুশকিল হয়।কিন্তু মা গঙ্গা আমাদের শ্রীনগর ঘুরিয়েই নিয়ে যেতে চাইছিল। একটা বাঁকের ভুলে বোধহয় এগিয়ে গেছিলাম। হঠাৎ বেশ নিচে সুন্দরী শ্রীনগর আর মা গঙ্গার দর্শন পেয়ে অবাক হলাম। আমাদের তো শ্রীনগর যাওয়ার কথা নয়। রুদ্র প্রয়াগে যাওয়ার কথা। প্রেম ভাই খুব আস্তে বললেন পথ ভুল হয়েছে , দশ কিমি এগিয়ে এসেছি আমরা। এখন শ্রীনগর হয়েই যেতে হবে।
অবশ্য তাতে পাহাড়ের ওপর থেকে গাড়োয়ালের রানী শ্রীনগরের একটা দারুণ ভিউ পাওয়া গেল। নদীর একটা বিশাল বাঁক, সাজানো শহর, বাঁধ, ছোটছোট ঘরবাড়ি যেন কেউ ঝুলন সাজিয়েছে। যদিও নদীর নাম এখনো অলকানন্দা, দেব প্রয়াগে ভাগীরথীর সাথে মিশে গঙ্গার জন্ম হবে। তবুও এখানে সবাই গঙ্গা মৈয়াই বলে দেখলাম।এতো সুন্দর এই সাজানো শহরটা সেই 2013 র প্রলয়ে নাকি শ্মশান হয়ে গেছিল। নদী ধুয়ে নিয়ে গেছিল গোটা জনপদ।
প্রেম ভাই গল্প বলছিলেন, মা গঙ্গার বুকে ছিল বহু পুরানো ধারি দেবীর মন্দির। নদীতে বাঁধ দিয়ে ব্যারেজ করায় জলস্তর বেড়ে যাচ্ছিল বলে পিলার গেঁথে মন্দিরটিকে উঁচুতে তোলার পরিকল্পনা করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিছু লোক বাধা দিয়েছিল। বলেছিল এত বছরের পুরানো মন্দিরকে নড়াতে না। তবুও মানেনি তারা, উন্নয়নের জোয়ারে ধারি দেবীকে যেদিন উপরে তোলা হয় সেদিন রাতেই আসে মহাপ্রলয়। ভেসে যায় গোটা শ্রীনগর।
কিছু কিছু ঘটনা বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দেয়। যে মহাপ্রলয় নেমে এসেছিল উত্তরাখণ্ডের বুকে তার জন্য যে উন্নয়ন দায়ী একথা মানতেই হবে। প্রকৃতির বুকে একের পর এক ব্যারেজ, হোটেল, হেলিপ্যাড, সড়ক এসবে জন্য দায়ী তা সবাই জানে। তবুও হোটেল রিসর্ট তৈরি হয়। ডাইনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটানো হয়। আমরা নদীর উপর ঝুঁকে থাকা ঘর, খাদের ধারে ভিউ ফেসিং ঘর খুঁজি। আধুনিকতার মোড়কে বসে প্রকৃতিকে ছুঁতে চাই। ধারি দেবীকে প্রণাম করে ক্ষমা চাইলাম মনে মনে।
দেরি হওয়ার ফলে রুদ্র প্রয়াগ, কর্ণ প্রয়াগে থামিনি আমরা।কারণ জায়গায় জায়গায় রাস্তার কাজ হচ্ছে বলে ট্র্যাফিক জ্যাম আর ধুলো। তাছাড়া অলকানন্দার উচ্ছল রূপ দর্শনের জন্য কয়েকবার দাঁড়িয়েছিলাম আমরা। নন্দ প্রয়াগে নন্দাকীনিতে জল নেই বললেই চলে। গোপেশ্বরে একটা পথ চলে গেলো কেদারের দিকে। অবশ্য আসল পথ ভাগ হয়েছে রুদ্র প্রয়াগেই। এ পথে অলকানন্দা আমাদের সঙ্গী হয়েছে। সারাটা পথ কোথাও সে খরস্রোতা, কোথাও বা চপলা বালিকা, কোথাও আবার ব্যারেজ তৈরি করে গতিরোধ করা হয়েছে দুরন্ত কিশোরীর। কোথাও উন্মাদিনীর মতো ছুটে চলেছে সবুজ জলরাশি।সামনে যা পাচ্ছে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। পথ বন্ধুর, চড়াই উৎরাই। কখনো নদী আমাদের পাশে কখনো আমরা পাহাড়ের মাথায়।
বেশ কিছু নতুন হোটেল রিসর্ট তৈরি হয়েছে পথের ধারে ধারে। বদ্রীনাথ ধাম খুলেছে মাত্র দশ দিন আগে। সারাটা পথ তীর্থ যাত্রীদের আনাগোনা, দলে দলে গেরুয়া ধারী চলেছে পদব্রজে। দণ্ডি কেটেও এই কয়েকশো মাইল পারি দিচ্ছে ভক্তের দল।
এভাবেই সন্ধ্যায় পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্য পিপলকোটিতে। পাহাড়ের গায়ে এ যেন এক টুকরো ছোট্ট স্বর্গ। মহাপ্রস্থানের পথে এমন টুকরো টুকরো স্বর্গ রয়েছে বেশ কিছু। পিচ ফলের ভারে ঝুঁকে পড়া গাছ, ফুলে ছাওয়া বেদানার ঝাড় আর মরশুমি ফুলের বাগানের মাঝে গাড়োয়াল মণ্ডলের গেস্ট হাউস। জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে উচ্ছল অলকানন্দা। গাড়োয়ালীদের ব্যবহার আর আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ। অবশ্য পিপলকোটি ঢোকার মুখে বেশ কয়েকটি বড় বড় হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে। বাজারেও বেশ কয়েকটা বড় হোটেল দেখলাম।
তবে বদ্রীনাথ যাত্রা চলছে বলে এ পথে আমিষ নেই ,নেই ডিম। শুদ্ধ নিরামিষ আহার। তবে অসাধারণ রান্নার স্বাদ ওদের।
পরদিন সকালে উঠেই দেখি আমাদের আশেপাশের সব সবুজ পাহাড়ের মাথাতেই বরফের ছোঁওয়া। শ্বেত শুভ্র বরফ প্রতিটা পাহাড়ের চূড়ায় সাক্ষর রেখে গেছে রাতের বেলায়।
জয় বদ্রীবিশাল
খুব ছোটবেলায় ঠাকুমার মুখে গল্প শুনেছিলাম এক বুড়ি অতিকষ্টে হেঁটে বদ্রীনাথ যাচ্ছিল। সারাটা পথ সবাই ওকে বলছিল মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে, শীত এসে গেছে তাই তাড়াতাড়ি যেতে। ক্লান্ত বয়সের ভারে জীর্ণ বুড়ি মা ধুঁকতে ধুঁকতে চলেছে বিষ্ণু দর্শনে। অলকানন্দা পেরিয়ে সে যখন মন্দিরে পৌঁছল একটি মাত্র প্রদীপ জ্বলছে, এক সেবায়েত জানালো মন্দির বন্ধ হয়ে গেছে ছমাসের জন্য। শুনশান মন্দিরে একটা বদ্রী গাছের নিচের বেদিতে বসে বসে বুড়ি চোখের জল ফেলছে, হঠাৎ একটি বৌ এসে ওকে ভোগ প্রসাদ দিল আর বলল বিশ্রাম নিতে। ভোরে মন্দির খুলবে। বুড়ি প্রসাদ খেয়ে ঘুমিয়ে কাদা। হঠাৎ খোল করতালের আওয়াজ আর বহু লোকের জয়ধ্বনিতে উঠে বসে দেখে মন্দির খুলেছে। মন্দিরের ভেতর বুড়িকে দেখে অনেকেই অবাক,কারণ দীর্ঘ ছমাস পর সেইদিন যোশীমঠ থেকে মূর্তি আনা হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহ খুলবেন প্রধান পুরোহিত। ওদিকে বুড়ি বলেই চলেছে সে আগের দিন রাতে এসেছে। মাত্র একটি রাত প্রসাদ খেয়ে সে শুয়েছিল ওখানে। তখন এক সেবায়েত বুড়িকে চিনতে পারে, বলে সে তো ছয়মাস আগে মন্দির বন্ধের দিন এসেছিল। যখন এসেছিল মন্দির সবে বন্ধ হয়েছে। বুড়ি মানবে না। এবার লক্ষ্মী মন্দিরে লক্ষ্মী মূর্তি দেখে বুড়ি অবাক।বলল এই বৌটাই তো তাকে প্রসাদ দিয়েছিল রাতের বেলায়। আসল ভক্তকে দর্শন দিয়েছিল স্বয়ং দেবী মা।
সেই বদ্রীনাথ দর্শনে চলেছি। মার্চ মাসের শুরুতে যখন বুক করেছিলাম গাড়োয়াল মণ্ডলের তিনটে হোটেল সহ সব বড় বড় হোটেল ফুল হয়ে গেছিল । অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা প্রাইভেট হোটেল পেয়েছিলাম। ধর্মকর্মে আমার চিরকাল মতি কম, চলেছি প্রকৃতির টানে। বরফ গ্লেসিয়ার নদী আর ভারতের শেষ জনপদ আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই টানেই যাচ্ছি নীলকণ্ঠ, নর, নারায়ণ দেখতে।
আজ পথ যেন আরও দুর্গম, একেকটা পাহাড় কেমন ন্যাড়া, ঘাস ও নেই। চকচকে স্লেট পাথরের মত। দেখলেই বোঝা যায় বরফে মোরা থাকে ওরা দীর্ঘ সাত মাস। শুরু হয়ে গেছে বরফের পাহাড়। দূর থেকেই বেশ কিছু তুষার শৃঙ্গ আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। জোশিমঠ পার হতেই চারদিকের দৃশ্যপট বদলে গেল। ভয়ঙ্কর সুন্দর বোধহয় একেই বলে। অলকানন্দা আজ নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মত দুরন্ত, স্বচ্ছ সবুজ জলে হাজার নুড়ি পাথরের মেলা। আপেল, খুবানি, আখরোট, প্লাম, নাশপাতি কত ফলের গাছ চারপাশে। একটু দূরে দূরে মিলিটারি ব্যারাক, বরফ গলা জলে পুষ্ট অসংখ্য ঝরণা নেমেছে পাহাড় বেয়ে। গোবিন্দ ঘাট পেরিয়ে এলাম। একটা পথ চলে গেছে ঘাংঘরিয়া হয়ে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস, অবশ্য আগস্ট মাসে সে পথে ছোটে প্রকৃতি প্রেমীরা। পথে পড়ল বিষ্ণু প্রয়াগ। সবুজ অলকানন্দার সাথে মিশেছে ঘোলা জলের বিষ্ণু গঙ্গা। দুটো জলের দুই রঙ। বদ্রীর পথে একেকটা জায়গায় পাহাড়কে লোহার শিক, নেট এসব দিয়ে বেঁধে রেখেছে মিলিটারিরা। পাথর গড়িয়ে পড়ে যখন তখন। পথের একেকটা জায়গা বোল্ডারে ভর্তি। হঠাৎ আমার ছেলে চিৎকার করে উঠল বরফ বরফ বলে।
রাস্তার ধারে পুরানো বরফের বড় বড় চাঙর। নিচ দিয়ে গুহার মত হয়ে গেছে। একটু দূরে দূরে একেকটা এমন চাঙর রয়েছে। সবাই ছবি তুলছে। আসলে পাহাড়ের খাঁজে শীতের জমে থাকা বরফ গলছে এভাবে। আরেকটু দূর যেতেই আমি স্তব্ধ, বরফের নদী !! গ্লেসিয়ার। এতদিন ভূগোল বইয়ের পাতায় দেখেছি। এই প্রথম তাকে দেখলাম। অলকানন্দায় এসে মিশেছে একের পর এক বরফের নদী। কোথাও অলকানন্দার জল জমে বরফ হয়ে আছে। সামনের পাহাড়টা পার হতেই দেখি এক বিশাল উপত্যকা। পেঁজা তুলোর মত বরফ চারপাশে। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা এ দেবস্থান সত্যিই বিষ্ণুর সাধনা ক্ষেত্র।
পুরাণ অনুসারে, এক ঋষি লক্ষ্মীকে বিষ্ণুর পদসেবা করতে দেখে বিষ্ণুকে তিরস্কার করেছিলেন। সেই জন্য বিষ্ণু বদ্রীনাথে এসে দীর্ঘ সময় পদ্মাসনে বসে তপস্যা করেছিলেন। এই অঞ্চলের দারুণ শীত সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। লক্ষ্মী দেবী একটি বদ্রী গাছের আকারে তাঁকে রক্ষা করেন। লক্ষ্মীর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু এই অঞ্চলের নাম দেন বদরিকাশ্রম। এই অঞ্চলে এক সময় একটি বদ্রী গাছের জঙ্গল ছিল। কিন্তু সেই জঙ্গল আজ আর দেখা যায় না।
বিষ্ণু পুরাণে এই বদ্রীনাথ সম্পর্কে আরেকটি উপাখ্যান রয়েছে। ধর্মের দুই পুত্র ছিল – নর ও নারায়ণ। এঁরা হিমালয়ে পর্বতরূপ ধারণ করেছিলেন। তাঁরা ধর্মপ্রচারে জন্য এই স্থানকে নির্বাচিত করেন এবং হিমালয়ের বিভিন্ন বৃহৎ উপত্যকাগুলিকে বিবাহ করেছিলেন। আশ্রম স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গার অনুসন্ধানে এসে তাঁরা অলকানন্দা নদী পেরিয়ে উষ্ণ ও শীতল প্রস্রবণের সন্ধান পান এবং এই স্থানটির নামকরণ করেন বদ্রীবিশাল।
ঐতিহাসিক নথিতে বদ্রীনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া না গেলেও বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলিতে এই মন্দিরের প্রধান দেবতা বদ্রীনাথের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার থেকে অনুমান করা হয় যে বৈদিক যুগে(খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০-৫০০ অব্দ) এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল।অনুমান এই মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত একটি বৌদ্ধ ধর্মক্ষেত্র ছিল। ৯ম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য এটিকে একটি হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করেন। এই মন্দিরের স্থাপত্য বৌদ্ধবিহারগুলির স্থাপত্যের অনুরূপ। মন্দিরের সুচিত্রিত প্রবেশদ্বারটিও বৌদ্ধ মন্দিরের একটি বৈশিষ্ট্য। হিন্দু মতে বদ্রীনাথের মূর্তিটি তিনিই অলকানন্দা নদী থেকে উদ্ধার করে তপ্ত কুণ্ড উষ্ণ প্রস্রবণের কাছে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। পারমার রাজা কনক পালের সাহায্যে আদি শঙ্কর এই অঞ্চলের সকল বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেছিলেন। রাজার বংশধরেরা বংশানুক্রমে এই মন্দিরের দেখাশোনা করতেন ।
বদ্রীনাথের সিংহাসনটি
প্রধান দেবতার নামাঙ্কিত। ১৬শ শতাব্দীতে গাড়ওয়ালের রাজা বদ্রীনাথের মূর্তিটি বর্তমান
মন্দিরে সরিয়ে আনেন।
১৮০৩ সালের হিমালয়ের
ভূমিকম্পে মন্দিরটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর জয়পুরের রাজা এটিকে
পুনর্নির্মাণ করেন। ২০০৬ সালে রাজ্য সরকার বদ্রীনাথ-সংলগ্ন এলাকায় কোনো রকম নির্মাণকাজ আইনত নিষিদ্ধ করে
দেয়।
যদিও অলকানন্দার
অপর পারে একাধিক হোটেল নির্মাণের কাজ চলছে দেখলাম। উপত্যকা জুরে হোটেল আর ধর্মশালা।
অলকানন্দা এখানে
তেজস্বিনী কন্যা, পুল পার হয়ে উষ্ণ কুণ্ডে স্নান করে
সিঁড়ি দিয়ে যেতে হয় মন্দির দর্শনে। পদ্মাসনে বসা বিষ্ণু পিছনেই গিরিরাজ নীলকণ্ঠ। চারপাশের প্রতিটা পাহাড় বরফের চাদর গায়ে পাহারা রত। বেশ কয়েকটি বড় গ্লেসিয়ার
নেমে এসেছে নর নারায়ণ নীলকণ্ঠ থেকে। এগুলো সারা বছর বরফে মোরা থাকে।
বদ্রীনাথ মন্দির
খোলে মে মাসে অক্ষয় তৃতীয়ায় আর দীপাবলির পর বন্ধ হয়ে যায় ছয় মাসের জন্য। মন্দিরটি উত্তর ভারতের অবস্থিত হলেও, এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা রাওয়ালরা সাধারণত দক্ষিণ ভারতের কেরল রাজ্যের নাম্বুদিরি
ব্রাহ্মণ গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে নির্বাচিত হন।
আমি পাপি মানুষ,তাই দূর থেকেই জয় বদ্রী বিশাল বলে প্রথমেই চললাম ভারতের
শেষ গ্ৰাম দেখতে। মানা গ্ৰাম, কয়েকটি মাত্র ঘরবাড়ি। তার মাঝ দিয়েই চড়াই পথ চলেছে ব্যস গুহা আর ভীম পুল হয়ে
বসুধারায়। এই সেই মহাপ্রস্থানের পথ, অলকানন্দা ও সরস্বতী নদীর সঙ্গম এখানেই- কেশব প্রয়াগ। স্বর্গারোহণের পথে খরস্রোতা সরস্বতী নদী পেরিয়ে গেল পঞ্চ
পাণ্ডব, দ্রৌপদী পার হতে পারছিল না। ভীম একটা বড় পাথর ফেলে দেয় নদীর উপর ব্রিজের মত করে। তার উপর দিয়ে পার হয় দৌপদী।
হোটেলে ফিরে
লাঞ্চ সেরে বেশ
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে চললাম দেবদর্শনে। বাজারের ভেতর কিছুটা ঢালু পথে নেমে
পুল পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে মুল মন্দিরের প্রবেশ দ্বার। রয়েছে
তপ্ত কুণ্ড, দুটো পুকুর, অসংখ্য ছোট মন্দির। তবে পাণ্ডাদের জোর জুলুম নেই। দেব দর্শনের পর প্রসাদ কিনে
নিতে হয়। যারা হাঁটতে অপারগ ডুলির ব্যবস্থা রয়েছে। বৃদ্ধ বৃদ্ধা শিশু থেকে মাঝ বয়সী অনেকেই চলেছেন ডুলিতে চেপে। ভালই লাগছিল পায়ে হেঁটে ঘুরতে। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে অলকানন্দার গর্জন শুনছিলাম। নদী এখানে খরস্রোতা। কিন্তু সন্ধ্যা হতেই বাতাস কাঁপন ধরায়। কনকনে ঠাণ্ডায় ঘরে ঢুকে পরলাম।
পরদিন সকালে
নীলকণ্ঠে সূর্যের প্রথম কিরণ দেখতে পেলাম হোটেলের জানালা দিয়েই। একটা বড় গ্লেসিয়ার হোটেলের ঠিক উল্টোদিকেই নেমেছে নীলকণ্ঠ থেকে। পাহাড়ের গায়ে কিছু মিলিটারি ক্যাম্প। ওরাই দুর্যোগের মোকাবিলা করে।
আউলির টানে
আমাদের পরবর্তী
গন্তব্য আউলি। সেই গ্লেসিয়ার আর পথের ধারে বরফের চাঙর দেখতে দেখতে ফেরার
পালা। যোশিমঠের কাছে এসে একটা মরণ বাকের ধারে দেখি একটা বাসের সামনের চাকা শূন্যে ভাসছে, বা দিকের চাকাটা আটকে গেছিল একটা লোহার জালে, যা জড়ানো ছিল পাথরের গায়ে। ঐ জালটুকু না থাকলে বাসটার
কি হত ভেবেই কেঁপে উঠলাম। তবে কেউ হতাহত হয়নি বদ্রীনাথের দয়ায়। ড্রাইভার ঐ শূন্য থেকে কি করে বার হল কে জানে। প্রেম ভাই বললেন পাহাড়ে এভাবেই
প্রাণ হাতে করে গাড়ি চালায় সবাই। নিজের বৌ, আট বছরের এবং মাত্র দু মাসের দুই মেয়েকে ছেড়ে উনিও তো এসেছেন অচেনা পথে আমাদের
নিয়ে।
যোশীমঠ থেকে সতেরো কিমি খাড়া রাস্তা, নানারকম ফলের বাগান আর অসংখ্য চুলের কাটার মত বাক পেরিয়ে এসে পৌঁছলাম গাড়োয়াল মণ্ডলের
বিশাল সাজানো পর্যটক আবাসে। এই আউলি শীত কালে বরফের চাদর গায়ে সেজে ওঠে। বরফে মোরা পাহাড়ের ঢালে বসে স্কি এর আসর। চারদিকে বরফের পাহাড়ে মোরা
সবুজ উপত্যকায় এখন বসেছে ফুলের মেলা। বরফ গলে গেছে কিছুদিন আগেই। সবুজ কচি ঘাসের বুগিয়ালের
ফাঁকে নাম না জানা হলুদ সাদা গোলাপি ফুলের কার্পেট। একটা ছোট্ট বুগিয়ালে দেখি এক বিদেশিনী একাই ছোট্ট একটি
টেন্ট খাটিয়ে রয়েছে। বাহন একটি রয়েল এনফিল্ড। বুগিয়ালের মাঝে মাঝে ছোট্ট
ছোট্ট পাথরের ঘর, মেষপালকদের বিশ্রামের জায়গা।
যোশীমঠ থেকে
রোপোয়ে চড়েও আসা যায় আউলি। সেক্ষেত্রে আট নম্বর টাওয়ারে নেমে পায়ে হেঁটে হোটেলে পৌছতে
হবে। উপরে দুটো বিলাসবহুল হোটেল রয়েছে। আমাদের গাড়োয়াল মণ্ডলের হোটেলটি পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে
উপরে উঠে গেছে। এদের একটা রোপোয়ে পরিসেবাও রয়েছে। তবে এটি চেয়ার কার। চারজনের বসার মত চারটি চেয়ার একত্রে। উঠে গেছে সবুজ পাহাড়ের মাথায় আউলি লেকের কাছে।
লাঞ্চের পর আমরা
প্রথমেই চেয়ার কারে চরে উপরটা ঘুরে আসবো ভাবলাম। কিন্তু ছেলের শরীরটা ঠিক
লাগছে না বলে ও ঘরে থেকে গেলো। একটু পেটের গণ্ডগোল হয়েছিল ওর। আমরা প্রায় সত্তুরটি সিঁড়ি
ভেঙে রোপোয়ের প্লাটফর্মে পৌঁছে টিকিট কাটলাম। কিন্তু কপাল মন্দ। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলো। একে ঐ ঠাণ্ডা, তাতে বৃষ্টি। জ্যাকেট ইনার কিছুই আর ঠাণ্ডা মানছে না। বৃষ্টি কমার আশায় আমরা বসেই রয়েছি। মেঘের দল ঢেকে দিয়েছে সব শৃঙ্গ। ভিজে ভিজেই দেখি সবাই রোপোয়ে
করে নেমে আসছে উপর থেকে। কারণ অতটা উপরে উথাল পাথাল হাওয়া আর আরও ঠাণ্ডা। মেয়ে মানবে না ওদিকে। তাকে চরাতেই হবে চেয়ার কারে। অবশেষে মেয়ের চোখের জলের
কাছে হার মানল বৃষ্টি, আমরাও চড়ে বসলাম চেয়ার কারে। অসাধারণ দৃশ্য, বেশ নিচে পড়ে রইল সবুজ বুগিয়াল। উপরটা সাদা মেঘে ঢাকা। সেই ছোটবেলায় পড়া রূপকথার গল্পের মতো আমরাও চলেছি মেঘের
দেশে। মেয়ে তো খুব খুশি, আমি ভয় পাচ্ছি ও চেয়ার গলে পড়ে না যায়
নিচে। আরেকজন তো ফটো তুলতেই ব্যস্ত। দু এক ফোঁটা বৃষ্টি তীরের ফলার মত এসে লাগছে চোখেমুখে। অথচ ছেড়া ছেড়া মেঘে ঢাকা আউলির এই সৌন্দর্য
দু চোখ ভরে দেখেও
আঁশ মিটছে না। দেখতে দেখতে উঠে এলাম বহু উঁচুতে, পাহাড়ের মাথায়। সামনেই আউলি লেক, গ্লাস হাউস। দূরে নন্দা দেবী। মাঝে মাঝেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে সে। কিন্তু আবার বৃষ্টি এলো, এবার আরও জোরে। আমরা রোপোয়ে স্টেশনেই আটকে গেলাম। একটু দুরেই রয়েছে গ্লাস হাউস। চা কফি পাওয়া যায়। কিন্তু ঐ বৃষ্টিতে যাবো কি
করে। রোপোয়ে বন্ধ করে দিল ওরা। আমরা ঐ হাওয়া আর ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে কাঁপছি। মাঝে মাঝে পরিষ্কার হচ্ছে একেকটা দিক। আবার ঢেকে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। প্রায় আধঘণ্টা পর বৃষ্টি ধরতেই আবার চালু হল রোপওয়ে। কিন্তু মেঘের দল নন্দা দেবী
সহ সব শৃঙ্গ ঢেকে দিয়েছে। তাই মনখারাপ নিয়েই নিচে নামলাম। নিচে আমাদের রিসর্ট কটেজ
হোটেল সব যেন খেলনা বাড়ি।বাকি সময়টা মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরি আর
তার ফাঁকে দু একবার নন্দা দেবীর ঝলক দেখেই কাটল।
ফেরার পথে প্রয়াগ দর্শন
পরদিন সকালেও
আকাশের মুখ ভার। বৃষ্টিকে সঙ্গী করেই ফেরার পালা। মেয়ে বলল আমরা ফিরে যাচ্ছি
বলেই নাকি পাহাড় কাঁদছে। চেনা পথেই ফিরে চলেছি। যা সৌন্দর্য দেখেছি মন ভরে
গেছে। নদীর জল আজ ঘোলা। পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই জলের রঙ বদলায়। ফেরার পথে কর্ণ প্রয়াগে থামলাম দুপুরের খাবারের জন্য। পিণ্ডারি নদীর সাথে অলকানন্দার
সঙ্গম স্থলে কর্ণ প্রয়াগ। ঘোলা জলের পিণ্ডারি আসছে পিণ্ডারি গ্লেসিয়ার থেকে, মিলছে স্বচ্ছ সবুজ অলকানন্দায়। দুটো জলের রঙের পার্থক্য
চোখে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণ এই প্রয়াগের তটে বসেই কর্ণের শেষকৃত্য করেছিলেন
কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধ শেষে। যে হোটেলে খেলাম সেটা একদম সঙ্গমের উপর। জলের কুলুকুলু ধ্বনি মন ভরিয়ে দিল।
আমাদের হোটেল অবশ্য রুদ্র প্রয়াগে।গাড়োয়াল মণ্ডলের হোটেলটা ঠিক অলকানন্দা আর মন্দাকিনীর সঙ্গমের উপর। প্রতিটা ঘর থেকে সঙ্গম দৃশ্যমান। নদীর গর্জন শোনা যায় ঘরে বসেই। এখানে আবার অলকানন্দা ঘোলাটে, আর মন্দাকিনী স্বচ্ছ সবুজ। ঘরে বসেই গঙ্গা আরতি দেখলাম বিকেলে। রয়েছে কোটেশ্বর মহাদেবের মন্দির। পাহাড়ের মাথায় সূর্যোদয় আর প্রয়াগের জলে তার রঙের খেলা ভুলবার নয়।
পরদিন সকালে
উঠে অবাক, মন্দাকিনীর জলস্তর অনেক বেড়ে গেছে। বয়ে আনছে মাটি গোলা কালো জল। সে আন্দাজে অলকানন্দার জলের ঘোলাটে ভাগ কম। রঙ এখনো আলাদা। মন্দাকিনী আসে কেদার থেকে। ঐ পথে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে
বোঝা গেলো। আমাদের আকাশ আজ ঝকঝকে পরিষ্কার।
এবার সফর শেষে
ফেরার পালা। মুল পথ ছেড়ে শ্রীনগরের পর আমরা চলেছি পাউরির দিকে। পাহাড়ের গায়ে মৌমাছির চাকের মত শহর পাউরি। বেশ বড় জায়গা, অনেক হোটেল রিসর্ট রয়েছে। হিমালয়ের বরফাবৃত তুষার শৃঙ্গ
দৃশ্যমান, চৌখাম্পা, কেদারনাথ সহ অনেকগুলো শৃঙ্গ দেখা গেলো আবার। যত উপরে উঠছি একে একে ফুটে
উঠছে সবকটা শৃঙ্গ। দুদিন আগেই ওদের কাছে ছিলাম আমরা, চলে যাচ্ছি কত দূরে। পাহাড় গুলো যেন আমাদের বিদায়
জানাচ্ছে একত্রে। ছেলে মেয়ে টাটা করে হাত নেড়ে বলছিল আবার আসবো। বাকি রইল আরও তিন ধাম। আসতে তো হবেই। প্রেমে পড়ে গেছি যে।
প্রেম ভাই কোট
দ্বার পৌঁছে দিয়ে বার বার বললেন আবার এলে যোগাযোগ করতে। উনি বাকি গাড়োয়াল ঘুরিয়ে
দেখাবেন আমাদের।আমাদের সঙ্গে ওঁর বদ্রীনাথ দর্শন ও
হয়ে গেলো এজন্য ধন্যবাদ দিলেন। আসলে ঠাকুর না ডাকলে দর্শন হয় না সকলের। গাড়োয়ালের অনেক জায়গাই বাকি থেকে গেল। কিন্তু যে সুধা পান করলাম সাত দিন ধরে
তা অমৃত। এই অমৃতের টানেই ফিরে আসব, অবশ্যই আসবো। হিমালয়ের রূপের মোহেই আসতে হবে আবার।
(গাড়োয়ালের
সব হোটেল বুকিং হিমালচুড়া ট্র্যাভেলস থেকে, ফোন নং ০৩৩২৩৭০৮০০৪)
( গাড়ি-
প্রেম কুমার ৭২৫১৮০০৯০০)
(ছবিঃ সুদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)



