মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

নতুন আলো ঃ দেবদত্তা

প্রতিটা গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকে একটা ছোট গল্প। এই গল্পটা গতবছর লিখেছিলাম লেন্সডাউন যেতে যেতে। বার বার নেট চলে যাচ্ছিল। অথচ একটা ইভেন্ট চলছিল, গল্পটা শেষ করতেই হবে। গুগল খুলছে না, মেডিকেল টার্মগুলো জানতে সাহায‍্য নিলাম আমাদের ডঃ দাদার @himansu chaudhary র। আজ ডাক্তার দিবসে গল্পটা আবার পোষ্ট করছি আমার সকল ডাক্তার বন্ধুদের জন‍্য।

নতুন আলো

দেবদত্তা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়



ঠক ঠক ঠক, দরজায় এত রাতে আবার কে কড়া নাড়ে। ধরফড় করে উঠে বসল কণাদ। হাসপাতাল থেকে কেউ কি? তবে কি আবার কোনো ঝামেলা হল!! তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খোলে ও। 

-''ডাক্তারবাবু, আপনে এখনি পলায় যান। ওরা আপনারে খুন কইরা ফেলবে। এখনি চইলা যান। '' আগন্তুকের কথায় খুব একটা অবাক হয় না কণাদ। 

গত ছমাস ধরেই ও খুনের হুমকি পেয়ে আসছে। বাকুড়ায় শেষ প্রান্তে রুখাশুখা এই গ্ৰাম মাগুর ডিহা। একটাই ছোট্ট স্বাস্থ‍্যকেন্দ্র আশেপাশের চারটা গ্ৰাম নিয়ে। সেখানেই পোষ্টিং নিয়ে এসেছিল সে ছয় মাস আগে। স্বাস্থ‍্য কেন্দ্রের পাশে ছোট্ট একটা ইনডোর ইউনিট ও ছিল পরিত‍্যক্ত অবস্থায়। মাত্র ছটা বেড, প্রয়োজনে প্রসুতিদের ডেলিভারি হত একসময়। রাত বিরাতে দু এক জনকে ভর্তি করা হত অনেক সময়। তবে পরে সবাইকে নাকি জেলা সদরে পাঠিয়ে দেওয়া হত। আসলে কোনো ডাক্তার আসতে চাইত না এই গণ্ডগ্ৰামে। চিকিৎসার সঠিক পরিকাঠামো নেই এখানে। রয়েছে হাজারটা অসুবিধা। হারান কম্পাউণ্ডার এখানের অলিখিত ডাক্তার। ও একাই সব সামলে নেয়। যে যে ডাক্তার এখানে বদলি হয়ে আসে দু দিনেই সিএমওএইচ কে টপকে ডিএইচএস কে পটিয়ে অন‍্য কোথাও পালিয়ে যায়। হারান কে এখানে সবাই হারান ডাক্তার বলেই চেনে। একটা কান ভাঙা স্টেথো নিয়ে ও একাই ডাক্তারি করে এখানে। তবে কাউকে ভর্তি নিয়ে ঝামেলা বাড়ায় না। একটু বেগতিক বুঝলেই সদরে ঠেলে দেয়। এভাবেই হারানের বেশ চলছিল। দুটো পাকা বাড়ি, জমি, বাইক বেশ অবস্থা খুলে গেছিল ওর। 

কিন্তু কণাদ এসে প্রথমেই ইনডোর ইউনিটটা পরিস্কার করিয়ে চালু করেছিল। দু জন নার্সকে নিয়ে একাই ডেলিভারি ও করিয়েছে কয়েকবার। হারানের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে ছমাস পার করে ফেলেছিল কণাদ। তবে হারান আড়ালে আড়ালে মেঘনাদের মতো বেশ কিছুদিন যাবৎ কলকাঠি নাড়ছিল। কণাদ এখানে গেঁড়ে বসে থাকলে তো হারনের রুজিরোজগার শিকেয় উঠবে।

গত সপ্তাহে পরাণের রোগা এনিমিক বউটা পঞ্চম বাচ্চার জন্ম দিতে এসেছিল। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সদর অবধি পৌঁছানোর ধকল নিতে পারত না বেচারি বৌটা। আর তাছাড়া পরাণের সেরকম আর্থিক সামর্থ্য ও ছিল না। কণাদ নিজে দায়িত্ব নিয়ে ডেলিভারি করলেও বাচ্চাটা বাঁচেনি, গলায় নাড়ি জড়িয়ে গেছিলো। গ্ৰামের লোককে খেপিয়ে তুলেছিল হারানের লোকেরা। হাসপাতাল ঘেরাও করেছিল ওরা। কিন্তু একই সময় প্রধানের মেয়ের বিয়ের আট বছর পর যমজ ছেলে হওয়ায় প্রধানের লোকেরা সামলে নিয়েছিল। কিন্তু আজ আটদিনের জ্বরে ভোগা পনেরো বছরের ছেলেটা যখন বিকেলে এসে ভর্তি হলো, তখনি হারান ওকে রেফার করতে বলেছিল। কিন্তু কণাদ নিজের দায়িত্বে ওকে ভর্তি নিয়েছিল। ওদিকে একটা পাঁচ বছরের মেয়ে জলে ডুবে এসে ভর্তি হয়েছিল সন্ধ‍্যাবেলা, ফুসফুসে জল ঢুকে গেছিল। ওকে সদরে রেফার করতেই গন্ডগোল শুরু হয়েছিল। কণাদ মেয়েটার বাড়ির লোককে বুঝিয়ে বলেছিল এই হাসপাতালে ঐ ব‍্যবস্থা নেই। অক্সিজেন লাগিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ওকে সদরে নিয়ে যাবার কথা বলতেই কিছু লোক ক্ষেপে উঠেছিল। ওদের সামর্থ্য নেই, অথচ কনাদ বারবার বলেছিল ঐ মেয়েটির অবস্থা খুব খারাপ। এরমধ‍্যে ঐ জ্বরে ভোগা ছেলেটির কন্ডিশনও ডিটরিয়েট করে। 

-''ডাক্তারবাবু, রমেনের মেয়েটা চইলা গেলো বোধহয়.. ওরা ভাঙচুর করতাসে। ছেলেটার অবস্থাও খারাপ। '' হসপিটালের জমাদার বাবলু বলে ওঠে। 

কণাদ বলে -''চল আমি যাচ্ছি। ''

-''পাগল হইসেন? আপনে গাড়ি লইয়া সদরে যান গিয়া....''

-''না , আমি হাসপাতালেই যাবো। চলো।''

কনাদ তাড়াতাড়ি হাঁটা দেয়। জমাদার বাবলু পেছনে ছুটতে থাকে। কিন্তু একরোখা ডাক্তারকে আটকাতে পারে না। 

*****

-''আজ অবধি সিএমওএইচ বা ডিএইচএসের কাছে ধর্ণা দিয়ে ডাক্তাররা শহরে বা টাউনে বদলি হতে চেয়েছে। কখনো গ্ৰামে যাবো বলে আবেদন করেনি। ডঃ কণাদ এমন একজন ডাক্তার যিনি নিজে থেকে ঐ গ্ৰামে যেতে চেয়েছিলেন, ওখানকার স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু করিয়েছিলেন। আর আজ তাকেই এমন অবস্থার শিকার হতে হল!'' ডঃ মুখার্জীর কথায় কেউ কোনো উত্তর খুঁজে পান না। 

আপাতত ভোররাতেই তিন সদস‍্যর দল চলেছে মাগুরডিহায়, কাল রাতে ভাঙচুর করে আগুন লাগানো হয়েছে ঐ হাসপাতালে। ডঃ কণাদ আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর এসেছে। 

হাসপাতালের সামনে গিয়ে সবাই অবাক, তিনটে গ্ৰামের লোক উপচে পড়েছে। লোকাল থানা থেকে পুলিশ এসে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছয় বেডের ছোট্ট হাসপাতালটায় ভাঙচুর চলেছে, ফাঁকা বেড গুলো ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে।আগুনে পুড়ে গেছে বিছানা, পর্দা। পাশেই আউটডোরেরও জানালা দরজা ভাঙা হয়েছে। কিন্তু এত লোক আপাতত শান্ত। কেমন যেন একটা চাপা উত্তেজনা চারপাশে। ডঃ কণাদকেও নাকি ঘেরাও করা হয়েছিল রাতে। তেমনি খবর গেছিল জেলা হেডকোয়ার্টারে। কিন্তু কোথায় এখন সে!! হাসপাতালের বাইরেই একটা ভাঙাচোরা ঘরকে কণাদ রেস্টরুম বানিয়েছিলো, দুপুরে বাড়ি যেতোনা, ওখানেই একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতো। জনতা সেই বাড়ির সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। রেষ্ট রুমের দরজা বন্ধ, বাবলু জমাদার আর গ্রাম প্রধান দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরে দারোয়ানের মতো। পাশেই ভিজে বিড়ালের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে হারান কম্পাঊন্ডার। হঠাৎ ভেতর থেকে ভেসে আসে নবজাতকের ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ। খানিক পরেই নার্স মায়া দরজা খুলে বেরিয়ে আসে, কোলে সাদা কাপড় জড়ানো এক দেবশিশু, পেছনে ডঃ কণাদ, মাথায় ব‍্যান্ডেজ। চোখের পাশটা লাল হয়ে ফুলে। কম্পাউন্ডার হারানের নাতি হয়েছে। কাল ভোর রাতে বাথরুম যেতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছিল ওর ছেলের বৌ। আট মাস পুরোয়নি এখনো। জল ভেঙ্গে গেছিল, অনবরত রক্তপাত হচ্ছিলো, প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছিলো, আর সদরে নেওয়ার মতো সময় ছিল না। এদিকে হাসপাতাল তখন জ্বলছে। হারান তখন কণাদের বিরুদ্ধে আক্রমনের ইন্ধন জোগাচ্ছে। সেই সময়ই হারানের ছেলে নিজের বৌকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে আসে হাসপাতালে। হারান দিশাহারা বোধ করে, কী করবে ভেবে পায়না। কণাদ কিন্তু ওই অবস্থাতেও মানসিক স্থৈর্য হারায়নি। ওর ডাক্তারির চোখ একঝলক দেখেই বুঝে গেছিলো, প্রিটার্ম ব্রিচ ডেলিভারি, তার উপরে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া। ইমেডিয়েটলি ডেলিভারি না করাতে পারলে রক্তক্ষরণ হয়েই বৌটা মারা যাবে। এদিকে প্রসব করাতে গিয়েও মা আর বাচ্চা দু'জনেরই প্রাণসংশয় হতে পারে। তখন এই উন্মাদ জনতা কি তাকে ছেড়ে দেবে? কিন্তু ডাক্তারি শপথ যখন নিয়েছে, তখন যা করা দরকার, তা তাকে করতেই হবে। নিজের ভালমন্দের কথা না ভেবে পেশেন্টের কথা আগে ভাবাই কণাদের শিক্ষা। ওদিকে হারানের ছেলেরবৌটা তখন নেতিয়ে পড়েছে। হাত জোড় করে সে বলেছিলো, "আমায় আপনারা পরে মারবেন, এখন আগে এই মেয়েটাকে বাঁচাতে দিন।" মারমুখী জনতা ওর কথা শুনে থমকে যায়, সেই সুযোগে ঐ গণ্ডগোলের মধ‍্যে কণাদ পেশেন্ট আর একজন নার্সকে নিয়ে নিজের রেষ্ট রুমে ডেলিভারী করাতে ঢুকেছিল, কারণ হাসপাতালের ওয়ার্ড আর লেবার রুম ততক্ষণে জ্বলছে। 

*****

-''সার আমার দাদু বলেছিল শহরে অনেক ডাক্তার আছে, গ্ৰামগুলোয় নেই। এই মাগুর ডিহায় থাকত মিতু মাসী। আমার আয়ামাসি, আমায় মানুষ করেছিলো। বলেছিল ওর মেয়েটা বাচ্চা হতে গিয়ে মারা গেছিল। ওর বর তিনদিনের জ্বরে চলে গেছিল বিনা চিকিৎসায়। আমি এখনো এখানেই থাকতে চাই।'' কণাদের কথায় সবাই অবাক। 

-''সব দোষ আমার সার। ডাক্তারবাবু কে আমি যেতে দেবো না। এখানে ওর দ‍রকার আছে।'' হারানের চোখে জল। 

জনতার মধ‍্যে এতক্ষন চাপা গুঞ্জন ছিল। এবার ওরাও বলে -''ডাক্তাব বাবু কে যাইতে দিব না। উনি ভগবান। ''

কণাদের মুখে হাসির রেশ ফোটে। নতুন প্রভাতে নতুন আলোর রেশ ভেসে আসে আসে মাগুরডিহায়।

সমাপ্ত

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

স্বর্ণচাঁপা

স্বর্ণচাঁপা

দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়



সে বহুদিন আগের কথা যে দূরের নীল পাহাড়, যার গা বেয়ে নেমে আসে সফেদ শীতল ঝর্ণা ধারা, সেই পাহাড়ের গায়ে এক গ্ৰাম ছিল অনিকপুর গায়ের শেষ মাথায় যে ছোট্ট মাটির কুড়ে তাতে থাকত এক ফুল বিক্রেতা রূপাই তার মেয়ে স্বর্ণ স্বর্ণর মা ছিল না জঙ্গল থেকে বাপ মেয়ে মিলে ফুল তুলত, সাত বছরের স্বর্ণ খুব সুন্দর মালা গাঁথত, রূপাই সে মালা ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত 

একদিন জঙ্গলে ফুল তুলতে গিয়ে স্বর্ণ আর রূপাই দেখে একটি যুবতি মেয়ে বসে বসে কাঁদছে ওরা প্রশ্ন করতেই মেয়েটি বলল তার বাবা মা তাকে ত্যাগ করেছে সে কালো বলে তার বিয়ে হচ্ছিল না তাই জঙ্গলে ফেলে গেছে স্বর্ণর আব্দারে রূপাই মেয়েটিকে বাড়ি নিয়ে আসে ওর নাম ছিল মায়া এদিকে স্বর্ণদের ছোট্ট মাটির কুড়েতে একটাই ঘর মায়াকে কোথায় রাখবে ওরা ভেবেই পায় নাপ্রথম দুদিন রূপাই বারান্দায় শোয় কিন্তু একটা যুবতি মেয়েকে ঘরে তুলেছে বলে গাঁয়ের লোক রূপাইকে বলে মেয়েটাকে বিয়ে করে নিতে মা মরা মেয়ে স্বর্ণরও তাই ইচ্ছা বাধ্য হয়ে রূপাই মায়াকে বিয়ে করে

 কিন্তু বিয়ের পর মায়া একদম বদলে যায় স্বর্ণকে ভালবাসত না কিন্তু স্বর্ণ নতুন মা কে খুব ভালো বাসত মায়া সেই সুযোগে ওকে দিয়ে সব কাজ করাতো, খেতেও দিত না রূপাইকে বড় শহরে কাজ করে পয়সা আনতে পাঠিয়েছিল মায়া স্বর্ণ একাই ফুল তুলে মালা গেঁথে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত

 সেবার বর্ষা আসেনি ওদের গ্ৰামে সব জলাশয় শুকনো, জঙ্গল সূর্যের তেজে ঝলসে গেলো ঝর্ণায় জল নেই প্রায় ফুল ফোটেই না তেমন ওদিকে রূপাই শহরে স্বর্ণদের বাড়ির স্বর্ণচাঁপা গাছটায় তবু কিছু ফুল ফোটে রোজ সেই ফুলের মালা বানিয়ে স্বর্ণ বিক্রি করে যা পায় তাই মায়ার হাতে দেয় এদিকে মায়া রোজ স্বর্ণচাঁপা গাছটার দিকে তাকায়, ভাবে এর ফুল কেন শেষ হয় না?

 আসলে মায়া ছিল একটা ডাইনি বুড়ি যুবতীর রূপ ধরে ছলনা করেই রূপাইকে বিয়ে করেছিল এখন স্বর্ণকে মেরে ফেলার চিন্তা করত সর্বদা গাছে ফুল না ফুটলেই স্বর্ণকে বনে পাঠাবে ভেবেই রেখেছিল বনেই ওকে মেরে ফেলত মায়া

 কিন্তু স্বর্ণ রোজ স্বর্ণচাঁপার মালা গেঁথেই গায়ের মন্দিরে দিয়ে আসত, আর পুরুত মশাই ওকে দাম বাবদ চাল সবজি বেধে দিতেন গায়ের মোড়লের বাড়িও যেত ওর মালা, সেখান থেকেও পয়সা পেত স্বর্ণ 

এদিকে খরায় সারা গ্ৰাম শুকতে বসেছে রূপাইও কাজ নেই বলে গায়ে ফিরেছে মায়া তো রূপাইকে দেখেই মায়াকান্না জুড়ে দিল নাকি ভোর রাতে স্বপ্ন দেখেছে স্বর্ণচাঁপা গাছটা কাটলেই গায়ে বৃষ্টি হবে  তাই ওটা কাটতেই হবে সারা গায়ে একটি চাঁপা গাছ তখনো ফুল আর পাতায় ছেয়ে রয়েছে বারো মাস ফুল দিত গাছটা স্বর্ণর জন্মের সময় ওর মায়ের হাতে লাগানো গাছ ওটা গাছ কাটার কথায় ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকে ওদিকে মায়া বারবার গাছটা কাটতে বলে গাছের কাঠ বিক্রি করে ওদের টাকা হবে তাও বলে রূপাইকেরূপাই অবশেষে রাজি হয়ে যায়



ওদিকে গাছটা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ওখানেই ঘুমিয়ে গেছিল স্বর্ণ ভোর রাতে স্বপ্ন দেখে ওর আসল মা নেমে এসেছে ওর কাছে, ওকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মা বলে গাছ কাটলেও গুড়িটা যেন কখনো কাটতে না দেয় ওদের গুড়িটা আগলে রাখতে পরদিন রূপাই গাছটা কাটতে যেতেই স্বর্ণ বাবাকে সবটা খুলে বলে রূপাই গুড়িটা রেখে গাছটা কেটে ফেলে স্বর্ণ চোখের জল মুছে গাছের সব ফুল তুলে নেয়, প্রচুর মালা গাঁথে পাতাগুলো রূপাই গায়ের লোকদের বিক্রি করে দেয়, খরায় গরু ছাগলের খাবার নেই সবুজ কচি পাতা সবাই কিনে নেয় কাঠও বিক্রি হয়ে যায়

ওদিকে মায়া দাঁতে দাঁত চেপে থাকে ভাবে গাছ তো বিদায় হল টাকাও শেষ হবে দু দিনে তারপর হবে আসল মজা পরদিন সকালে উঠে সবাই অবাক হয়ে দেখে মিষ্টি গন্ধ ছাড়ছে স্বর্ণচাঁপা ফুল, গাছটা রাতারাতি গজিয়ে উঠে দোল খাচ্ছে হাওয়ায়

মায়া নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলে-'' কি অলুক্ষুনে গাছ গো!! গাছ দূর করো এখনি''

ওর জেদে রূপাই ভয় পেয়ে আবার গাছটা কেটে ফেলে কিন্তু পরদিন আবার গজিয়ে ওঠে চাঁপাগাছটি পরপর সাত দিন গাছটা কাটিয়েও যখন কিছুই করতে পারে না মায়া তখন আরও রেগে যায় গ্ৰামের সবাইকে ঘুরে ঘুরে বলতে থাকে গাছটা অপয়া, ওর জন্য গ্ৰামে খরা হয়েছে ওটাকে গুড়িটা শুদ্ধু উপড়ে ফেললেই খরা কাটবে না হলে রাতারাতি কোনো গাছ গজায় নাকি! গায়ের লোক অনেকেই ওর কথায় সায় দেয় স্বর্ণ খবর শুনে ছুটে যায় গায়ের মন্দিরে, পুরুতকে বলে -''যে গাছের ফুলে মায়ের পূজা হয় তা কি কখনো অপয়া হয় ?'' কিন্তু পুরুত চুপ মোড়লকে গিয়ে বলে-'' যে মালা আপনার গৃহদেবতার গলায় ওঠে রোজ তা কি অলক্ষুণে হতে পারে?''  মোড়ল চুপ

গায়ের লোক বলে -''সব মানলাম, কিন্তু গাছ কেটে ফেললে রাতারাতি গাছ গজায় তো কখনো শুনিনি আমরা!''

 অতএব গাছটা কাটা হবে গুড়ি থেকেই এটাই ঠিক হয় স্বর্ণ সারারাত গাছের নিচে বসে কাঁদে ভোর রাতের স্বপ্নে ওর মা এসে বলে -'' দুঃখ করিস না, যা হবে ভালোই হবে গাছের গোরায় চারটে নীলচে শেকড় পাবি, যত্ন করে গায়ের চার কোনে পুতে দিবি আর তোদের কোনো কষ্ট থাকবে না''

 ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে স্বর্ণ, দু একটা চাঁপা ফুল খসে পড়ে টুপটাপ গাছটাকে শেষ বারের মত জড়িয়ে ধরে একটু পরেই দলে দলে গ্ৰাম বাসি চলে আসে গাছটা কাটতে স্বর্ণ অবাক হয়ে দেখের গাছের গুড়িটা মাটির কত গভীরে, কাটছে তো কাটছেই সবাই, মাটি খুড়তে খুড়তে বিশাল বড় গর্ত হয়ে যায় তবু গুড়িটা তোলা যায় না মায়া থমথমে মুখে দেখতে থাকে সবটা সূর্য যখন মধ্য গগন পার করে, আস্তে আস্তে গাছের বিশাল গুড়িটা উপড়ে তোলে সবাই অমনি কোথা থেকে কুলকুল করে জল এসে গর্ত ভরাট করে দেয় একটা টলটলে দীঘি দেখে সবাই অবাক

 মায়া তাড়াতাড়ি বলে -''বলেছিলাম না ওটা অলক্ষুণে গাছ দেখো গাছ কাটতেই দীঘি জেগে উঠল গায়ের জল কষ্ট মিটবে এবার''

সবাই কিছু বলার আগেই ভীষণ জোরে বজ্রপাত হয়, আস্তে আস্তে ঈশান কোনে মেঘ জমতে থাকে শীতল হাওয়া বইতে থাকেমায়া সবাইকে বলে গাছের গুড়িটা পুড়িয়ে দিতে স্বর্ণ অবাক হয়ে দেখে গুড়ির গায়ে চারটে নীলচে মোটা শেকড়, সবার অলক্ষ্যে ওগুলো সংগ্ৰহ করে নেয়

 মায়া ওদিকে বলেই চলেছে -'' দেখো, মেঘ এসেছে এবার বৃষ্টি আসবে.….'' ওর কথার মাঝেই আকাশ থেকে দৈববাণী ভেসে আসে-'' হ্যাঁ, এবার গায়ের দুর্যোগ এবার কেটে যাবে এই গ্ৰামে নজর লেগেছে এক ডাইনি বুড়িরসে বন জঙ্গল থেকে মানুষ সবাইকে ধ্বংস করতে চায় সে লুকিয়ে আছে এই ভিড়েই এই পবিত্র দীঘির জল গ্ৰামের সবাই স্পর্শ করতে পারবে কিন্তু ডাইনি বুড়ি পারবে না এই জল গায়ে লাগলেই সে ধ্বংস হবে আর আসল দুর্যোগ তখন কেটে যাবে ডাইনি বুড়ি স্বর্ণ সহ গ্রামের সবাইকে মারতে চেয়েছিল, কিন্তু এবার নিজেই ধ্বংস হবে''

আকাশ বাণী শুনে সবাই সবার দিকে তাকায় সকলের চোখে সন্দেহ পুরুত আর মোড়ল একে একে সকল কে গিয়ে স্নিগ্ধ দীঘির জল স্পর্শ করতে বলে মায়া কিন্তু লুকিয়ে পরতে চায় ভিড়ের ভেতর কিন্তু রূপাই ওকে খেয়াল করে জোর করেই ওকে দীঘির কাছে নিয়ে যায় রূপাই জলাতঙ্ক রুগীর মত ছটফট করতে থাকে মায়া পুরুত ওর গায়ে দীঘির জল ছেটাতেই ওর আসল রূপ বেরিয়ে আসে চিৎকার করতে করতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তখন সবাই বুঝতে পারে সবকিছু 

স্বর্ণ ওদিকে শেকড়গুলো নিয়ে গায়ের চার কোনে পুতে দিয়ে আসে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে গ্ৰাম জুড়ে গাছপালারা প্রাণ ফিরে পায় ডাইনির জাদু শেষ হয় সবাই স্বর্ণকে আদর করতে থাকে গ্রামের সুখ শান্তি ফিরে আসে পরদিন সকালে সবাই দেখে গায়ের চার দিকে চারটে স্বর্ণচাঁপা গাছ গজিয়েছে, মৃদু হাওয়ায় গাছগুলো দোল খাচ্ছে এরচপর থেকে অনিকপুরে আর কখনো এমন দুর্যোগ আসেনি

যদি কখনো নীল পাহাড়ের কাছে অনিকপুরে যাও স্বর্ণ দীঘি দেখে আসতে ভুলো না গ্ৰামের চার কোনে চারটে স্বর্ণচাঁপা গাছ ওদের রক্ষা করে চলেছে এখনো গাছগুলোয় বারো মাস ফুল ফোটে স্বর্ণচাঁপার গন্ধ মেখে শীতল মিষ্টি বাতাস বয় এখনো অনিকপুরে 


(ছোটদের রূপকথাতে প্রকাশিত)


মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে

  বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে দেবদত্তা ব্যানার্জী   একটু শীতলতার খোঁজে   গরমের ছুটির...