শনিবার, ২৭ জুন, ২০২০

কালচক্রের আবর্তে

কালচক্রের আবর্তে

দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

()

 

ট্রান্সফারের মেলটা পেয়েই আনন্দে লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছা করছিল দোমহনী, তিস্তার পারে গড়ে ওঠা এক ছোট্ট সুন্দর জনপদ যেখানে কেটেছিল আমার ছেলেবেলার কিছুটা সময়, তারপর হঠাৎ আমরা বালুরঘাট চলে যাই বহুবার ভেবেছি দোমহনী যাবো কিন্তু আর যাওয়া হয়নি বিভিন্ন কারণে অবশ্য কোন এক অজ্ঞাত কারণে বাবা মা আমায় দোমহনী যেতেই দিতে চাইত না আসলে ছোটবেলায় একবার আমার খুব অসুখ করেছিল শুনেছি অনেক ডাক্তার দেখিয়েও আমি সুস্থ হইনি যখন তখন মা বাবা আমাকে এক অঘোরী তান্ত্রিকের কাছে নিয়ে যায় তিনি কি সব পুজো টুজো করে বাবাকে বলেছিলেন দোমহনী ছেড়ে দিলেই আমি বেঁচে যাবো আমার খারাপ হাওয়া লেগেছে বাবা রাতারাতি আমাদের নিয়ে বালুরঘাটে মামাবাড়ি চলে এসেছিল তারপর থেকে আর দোমহনী যাইনি আমরা কেউ

গ্ৰামীন ব্যাঙ্কে চাকরী পেয়ে দু বছর ইসলামপুরে ছিলাম ঋদ্ধির সাথে পরিচয় এই ইসলামপুরে এসে এরপর তিন বছর হিলিতে তিন বছর রায়গঞ্জে কাটিয়ে আবার প্রমোশন এবং বদলি এবার গন্তব্য দোমহনী দেখেই মন আনন্দে নেচে উঠল

মা গত হয়েছেন ছমাস আগে, বাবা দু বছর আগেই চলে গেছিলেন আজ ওরা থাকলে খুব খুশি হত বাবার জীবনের বেশিরভাগটাই কেটেছিল দোমহনীতে শুনেছি দাদু রেলে চাকরি করতেন এনজেপি স্টেশন হওয়ার আগে দোমহনী ছিল উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় জংশন কলকাতার সঙ্গে উত্তরবঙ্গ আর আসামকে জুড়েছিল এই প্রাচীন জনপদ বড় বড় রেলের অফিসারদের বাংলো আর বিশাল ইয়ার্ড আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে কালের সাক্ষীর মত আমি অবশ্য যে দোমহনীকে দেখেছি তা এক শ্মশান সদৃশ গ্ৰাম কঙ্কালের মত বড় বড় লাল ইটের বাংলো চারদিকে ছড়ানো, মৃতপ্রায় রেল লাইন যা দিয়ে সারাদিনে মাত্র একবার ধুকে ধুকে চলত মাত্র দু কামরার একটি মিটারগেজ ট্রেন রামসাই ফরেস্টের চোরাই কাঠ পাচার হত ট্রেনে তারপর বসে গেছিল সেই কয়লার ইঞ্জিনে টানা প্রাগৈতিহাসিক ট্রেনটা ছোটবেলা রেললাইনেই খেলতে যেতাম আমরা, পাশেই সাহেব বাংলো, বিশাল লাল ইটের এক ভগ্নপ্রায় বাংলো, সেই বাউন্ডারির ভেতর বিশাল বাগান, পেয়ারা, আম, লিচু, কি নেই সে বাগানে আর ছিল দেওয়াল ঘেঁষা একটা শিউলি গাছ,  বারো মাস যে গাছে ফুল হত লোকে বাংলোকে পোড়া সাহেবের বাংলো বলত সাহেবকে নাকি অভিশাপ দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল কোন তান্ত্রিক ভূতের ভয়ে কেউ যেত না ওর ভেতরে বাইরে থেকেই ফল চুরি করত কিন্তু আমি একদিন রুবেলের সঙ্গে ঢুকেছিলাম ফল চুরি করতে পরিত্যক্ত বাংলোর বাগান আগাছায় ভরা হলেও একটা পায়ে চলা হাঁটা পথ ছিল বাগানের ভেতর দিয়ে যা শেষ হয়েছিল বাংলোর সিঁড়ির কাছে সাদা থোকা থোকা জামরুল পেড়ে খেয়েছিলাম তারপর অলস দুপুরে মাঝে মাঝেই সাহেব বাংলো আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকতো সোনালী হয়ে পেকে থাকা আতা, লালচে লিচু, সিঁদুরে আম বেশ ভালোই কাটছিল দুপুরগুলো  কিন্তু হঠাৎ একদিন কি যে হল, প্রথমে রুবেল তারপর আমি পড়লাম এক অজানা জ্বরের কবলে, শুকিয়ে যেতে লাগলাম দিন দিন, ফ্যাঁকাসে রক্ত শূন্য হয়ে উঠছিলাম এক সন্ধ্যায় খবর এলো রুবেল আর নেই তারপরেই বাবা মা বাবার এক বন্ধুর কথায় আমায় নিয়ে ছুটেছিল অঘোরী বাবার থানে আমার অবশ্য কিছুই মনে নেই

এরপর আমরা সব ছেড়ে রাতারাতি বালুরঘাট চলে এসেছিলাম বাবা স্কুলের সরকারী চাকরি, পৈতৃক বিশাল বাড়ি সব ফেলে চলে এসেছিল আমাদের নিয়ে পরে অবশ্য ছোটকাকা আর মেজো কাকা গিয়ে বাড়ি ঘর নাম মাত্র দামে বিক্রি করে এসেছিল আজ প্রায় তিরিশ বছর পর আবার সেই দোমহনী যাবো ভেবেই একটা রোমাঞ্চ হচ্ছিল মনের ভেতর আমার ছোটবেলার খেলার সাথীরা আজ কে কোথায় ছিটকে গেছে কে জানে

বাড়ি ফিরেই ঋদ্ধিকে বললাম -''আমি পরশু রবিবার চলে যাবো জয়েন করে বাড়ি খুঁজে কিছুদিনের ভেতর তোমায় আর পালককে নিয়ে যাবো'' পালক আমাদের পাঁচ বছরের মেয়ে

ঋদ্ধি একটু ভ্রু কুঁচকে বলল -''সেই দোমহনী !! মা বাবা তোমায় নিয়ে চলে এসেছিল সেখানে যাওয়া কি উচিত হবে?''

-''তুমি না সাইন্স নিয়ে পড়েছ? তিরিশ বছর আগে কে কি বলেছিল যা শুনে বাবা মা চলে এসেছিল তা ধরে বসে থাকবো আমরা!! যুগে বসে এসব কি তোমার মুখে মানায়?''

আমায় জলখাবার দিয়ে বলল -''তবে জায়গাটা তো গ্ৰাম, মেয়ের পড়াশোনার কি হবে ভেবেছ?''

-''পাশেই জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি, ভালো ভালো স্কুল রয়েছে ওসব ভেবে দেখার সময় পাবো প্রচুর আমার ব্যাগটা গুছিয়ে রেখো''

 

()

 

শিলিগুড়ি জংশনে ট্রেন বদলে, ডিএম ইউ ধরে যখন দোমহনী পৌঁছলাম সন্ধ্যে হবে হবে ছোট্ট মডেল স্টেশন, চারপাশে সবুজ গাছপালা, তিস্তার ভেজা হাওয়া আর সেই পুরানো লাল ভাঙ্গাচোরা কিছু বাংলো, রেলের পরিত্যক্ত কিছু কোয়াটার, এক ধারে আরপিএফের বিশাল ট্রেনিং ক্যাম্প, সময় যেন থমকে গেছে এখানে তিরিশ বছরেও খুব একটা বদল হয়নি জায়গাটার বরঞ্চ পুরানো অনেক লোক চলে গেছে এখানকার মায়া কাটিয়ে স্টেশনটায় নেমেই এক অদ্ভুত মন খারাপ ঘিরে ধরল আমায় ব্যাঙ্কের পিওন আর একজন স্টাফ এসেছিল আমায় নিতে তাদের সঙ্গে এগিয়ে চললাম লোকালয়ের দিকে, রাস্তার আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে কত টুকরো স্মৃতি আমার প্রথম স্কুল, বাবার হাইস্কুল আমাদের বাড়ি পার করে ব্যাঙ্কের পাশেই এক স্টাফের বাড়িতে আমার রাত্রিবাসের আয়োজন হয়েছিল কারণ গ্ৰামে এখনো হোটেল নেই, জলপাইগুড়ি বা ময়নাগুড়িতে হোটেল রয়েছে পরদিন সকালেই কাজে যোগ দিলাম কয়েকজন পুরানো লোক এখনো রয়েছেন জানা গেল

ডাক্তার কাকু যিনি আমাদের চিকিৎসা করতেন তিনিই আমাদের বাগানে ঘেরা বাড়িটা কিনেছিলেন বিকেলেই গেলাম ওঁর সঙ্গে দেখা করতে পরিচয় দিতেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন  আমাদের এক চালা বাড়ি ভেঙ্গে ওনার তিনতলা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালেন ওঁর ছেলেরা একজন কলকাতায় একজন পুনেতে রয়েছে দু জনেই আমার বন্ধু ছিল আমি বাড়ি ভাড়া খুঁজছি শুনে বললেন -''এখানে আধুনিক সুবিধা যুক্ত বাড়ি পাওয়া কঠিন, কারণ বাড়ি ভাড়া খুব কম লোক নেয় এদিকে যারা চাকরি করতে আসে সবাই ময়নাগুড়ি বা জলপাইগুড়িতে বাড়ি ভাড়া নেয় আমার একতলাটা পুরো ফাঁকা, তিনটে বড় ঘর রান্নাঘর বাথরুম সব রয়েছে জল কলের ব্যবস্থা আছে, তুমি এখানেই উঠে এসো ''

এতো আমার জন্য মেঘ না চাইতে জল, বাড়ির পিছনে ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটা এখনো রয়েছে, দক্ষিণ দিকে কলার ঝাড়, সেই আমার লাগানো শ্বেতকরবী গাছ, সব একই আছে বড় চারটে নারকেল গাছের দুটো মনে হল বাজ পড়ে ঝলসে গেছে

ডাক্তার কাকু ভাড়া নিতেই চাইছিলেন না, বললেন -''ছেলেরা তো আর এসে থাকে না, তোমরা থাকলে আমাদের একাকীত্ব কাটবে আর বাড়ি তো তোমারই ভাড়া নেবো কেন?''

কিন্তু আমি জোর করে একটা মিনিমাম ভাড়ায় ওঁকে রাজি করালাম তবে ঠিক হল ঋদ্ধি না আসা অবধি আমি ওঁদের ঘরেই খাবো

পরদিনই উঠে এলাম আমার ছোটবেলার বাড়িতে শোওয়ার ঘরে একটা চৌকিতে বিছানা পেতে মশারি টাঙিয়ে রাতে শুয়েছিলাম দক্ষিণ দিকে তিস্তা, তাই জানালাটা খুলেই শুয়েছিলাম বেশ ফুরফুরে হাওয়া আসছিল মাঝ রাতে হঠাৎ একটা অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো, ঘরটা গুমোট লাগছে কেমন একটা ধোঁয়াশা সারা ঘর জুরে!! গলাটা শুকিয়ে গেছিল উঠে জল খেলাম, ঘড়িতে রাত দুটো, হঠাৎ মনে হল জানালায় একটা ছায়া, কেউ আমায় দেখছে আমি তাকাতেই চট করে সরে গেলো কেউ কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি!! লাইট জ্বালিয়ে জানালায় গিয়ে দাঁড়ালাম, ছায়া ছায়া বাগানের মধ্যে সরসর করে কি যেন একটা চলে গেলো একটু ঝুঁকে দেখছিলাম, একটা ভীষণ ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগল চোখে মুখে কিন্তু বাইরে তো কোনও হাওয়া চলছে না!! সব গাছের পাতা স্থির!! কি মনে করে জানালাটা বন্ধ করে এসে আবার শুলাম ক্লান্ত শরীরে ঘুম নেমে এলো দ্রুত কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না, হঠাৎ মনে হল ঘরে এতো উথালপাথাল হাওয়া কেন? আবছা অন্ধকারে মনে হল দক্ষিণের জানালাটা আবার খুলে গেছে মশারি উড়ে যাবে মনে হচ্ছে উঠে জানালার দিকে এগোতেই মনে হল কোনও ছোট মেয়ে তাকিয়ে রয়েছে চোখ কচলে তাকাতেই সব ফাঁকা তবে বাইরে ঝড় উঠেছে জানালা সেই ঝড়ের দাপটেই খুলেছে বোধহয় ভালো করে বন্ধ করে শুলাম

সকালে জলখাবার দিতে এসে কাকিমা বললেন -''একি, গালে কিসের আঁচড়? ঈশ কেটে গেছে তো!! ঘরে তো আয়না নেই সেভিং সেটের ছোট আয়না বের করে দেখি পাশাপাশি দুটো গভীর খয়েরি রেখা কানের পাশ থেকে থুতনি অবধি নেমে এসেছে কাকিমা ওষুধ লাগিয়ে দিলেন, আর হাতে হনুমানজির লাল সুতো বেঁধে দিলেন যত্ন করে বহুদিন পর মায়ের কথা মনে পড়ল

কাজের চাপেই সারাটা দিন কেটে গেলো রাতে আজ জানালা সব বন্ধ রেখেছি বিশেষ কিছুই হল না দুটো দিন কাটল তুমুল ব্যস্ততায় পরদিন ঋদ্ধিদের আসার কথা ্যাকারসরা দু দিনের ভেতর সব জিনিস পৌঁছে দেবে ওদিকে প্যাকিং চলছে

কিন্তু সন্ধ্যায় ঋদ্ধির ফোন এলো ওর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, তাই এখন বাবার কাছে থাকবে কিছুদিন বাবা সুস্থ হলেই আসবে কি আর করবো, একা হাতেই সব সাজালাম অবশ্য কাকিমা ডাক্তার কাকুর ড্রাইভার, আর ওঁদের ঠিকে কাজের মাসী সঙ্গে ছিল আপাতত দক্ষিণ পূব খোলা বড় ঘরটা আমাদের বেডরুম করেছি, আর দক্ষিণের ঘরটা পালকের খেলার জন্য রেখেছি


()

 

দশদিন বাদে ঋদ্ধির বাবা সুস্থ হয়েছে খবর এলেও ওরা আসতে পারলো না হঠাৎ করে ঋদ্ধির পা ভেঙ্গে গেছিল আমাকেই ছুটি নিয়ে ছুটতে হল ইসলামপুরে ওর পা প্লাস্টার করিয়ে সব ব্যবস্থা করে ফিরলাম দোমহনীতে সন্ধ্যায় স্টেশনে নামতেই একটা ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল হঠাৎ মনে হল হাওয়ায় ভেসে আসছে কিছু কথা, কে যেন সাবধান করছে 'ফিরে যা' বলে  পা দুটো যেন কেউ চেপে ধরেছে আমার

ধুর, কি সব যে ভাবি আমি, জোর করে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে চললাম ডাক্তার কাকুর বাড়ি স্টেশন থেকে হাঁটা পথ, সেই পোড়া সাহেবের বাংলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে হয়, হঠাৎ আমার মনে হল বাংলোর ভাঙা গেটের পাশে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আমায় লক্ষ্য করছে ভর সন্ধ্যায় একা একটা মেয়ে ওখানে কি করছে!! বুকটা কেঁপে উঠল কেমন তবে গ্ৰামের বাচ্চারা একা এই সব বনে জঙ্গলে ঘোরে, ছোটবেলা আমরাও ফল পাড়তে ঢুকতাম বাগানটার দিকে তাকিয়ে এত বছর পর আমার গাটা কেমন ছমছম করে উঠল তাড়াতাড়ি পা চালালাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল কেউ আমায় অনুসরণ করছে, শুকনো পাতায় কেমন একটা সরসর শব্দ পিঠে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগল, কিন্তু ঝড় তো বন্ধ হয়ে গেছে!! পাশে কারোর বাড়িতে শঙ্খ বেজে উঠল, তুলসী তলায় প্রদীপ দিচ্ছিল কেউ মা দিত একসময়, সংস্কার বশে হাত দুটো কপালে উঠে এলো

ঘরে ঢুকতেই কাকিমা উপর থেকে ডাকলেন, বললেন চা খেয়ে আসতে আমি ব্যাগ রেখে উপরে চলে গেলাম বেসিনে হাত ধুচ্ছিলাম, কাকিমা বললেন -'',একি, পিঠে এতো রক্ত কেন অপু শার্টটা তো ছিঁড়ে গেছে আমি কিছুই না বুঝে পিঠে হাত দিলাম, এতক্ষণ যেটাকে ভাবছিলাম ঘামে ভিজে শার্টটা পিঠে লেগে রয়েছে, যে রক্ত, তাড়াতাড়ি শার্ট খুলে দেখি দুটো বড় বড় ছেঁড়া দাগ, একই ভাবে ধারালো কিছুর আঁচড় পিঠেও কিন্তু কোথাও খোঁচা খাইনি ব্যথাও নেই তেমন কাকু সঙ্গে সঙ্গে ড্রেসিং করে ইনজেকশন দিয়ে দিলেন দুজনেরই মুখ গম্ভীর কাকিমা বললেন -''যতদিন বৌ না আসছে তুমি ওপরে আমাদের পাশের ঘরে থাকো অপু নিচটা বড্ড ফাঁকা ''

-''আরে কাকিমা, কিছু হবে না আমি একা থাকতে পারি, বহু থেকেছি ওদেরকে ছেড়ে '' আমি একটু হেসে বললাম

 

 দু দিন পর অফিসের থেকে একটা লোণ ভেরিফিকেশনের কাজে গেছিলাম, সন্ধ্যায় ফিরছি, গলির মুখে অন্ধকারে দেখি সেই বাচ্চা মেয়েটা, আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে আজ মেয়েটাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো ভাবলাম, কিন্তু তক্ষুনি সুর করে মুঠোফোনটা জানান দিল কেউ আমায় ডাকছে

-''বাবাই, আমাদের এসে নিয়ে যাও আর তোমায় ছাড়া ভালো লাগছে না প্লিজ বাবাই '' আমার মেয়ে পালকের আদুরে গলা

-''পরের সপ্তাহেই নিয়ে আসবো মামনি, মাম্মার পা টা ঠিক হোক''

-'' না, আমি আর এক দিনও থাকবো না তোমায় ছেড়ে, প্লিজ বাবাই তুমি চলে এসো'' পালকের এক জেদ বড্ড বাবা ঘেঁষা, ঋদ্ধি একটু শাসন করে, পড়ায়, আর আমি শুধুই খেলি তো তাই আমায় বন্ধু ভাবে আমারও মন ছুটে গেছিল বহুদিন পরিবার ছাড়া এখানে পড়ে রয়েছি ঘর তো গুছানোও শেষ ওদের আনলেই হয় প্লাস্টার তো কাকুই কেটে দিতে পারবেন জলপাইগুড়িতে না হয় কোনও ডাক্তার দেখিয়ে নেবো এসব ভাবতে ভাবতেই ঘরে ঢুকলাম, আমি তালা খুলছি, মনে হল ঘরের মধ্যে ঝনঝন করে কিছু ভেঙে পড়ল তাড়াতাড়ি আলো জ্বালিয়ে দেখি আমার আর পালকের একটা বাঁধানো ফটো দেওয়াল থেকে খুলে পড়ে ভেঙ্গে গেছে সারা ঘরে কাঁচের টুকরো ছড়ানো সব দরজা জানালা বন্ধ ছবির পেরেকটা দেওয়ালে রয়েছে তবে পড়ল কি করে, এক সপ্তাহ ধরে তো ঝুলে ছিল এভাবেই যেন মনে হচ্ছে কেউ ছুড়ে ফেলেছে দেওয়ালে একটা মোটা টিকটিকি আমার সমর্থনে ডেকে উঠল বেটাই বোধহয় ফেলেছে ফটোটা, সাবধানে ঘরে ঢুকতেই লোডশেডিং আমি ওদিকে জুতো খুলে ফেলেছি, রান্নাঘরে মোমবাতি আছে, কিন্তু কাঁচের টুকরো পার হয়ে ওদিকে যাবো কি করে ? মোবাইলটা বার করে টর্চ জ্বালতে গিয়ে দেখি সুইচ অফ!! এখন অন্ধকারে বসে থাকতে হবে কতক্ষণ, এদিকে আলো একবার গেলে দু তিন ঘণ্টা থেকে দু তিন দিন নাও আসতে পারে কয়েক সেকেন্ড যেন কয়েক যুগ একটা খসখস শব্দ...অস্পষ্ট নিশ্বাসের আওয়াজ .... মনে হল ঘরে আমি একা না, আরও কেউ আছে, ভয়টা শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে শুরু করে আমি ঠিক বুঝতে পারছি কেউ রয়েছে

 হঠাৎ ঘষা কাচের জানালা ভেদ করে হেড লাইটের আলোয় কিছুক্ষণের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঘরটা আমি দু লাফে দরজা খুলে বেরিয়ে আসি বাইরে ডাক্তার কাকু ফিরলেন গাড়ি নিয়ে ময়নাগুড়ি থেকে 

 

()

 

 অবশেষে সব বাঁধা কাটিয়ে বৌ মেয়েকে এনে তুললাম এই বাড়িতে আসলে আমার মনের অবচেতনে ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা, দোমহনী থেকে চলে যাওয়া, এতো বছর পর ফিরে নিজের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে থাকতে আসা, পরিবার থেকে একা এভাবে দূরে থাকা সব কিছুর একটা এফেক্ট কাজ করছিলো ওরা এসে যাওয়ায় বেশ হাল্কা লাগছিল

বাগানের কোনে আমার একটা দোলনা ছিল, লোহার রডটা এখনো রয়েছে, দোলনাটা নেই, কাকুকে বলে মেয়ের জন্য একটা দোলনা ঝুলিয়ে দিয়েছি গরমের ছুটি চলছে খুললে কাকু ওকে ভর্তি করে দেবেন বলেছেন

 সেদিন অফিস থেকে ফিরে গেট দিয়ে ঢুকছি, দেখি পালক আরেকটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে বেড়ার ধারে সেই মেয়েটা, পালকেরই বয়সী

আমায় দেখে পালক ছুটে এলো, মেয়েটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে গেলো

-''তোমার নতুন বন্ধু হয়েছে, বেশ কি নাম ওর?''

-'' তো জুঁই, নতুন কোথায়, তো আমার পুরানো বন্ধু ''

-''কি করে!! তুমি তো সবে এসেছ এখানে'' কথা বলতে বলতে আমরা ঘরে ঢুকি ঋদ্ধি টিভি দেখতে ব্যস্ত

ওরা চলে আসায় বাড়িটা সত্যিই জমজমাট হয়ে উঠেছে রাতে খাওয়ার পর শুতে গিয়ে দেখি পালক গান গেয়ে ওর পুতুলদের ঘুম পারাচ্ছে আমি ওকে পাজা কোলে করে তুলে চটকা চটকাতে বিছানায় নিয়ে গেলাম বাবা আর মেয়ের এই সব খুনসুটি আমাদের প্রতিদিন চলে খেলতে খেলতে বললাম -'' মেয়েটার কথা কি যেন বলছিলে তুমি .....''

-''ওকে স্বপ্নে দেখতাম তো ওর নাম জুঁই ''

হঠাৎ ঝনঝন করে কাচ ভাঙার শব্দে চমকে উঠলাম দু জনেই টেবিলে একটা সিরামিকের ফুলদানি ছিল, একটা বড় ডল পুতুল তার পাশেই দাঁড় করিয়ে রেখেছিল বোধহয় পালক, লম্বা পুতুলটা ফুলদানিটা নিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়েছে আমার হঠাৎ সেই ফটো ভাঙার গল্পটা মনে পড়ল দক্ষিণ দিকের জানালায় আবার একটা ছায়া সরে গেলো যেন ঋদ্ধি ফুলদানি ভাঙার শব্দে ছুটে এসেছিল, খোলা জানালাটা দেখে বলল -''নিশ্চই তোমার কাজ!! ওটা খুললে মেয়ের ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে হাওয়ায় আমার কত কাজ বাড়ল বলো তো ''

ঝাঁট দিয়ে মুছে যখন শুতে এলো বললাম -''জানালাটা তুমি বন্ধ করেছিলে? কখন ?''

-''বিকেলেই সব বন্ধ করি রোজ, যা মশা এখানে বন্ধ না করলে টিকতে পারবে না ''

আমি যে জানালা খুলিনি ওকে আর বললাম না একটা মিস্ত্রি ডেকে জানালাগুলো ঠিক করাতে হবে

মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলো, বহুদিন পর স্বপ্নে মা কে দেখলাম মা আমার এই দোমহনীতে আসায় রেগে গেছে বলছে এখনি ফিরে যেতে দরকার হলে চাকরি ছেড়ে দিতে আমার কোনও কথাই মায়ের কানে গেলো না ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো গুমট গরমে উঠে ভাবছি জানালাটা খুলব, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম জানালা খোলা, বাইরেও হাওয়া নেই কোনও গাছের পাতা নড়ছে না ফ্যানটা বাড়িয়ে দিয়ে শুতে যাচ্ছিলাম, পরিষ্কার দেখলাম একটা বাচ্চা মেয়ে জানালায় চোখ দুটো যেন জ্বলছে পালকের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রয়েছে এই প্রথম আমি ভয় পেলাম, ভীষণ ভয় পালক আমার জীবন, পালককে তুলোয় মুড়ে রাখি আমরা, ঋদ্ধির পালক হওয়ার আগে অদ্ভুত ভাবে দুটো মিস ্যারেজ হয়েছিল পালক হওয়ার সময় বাপের বাড়ি ছিল টানা নয় মাস পালকের জন্মের আগ দিয়ে ওকে সাধ দিতে মা বাড়ি এনেছিল সেদিন পড়ে যায় কোনও ভাবে যমে মানুষে টানাটানি চলেছিল দুদিন তারপর পালকের জন্মর সঙ্গে সঙ্গেই কিছু জটিলতায় ওর জরায়ু বাদ গেছিল তাই পালককে আমরা চোখে হারাই আবার জানালায় তাকাই কিন্তু আর মেয়েটাকে দেখতে পাইনা বাকি রাতটা আর ঘুম হয় না আমার

দু দিন পর অফিস থেকে ফেরার পথে দেখি মাধব আমাদের দুধ ওয়ালা পালককে নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে কোথায় গেছিল পালক ওর সঙ্গে!!  ডেকে জিজ্ঞেস করতেই মাধব বলল -''পোড়া সাহেবের বাংলোয় ঢুকেছিল খুকি আমি বাংলোর সামনের বাগানে ঘাস কাটতে গিয়ে দেখি খুকি ভাঙা দালানের সিঁড়িতে বসে পেয়ারা খাচ্ছে কার সঙ্গে এসেছে বলেই না আমি জোর করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম বাবু বাংলোটা ভালো না খারাপ হাওয়া চলে ওখানে''

আমাদের পালক গেটের বাইরে বেরিয়ে দুটো গলি পার করে ধ্বংসস্তূপে ঢুকেছিল আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না কিন্তু মাধব খুব ভালো ছেলে, পরোপকারী মিথ্যা বলবে কেন! আর পালকের হাতে এখনো একটা আধ খাওয়া পেয়ারা যার ভেতরটা লাল এই পেয়ারা বাংলোতেই পাওয়া যেত এত বছর পরও গাছটা রয়েছে !! অবশ্য পাশে অন্য গাছ হয়েছে হয়তো!!

 পালককে বললাম -''একা অতদূর কি করে গেলে তুমি ?''

-''জুঁই নিয়ে গেলো তো ''

-'' মেয়েটা, কোথায় থাকে ?''

-''ওদের বাড়িতে ... ওটাই তো ওদের বাড়ি ''

চমকে উঠলাম,বললাম -" কোথায় তোমায় জুঁই? ''

-''আসছিল তো, তোমায় দেখে চলে গেলো কোথায় ''

-''মাম্মাকে না বলে এভাবে আর যাবে না কোথাও '' বাড়ি ফিরে ঋদ্ধিকেও বললাম -''টিভি দেখাটা কমিয়ে মেয়ের দিকে নজর দাও আজ বাড়ির বাইরে চলে গেছিল ''

-'' তো বাগানে খেলছিল পাঁচ মিনিট আগেই দেখেছি কি বলছ তুমি? কাকিমাও দেখেছেন এই তো ঘরে ঢুকলাম আমরা, এর মধ্যে বাইরে ....''

একটু অবাক হলাম, তারপর মনকে বোঝালাম হয়তো আধঘণ্টা আগে দেখেছে এখন দোষ ঢাকতে এসব বলছে

কিন্তু রাত থেকেই পালকের জ্বর এলো মাঝ রাতে একশো চার জ্বর দেখে আমি ডাক্তার কাকুকে ডাকলাম

উনি সব দেখে বললেন-'' ভাইরাল, ওয়েদার চেঞ্জ, জল চেঞ্জ এসব থেকে হয় এমন তিনদিন থাকবেআপাতত ্যারাসিটামল দাও''

কিন্তু তিন দিনেও জ্বর কমল না বরঞ্চ সারা গায়ে রেশ বের হল একরকম, ভেঙ্গে গেলে কস ঝরছিল হাম বা পক্স নয় ডাক্তার কাকু এক গাদা ব্লাড টেস্ট করতে দিলেন পরের দিন গাড়ি করে নিজেই শিলিগুড়ি নিয়ে গেলেন বড় একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে তিনিও বললেন এলার্জি।। তার জন্যই জ্বর ওষুধ দিলেন কিন্তু আটদিনেও জ্বর কমল না পালক যেন একটা জীবন্ত কঙ্কাল, হাড় চামড়া ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না

বিশু কাকু বাবার বন্ধু, বাজারে বড় মুদি দোকান আছে খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন পালক খায় না কিছুই, কথাও বলে না, জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে শুধু রাতে জানালা বন্ধ করতে দেয় না কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠে

সব শুনে গম্ভীর হয়ে বিশুকাকু বললেন -'' অপু, ছোটবেলা তোমার যে হাওয়া লেগেছিল তাই ওর লেগেছে ওকেও অঘোরী বাবার কাছে নিতে হবে ওকে বাঁচাতে পারবে শুধু অঘোরী বাবা''

-" কিন্তু বাবাকে পাবো কোথায়?'' এই অঘোরী বাবার নাকি প্রচুর বয়স, আগে তিস্তার ধারে শ্মশানেই থাকত তবে মাঝে মাঝে জলপেশ্বর মন্দিরে বসে আমাকেও ছোটবেলা এই বাবাই জীবন দান দিয়েছিল তাই এখানে এসে কৃতজ্ঞতা বশত ওর খোঁজ করেছিলাম কিন্তু পাইনি ওকে

-''কাল ঘোর অমাবস্যা, বাবা ময়নাগুড়ি বা জলপেশ্বরের শ্মশানে থাকবে হয়তো তুমি কাল সকালেই মেয়েকে নিয়ে যাও আর আজ রাতটা খুব সাবধান একটু ঠাকুরের ফুল রেখো ওর বালিশের নিচে পারলে একটু ঠাকুরের সুতো দিয়ে বন্ধন দাও আমি শীতলা মায়ের থানের লাল তাগা আর ফুল পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার বোধহয় ফিরে আসা উচিত হয়নি অপু''

আমি পালকের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম কি হতে পার ওর সঙ্গে এক মুহূর্ত ওকে একা ছাড়বো না আমি লোকনাথ বাবা থেকে সব ঠাকুর কে ডাকতে শুরু করলাম

একটু পরে বিশুকাকুর এক কর্মচারী লাল তাগা আর প্রসাদি ফুল নিয়ে এলো বলল কাকু নিজেই আসছিলেন আচমকা একটা সুপুরি গাছ ভেঙ্গে পড়েছে গায়ে, শেষ মুহূর্তে সরে গেছিলেন বলে মাথায় লাগেনি, তবে হাঁটুতে আর কোমরে ভালই লেগেছে

ডাক্তার কাকু রাত দশটায় একবার পালককে দেখতে এলেন, সব শুনে বললেন -"তোমার অসুখ অঘোরী বাবাই সারিয়েছিল সবাই বলে ঠিকই কিন্তু তোমার বাবা বালুরঘাটে গিয়ে চিকিৎসা করেছিলেনওকে আবার চল শিলিগুড়ি নিয়ে যাই আমিও যাবো কাল এবার এর শেষ দেখবো '' আমি এক দোটানায় দুলতে থাকি

মাঝ রাতে প্রবল ঝড় উঠেছিল বাগানে ঋদ্ধি মেয়ে কোলে ঠাকুরের ফুল নিয়ে বসা, পালকের কোমরে লাল তাগা পরিয়ে দিয়েছে ভোর রাতে ঝড়ের তাণ্ডব কমতেই কাকু কাকিমা নেমে এলেন অচৈতন্য পালকের পালস দেখে কাকু বললেন -''এখনো সময় আছে ওকে কলকাতা বা শিলিগুড়ি নিয়ে যাই চলো"

আমি বললাম -''না কাকু, আজ মেয়েকে অঘোরী বাবার কাছেই নিয়ে যাবো ভাবছি একবার দেখে নেই ''

কাকিমা আমায় সমর্থন করলেন কাকু বললেন –“চলো, আমিও যাবো তাহলে''


()

অবশেষে মেয়ে নিয়ে আমরা চললাম অঘোরী বাবার খোঁজে এসব অঘোরী সন্ন্যাসীরা শুনেছি অখাদ্য কুখাদ্য এমনকি মরা মানুষ খায় বীভৎস রকম নোংরা হয় শ্মশানেই থাকে। কাপড় ও পরে না। খুব হিংস্র হ শব সাধনা করে। ছেলেবেলায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হলেও কিছুই মনে নেই

 অবশেষে বিকেলে জলপেশ্বর মন্দিরের অদূরে শ্মশানে অঘোরী বাবার দর্শন পাওয়া গেলো, এক প্রাচীন পিপল গাছের নিচে ধুনো জ্বালিয়ে বসে ছিল বাবা সামনেই একটা মরার মাথার খুলিতে হলুদ রঙ্গের থকথকে ঘিলুর মত কি একটা !! আমরা পালককে নিয়ে পৌঁছাতেই চোখ খুলল টকটকে লাল চোখ সবার উপর ঘুরতে ঘুরতে আমার উপর স্থির হল চিৎকার করে উঠল -''তুই আবার কেন এসেছিস?''

কেঁপে উঠলাম আমি আমায় কি করে চিনল!!

''বাবা, আমার একটাই মেয়ে, ওকে বাঁচান .. '' ঋদ্ধি মেয়েকে নামিয়ে দিল বাবার পায়ের কাছে 

পালকের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে বাবা বলল -''শেষ করেই তো এনেছিস আমি কি করবো? ''

-''বাবা আপনি ছোটবেলায় আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এইবার ওকেও ফিরিয়ে দিন '' 

-''এসেছিস কেন এখানে? বলেছিলাম না কখনো এই এলাকায় আসবি না আবার কচি মেয়েটাকেও এনেছিস !!''

-''বাবা ছোটবেলার কথা কিছুই তেমন মনে নেই, আবার বদলি হয়েছিলাম এখানে ''

-''তিরিশ বছরে সে আরও শক্তিশালী হয়েছে, এবার সে ছিনিয়ে নেবেই.... কালচক্রের আবর্ত বুঝিস ? সেই রাশি নক্ষত্র আবার এক হয়েছে তোদের নিয়তি তোদের টেনে এনেছে এখানে সে প্রতিশোধ নেবেই আমি আবার বসবো কাল ভৈরবীর পূজায়.... কিন্তু তাজা প্রাণ চাই প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ কে দেবে বলিদান!!"

হেঁয়ালির মত এসব কথার মানে বোঝা দায় পা জড়িয়ে ধরলাম, -''বাবা আমার মেয়েটাকে বাঁচান আমি চির জীবন মনে রাখবো''

অনেক অনুরোধ উপরোধের পর অঘোরী বাবা বসল পূজায় আমাদের কিছু জিনিস কিনে আনতে বলল সে সব আসলে যজ্ঞের সব আয়োজন সম্পন্ন করে অঘোরী বাবা বলল -''আমি এবার পূজায় বসব, আমায় কোনও প্রশ্ন করবি নাআমি যা বলবো তাই করবি তোরা পূজা শেষে মেয়ে নিয়ে চলে যাবি বহুদূরে ফিরেও তাকাবি না এদিকে আমি ডাকলেও ফিরে তাকাবি না, আর কখনো আসবি না এদিকে ''

 একটা ষড়ভুজ একে ছয় রঙের গুড়ো ছড়িয়ে ছটা প্রদীপ জ্বালল, পালককে কোলে নিয়ে ঋদ্ধিকে বসতে বলল ঠিক মাঝখানে বলল -''যাই হয়ে যাক, মেয়েকে কোল থেকে নামাবি না, এই ষড়ভুজের বাইরে আসবি না ''

 আমার গায়ে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিয়ে একটা লাল কাপড় দিল বলল সব ছেড়ে ওটা পরে নিতে

কাপড় ছেড়ে আসতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল -''আক্রমণ তো তোর উপরেও হয়েছিল দেখছি, গালে, পিঠে তবুও তুই ফিরিসনি? আবার মেয়েটাকে বলির পাঁঠা করেছিস!!''

ডাক্তার কাকু আপ্ন মনে বললেন-'' ওদেরকে বোধহয় আমাদের বাড়িতে রাখাই ভুল হয়েছে বাড়িটার কিছু দোষ ছিল হয়ত, তবে ওদের ক্ষতি হবে বুঝিনি''

-"ওকে টেনে এনেছে প্রেতযোনি যার বদলে জীবন ফিরে পেয়েছিল দোমহনীর যেখানেই থাকত প্রেতযোনি ওকে সেখানেই আক্রমণ করত তিরিশ বছরে সে আরও শক্তিশালী হয়েছে আমি ওকে বেঁধে রেখেছিলাম এই গ্ৰামের আওতায় কিন্তু এখন কয়েক শো মাইল দূরেও আক্রমণ করতে সক্ষম তোর দুই সন্তানকে আগেই ছিনিয়ে নিয়েছে কোনও ভাবে ওর আওতায় এসেছিলি তোরা এবার নজর পড়েছে মেয়ের দিকে''

ঋদ্ধির প্রথম মিস ্যারেজ হয় চার মাসে শিলিগুড়ি এসেছিলাম আমরা, ওর পিসির বাড়ি দ্বিতীয়বার পাঁচ মাসে মালবাজার এসেছিলাম আমার ছোট কাকুর বাড়ি ভাইয়ের বিয়েতে

খোলা জায়গা হলেও আবহাওয়া গুমোট হয়ে উঠেছিল গাছের পাতা নড়ছে না, চারিদিকে কেমন হাড়হীম করা নৈঃশব্দ্য বহুদূরে কোথাও নিশাচর কোনও পাখি ডেকে উঠল কর্কশ স্বরে হাওয়া নেই তবু প্রদীপ শিখা গুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে ষড়ভুজের দুই কোনে দুটো মরার মাথার খুলি রেখে কি সব ছিটিয়ে শুরু হল মন্ত্রোচ্চারণ একজোড়া পায়রা বলি দিয়ে রক্ত ছিটিয়ে দিলেন চারদিকে ডাক্তার কাকু একমনে বসে সব দেখছিলেন হঠাৎ উনি অস্ফুটে বলে উঠলেন -'অসম্ভব এটা কে? '

ওঁর দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে দেখি মেয়েটা, যাকে বেশ কয়েকবার দেখেছিজুঁই, এই নাম বলেছিল পালক পিপল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রয়েছে এদিকে দোমহনী থেকে এতদূর কি করে এলো? কার সঙ্গে এলো?

-''কি চাস তুই? ওকে ছেড়ে দে?'' অঘোরী বাবা চিৎকার করে উঠল

-''আগে আমার প্রাণ ফিরিয়ে দে '' মেয়েটা হিসহিসে গলায় বলল

-''কোথায় ফিরাব? দেহ তো নেই তোর তো ছায়া শরীর'' বলেই অঘোরী বাবা কিছু ছুড়ে দিল ওর দিকে কাচের পুতুলের মত গুড়ো গুড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাচ্চাটা একটা আর্তনাদের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে ছটা প্রদীপের দুটো নিভে গেলো

সেদিকে তাকিয়ে বাবা চিৎকার করে উঠল ''রক্ত চাই!!'' আমার দিকে এগিয়ে দিল একটা ছুরি ইশারায় দেখাল হাত কেটে রক্ত অর্ঘ্য দিতে যজ্ঞের আগুনে পালকের নির্জীব শরীরটার দিকে তাকিয়ে আমি হাতের তালু কেটে রক্ত অর্ঘ্য দিলাম চোখ মেলে তাকাল পালক, টকটকে লাল চোখ স্থির দৃষ্টি হঠাৎ করে একটা ঝড়ো হাওয়া ধেয়ে এলো মনে হল সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে হঠাৎ দেখি  সেই মেয়েটা যেখানে গুড়ো হয়ে পড়েছিল, একটা ছোট বালির ঘূর্ণি আবার অবয়ব তৈরি করছে ধীরে ধীরে কাচের মত স্বচ্ছ জুঁইয়ের অবয়ব তৈরি হল, মেয়েটার মুখে সারল্য নয়, ফুটে উঠেছে হিংস্রতা, দু হাত বাড়িয়ে পালককে ডাকছে যে পালক এই কদিন মাথা তোলেনি, এক লাফে উঠে বসল ছুটে যেতে চাইল ওর দিকে ঋদ্ধি শক্ত হাতে ধরে রেখেছিল মেয়েকে অঘোরী বাবার ছেটানো মন্ত্রপূত জল এবারে কিছুই কাজে এলো না মেয়ে আমার হিংস্র হয়ে উঠেছে

 যজ্ঞের একটা জ্বলন্ত কাঠ ছুড়ে দিল বাবা, এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল মেয়েটার অবয়ব পালক নেতিয়ে পড়ল আবার বাবা এক কোপে একটা ডাব কেটে আমার হাতে দিয়ে বলল -“নদীর চড়ে গিয়ে দাঁড়া, তিন বার আয়, আয়, আয় বলে ডাকবি, তারপর ডাবের মুখ বন্ধ করে এক নিশ্বাসে এখানে ছুটে আসবিআর জলটা মেয়েকে খাইয়ে দিবি

আমি ডাব হাতে ছুটলাম, মনে হল হাজারটা শক্তি আমায় টেনে ধরে রাখতে চাইছে দুশো মিটার পথ আর শেষ হচ্ছে না পূব আকাশে শুকতারা জ্বলজ্বল করছে ভোর হওয়ার আগে পূজা শেষ হবে তো?

পায়ে লাগছে তিস্তার ঠাণ্ডা জলের স্পর্শ ডাবের মুখ খুলে আবার ঈশ্বরকে স্মরণ করে চিৎকার করে ডাকলাম, “আয়, আয়, আয় কতগুলো শিয়াল কুকুর এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল কাছেই আমি ডাবের মুখ বন্ধ করে এক নিশ্বাসে  ছুটে ঋদ্ধিদের কাছে পৌঁছে মেয়ের মুখ ফাঁক করে ডাবের জল ঢেলে দিলাম কস বেয়ে কিছুটি গড়িয়ে পড়ল কাশতে কাশতে আবার উঠে বসল পালক কেমন ঘোলাটে দৃষ্টিতে চাইল আমাদের দিকে আরও দুটো প্রদীপ নিবে গেছে ততক্ষণে

অঘোরী বাবা সবার কপালে যজ্ঞের টিকা পরিয়ে সবার হাতে একটা করে মন্ত্র পূত ফুল দিয়ে বলল -''চলে যা, যতদূর যাবি তত তাড়াতাড়ি মেয়ে সুস্থ হবে পথে বাঁধা এলে এই ফুল ছুঁড়ে দিবি আর কখনো আসবি না এদিকে কোনও দিনও না মেয়ে সুস্থ হলে কোন কালীবাড়িতে পূজা দিস সবাই মিলে ''

ডাক্তার কাকু গাড়ির দিকে পা চালাল আমাদের নিয়ে মনে হল পিছনে পালক কাঁদছে,- “ বাবাই মাম্মা, আমায় ফেলে যেও না আমায় নিয়ে যাওঋদ্ধির কোলে অচেতন পালক আর তাকাচ্ছে না

অঘোরী বাবা ডাকল –“ আরে, এটা কি ফেলে গেলি, নিয়ে যা

খুব ইচ্ছা করছিল পিছনে চাইতে কিন্তু বাবার সাবধান বানী মেনে গাড়িতে উঠলাম ভোর হয়ে এসেছে, দোমহনী আর নয় আমার পরনে লাল পট্ট বস্ত্র, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত ওভাবেই গাড়িতে বসে ভাবছি কোথায় যাবো, ডাক্তার কাকুর কথা মত ড্রাইভার গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে ইসলামপুরের পথে সকাল সকাল পৌঁছলাম শ্বশুরবাড়ি সারাটা পথ কেউ কথা বলিনি

আমাদের পৌঁছে দিয়ে ডাক্তার কাকু বললেন -''তোমাদের জিনিস সব আমি পাঠিয়ে দেবো আর কক্ষনো এসো না ওদিকে ''

-''কাকু একটা প্রশ্ন করি, বাচ্চাটা কে ছিল ? আপনি অসম্ভব বলেছিলেন কেন? কি হয়েছিল''

কাকু চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ তারপর বললেন -''ভরতের মেয়ে জুঁই তিরিশ বছর আগে আমার কম্পাউন্ডার ছিল ভরত যেদিন তোমায় অঘোরী বাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় পরদিন ভোর রাতে মেয়েটার নিষ্প্রাণ দেহটা পড়ে ছিল পোড়া সাহেবের বাড়ির বাইরে শিউলি গাছের তলায় মেয়েটা রোজ ফুল তুলতে বার হত তবে মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি বাচ্চা বলে ওকে তিস্তার চড়ে গোড় দেওয়া হয়েছিলতবে অনেকেই নাকি ওকে আমাদের বাগানে দেখেছে ''

ছোট বেলায় মা বলত রাতে কেউ ডাকলে সাড়া দিবি না ওসব নিশির ডাক, ডাবের জলে তোর প্রাণ বন্দী করে নিয়ে যাবে পিতৃ স্নেহে অন্ধ হয়ে আজ আমি কি কারোর সন্তানের জীবন কেড়ে নিলাম? মানতে পারছিলাম না আপাতত পালককে ডাক্তার দেখাতে ছুটতে হল প্রায় দু সপ্তাহ পর মেয়ে আবার সুস্থ হল আমি চাকরি ছেড়েই দেবো ভেবেছিলাম কিন্তু আমার রেকর্ড দেখে হেড অফিস মালদায় বদলি করল আবার

(৬)

ডাক্তার কাকু রোজ ফোন করে পালকের খোঁজ নিতেন প্রায় দু মাস পর একদিন কাকুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলাম -''আর কোনও অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল ওখানে, সেই রাতে কোন অস্বাভাবিক মৃত্যু বা ....''

আমার কথার ভেতরেই কাকু বলে উঠলেন, ''ওসব ভেবো না, ভাবলে কষ্টই পাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল মনে করো ''

কিন্তু আমার মনের ভেতর একটা কাটা বিঁধে ছিল শান্তি পেতাম না মেয়েকে আদর করতে বসলেই মনে একটা অনুশোচনা জেগে উঠত ব্যাঙ্কের পিওনকে একদিন ফোনে জিজ্ঞেস করলাম কথাটা

-''সার, দিন ভোরে আমাদের স্টেশন মাষ্টার বাবুর ছোট ছেলে ঋজু মারা গেছিল জলে ডুবে ওদের বাড়ির পাশের পুকুরে ভোর বেলায় কী করতে উঠেছিল কে জানে !!''

******

পঁচিশ বছর পার করেছি, তবু মনে হয় নিজেকে ক্ষমা করিনি মেয়ে একটা স্কুলে পড়ায়, ওর বিয়ে হয়ে গেছে কাছেই, জামাই প্রফেসার পাঁচ বছরের যমজ নাতি নাতনি আমাদের কাছেই থাকে সারাদিন সেদিন ওদের খেলার মাঝে দুটো নাম খুব কানে বাজল, জুঁই আর ঋজু বললাম -''ওরা কারা গো? স্কুলের বন্ধু? কোথায় থাকে ?''

-''না গো, ওরা স্কুল যায় না স্বপ্নে আসে ''

কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম জানি না, হঠাৎ মুঠো ফোনটা বেজে ওঠায় সম্বিত ফিরে পেলাম জামাইয়ের ফোন, জানালো ময়নাগুড়ি কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছে পরের সপ্তাহেই জয়েনিং পালক আপাতত চাকরি ছেড়ে দিয়ে সঙ্গে যাবে হাত থেকে মুঠো ফোন খসে পড়ল ময়নাগুড়ি কলেজ তো দোমহনীর থেকে তিন কিলোমিটার মাত্র!! 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে

  বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে দেবদত্তা ব্যানার্জী   একটু শীতলতার খোঁজে   গরমের ছুটির...