শনিবার, ২৭ জুন, ২০২০

তালাশ এ জান্নত

তালাশ জান্নত

দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

অগর ফিরদউস বা রয়- -জমিন অস্ত ,

হামিন অস্ত - -হামিন অস্ত - -হামিন অস্ত

বরফের মুকুটের উপর কুসুম রঙ্গা বলটা দেখা দিতেই ডাল লেকের জলে সূর্যের প্রথম রশ্মি জাল ছড়িয়ে পড়ল তির তির করে কাঁপছে কাজল কালো জল মৃদু হাওয়ায় ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে জলের উপর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ ভাঙার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই শ্বেত শুভ্র ঝকঝকে পীর পাঞ্জাল হাসছে আরফা ওদের হাউস বোটের সামনের খোলা বারান্দার মত অংশে এসে দাঁড়ায় জান্নত...এটাই ওর জান্নত সকালের এই সময়টা ওর বড্ড প্রিয় কেমন এক পবিত্রতার রেশ এই স্নিগ্ধ সকালে ওর অন্তরকে ছুঁয়ে যায় আব্বু আজকাল আর সকালে ওঠে না গুলসন দেরিতে ওঠে কিই বা করবে এত সকালে উঠে!! সেই আগের মত ব্যাস্ততা আর নেই আরফা একা একাই এই মিষ্টি সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করে বসন্তের ছোঁওয়া লেগেছে উপত্যকার গায়ে শীত বিদায় নিয়েছে কচি পাতায় সেজে উঠছে চিনার গাছগুলো ফুলের কলি এসেছে গাছে গাছে এই সময় উপত্যকা জুড়ে টুরিস্টের ঢল নামত আগে হাউসবোটগুলোয় তিল ধারণের জায়গা থাকত না কতবার তো আরফারা নিজেদের ব্যবহারের ভালো ঘর দুটো টুরিস্টদের ছেড়ে দিয়ে সবাই মিলে চিলেকোঠার ঘরে কাটিয়েছে কত রাত আব্বু বলত টুরিস্ট হল আমাদের মেহমান, আর মেহমান আল্লাহর রূপ ওদের যত্ন করলে আল্লা আমাদের দেখবে ডালের জলে রঙ্গিন শিকারার মেলা বসত সকাল হলেই রকমারি ফুলের ঝুড়ি নিয়ে পসরা সাজিয়ে শিকারা ভাসাত কাশ্মীরি ললনারা আর এখন…, শুনশান চারপাশ

আজ কত গুলো বছর হয়ে গেল সেই যে টুরিস্ট আসা কমে গেল, আর তেমন ভিড় হয় না এই কাশ্মীরে খুব কম টুরিস্ট আসে আজকাল, ডাল লেকের সব হাউস বোটের একই অবস্থা গত বছর পুরো সিজিনে হাতে গোনা কয়েকজন এসেছিল আরফাদের জান্নতে এবার এখনো বৌনি হয়নি

হেমন্তের শুরুতে লাল চিনারের শোভা দেখতে পাঁচ মাস আগে শেষ টুরিস্ট এসেছিল ওদের হাউস বোটে তারপর পুরো শীতটা বরফে ঢেকে গেছিল উপত্যকা এবার প্রচুর বরফ পড়েছিল, ডাল লেক জমে গেছিল

আরফা ছোট বেলায় দেখত শীতেও কত বিদেশিরা আসত বরফ দেখতে এখন তো বিদেশিরা ভয়ে আসেই না রাজ্যে বেহেস্তের জান্নতে যেন কোন দোজখের শয়তানের নজর লেগেছে তাই আজ ভূস্বর্গের এই হাল এই একটা হাউস বোট থেকে আব্বু একসময় ওদের এতোগুলো ভাই বোনকে মানুষ করেছিল কি সুন্দর রঙ্গিন ছিল সেই সব দিন

একটা শিকারা ডাল লেকের বুক চিরে কিছু সবজি নিয়ে এগিয়ে চলেছে, মাঝ বয়েসি রনবীর চাচা বাজারে চলেছে আনাজ বিক্রি করতে আরফাকে দেখে হাত নাড়ে চাচা

-'সৎশ্রিআকাল চাচা' মিষ্টি হেসে আরফা হাত নাড়ে রনবীর চাচার এক টুকরো জমিতে সোনা ফলে, আগে ফুলের চাষ করত চাচা ওঁর একটাই ছেলে ছিল শক্তি টুরিস্ট গাড়ি চালাত ভারি ভালো ছেলে ছিল আরফাদের হাউস বোটে কেউ গাড়ির খোঁজ করলে ওরা শক্তিকে ডেকে দিত টুরিস্টদের খুব যত্ন করে ঘুরিয়ে দেখাত সব শক্তি তিনবছর আগে এক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে ছেলেটার অথচ দাঙ্গাবাজ ছিল না কপাল খারাপ ছিল ওদের  

আরফার দুই ভাই পরভেজ আর মুরাদ কি কখনো জেহাদি ছিল!! ছোট বেলায় স্কুলে নেতাজি গান্ধীজি সেজে কত প্রাইজ এনেছে ওরা মুরাদ কি ভালো গান গাইত, দেশত্ব বোধক গান ওর গলায় খুব খেলত পড়াশোনা করে ডাক্তার হবে বলেছিল সেই ভাইদের জোর করে ধরে নিয়ে গেছিল আলি আসগরের দল গুলসন আর আরফাকে তুলে নিয়ে যাবে বলে ভয় দেখিয়েছিল ছেলেগুলো তখন কলেজে কলেজে গিয়ে আসগরের ছেলেরা পাথর ছোড়া শেখাত সবার দিমাগে ঢুকিয়ে দিত না পাওয়ার বেদনা, হিন্দুস্থান আমাদের কিছুই দেয়নি এসব বোঝাত সবাইকে হিন্দু মুসলিম সবাই কত সহজে বিশ্বাস করত ওদের কথা

কিন্তু পরভেজ আর মুরাদ ওসব করতে চায়নি পরভেজ আব্বুকে বহুবার বলেছিল ওকে দিল্লি পাঠিয়ে দিতে কোনো ্যবসা করবে কিন্তু আব্বু নিজের দেশ, নিজের মাটি, নিজের অধিকার.... এসব বলে ওদের যেতে দেয়নি আরফার দিদি ফরিদার শোহর ফাহাদ কলকাতা পালিয়ে বেঁচেছিল এখানে থাকলে ওকেও জেহাদি হতে হত দু বছর ফাহাদের কোনো খবর ছিল না শুধু তিনবার মনি অর্ডার এসেছিল কলকাতা থেকে দিদির নামে ফরিদারা থাকত ডাল লেকের পাশে বাজারের দিকে ছোট একটা লজ ছিল ওখানে ফাহাদের কিন্তু ফাহাদের পালিয়ে যাওয়ার পর জেহাদিরা রাগে ওদের লজটা জ্বালিয়ে দিয়েছিল ফরিদার তখন পাঁচ মাস চলছে মুরাদ দিদিকে কোনো রকমে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছিল তারপর থেকে ফরিদা এখানেই থাকত সুস্থ সবল ছেলে হওয়ার পরে ফরিদা খুব কেঁদেছিল আব্বু ভেবেছিল ফাহাদের জন্য কাঁদছে কিন্তু ফরিদা কাঁদছিল দুঃখে আরফাকে রাতে শুয়ে শুয়ে বলেছিল ছেলের বদলে মেয়ে চেয়েছিল এখানকার ছেলেরা বড় হলেই আসগরের মত লোকেরা ধরে বেঁধে নিয়ে যায় জেহাদি বানানোর জন্য কলেজে স্কুলে গিয়ে কচি মাথা গুলো চিবিয়ে খায় ওরা  মুরাদ আর পরভেজকে নিয়ে যাওয়ার পর ফরিদার মাথাটা আরও বিগড়ে  গেছিল ডাল লেকের কালো জলে ডুবিয়ে মারতে গেছিল ছোট্ট আসমানকে আরফা যদি সে দিন না দেখত তবে আসমান হয়ত .... এরপর হঠাৎ ফাহাদের ডাক এসেছিল নিজে আর শ্রীনগর আসেনি কিন্তু খোঁজ রাখত সব পাঠান কোটে এসেছিল আব্বু আর আরফা ফরিদা আর আসমানকে পাঠান কোট পৌঁছে দিয়েছিল ফাহাদ আব্বুর হাত জড়িয়ে ধরে বলেছিল চলে আসতে এই ভূস্বর্গ নরক হয়ে গেছে এভাবে না ঘর কা না ঘাট কা হয়ে আর কতদিন? বাঁচতে চাইলে এত বড় দেশে অন্য শহর খুঁজে নিতে হবে আব্বু ধীরে ধীরে ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছিল -'যা বেটা, বিদেশ যাকে খুশ রহনা'

সেবার শ্রীনগর ফেরার পথে আব্বু একটাও কথা বলেনি আরফার সাথে মাঝ রাতে আরফা দেখেছিল আব্বু আসমানের একটা ফটো বুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে বসার ঘরে দু চোখে চিকচিক করছে জল মুরাদ আর পারভেজকে যেদিন আসগরের ছেলেরা তুলে নিয়ে যায় সেদিনও আব্বু কাঁদেনি সেই শক্ত বৃদ্ধ লোকটা ভেঙ্গে পড়েছিল নাতি চলে যাওয়ায়একেই বলে অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর একে একে অনেকেই চলে গেছিল ্যবসা গুটিয়ে

 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরফা বসার ঘরটা সুন্দর করে সাজায় কুশন কভার গুলো পুরানো হয়েছে ফাটা জায়গা গুলো গত বছর সুতোর নক্সা তুলে ঢেকে দিয়েছিল আর বোন গুলসন মিলে  কার্পেটটাও জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে গত চারবছর আগে শেষবার রঙ করিয়েছিল ওরা ওদের এই হাউস বোটটি গত বর্ষায় কাঠের কিছু অংশ পচে উঠেছিল, বাধ্য হয়ে কিছু কাঠের কাজ করতে হয়েছিল জমানো টাকা প্রায় শেষ গুলশন একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়ায় আর টিউশন করে আরফা আজকাল চাকরী খুঁজছে কারণ এই হাউস বোটের ্যবসা করে আর সংসার টানা যাচ্ছে না হঠাৎ সুর করে ওর মুঠো ফোনটা বেজে উঠতেই চমকে উঠল আরফা ওর ফোনে ফরিদা ছাড়া আর কেউ তেমন ফোন করে না ফরিদার সাথে দু দিন আগেই কথা হয়েছে তবে কি আসলম !!

 

একটা অচেনা নম্বর দেখে দু বার চিন্তা করে ফোনটা ধরেই নিলো ধারে ভাঙা হিন্দিতে কেউ জানতে চাইছে এটা জান্নত হাউস বোট কি ? একটা ডবল বেড রুম পাওয়া যাবে কি না?

আচমকা ফোনে এমন প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠেছিল আরফা কারণ বিগত দু বছরে এভাবে টুরিস্টের ফোন আসেনি দ্বিতীয় বার হ্যালো শুনে তাড়াতাড়ি জানালো ঘর আছে আসলেই পাবে সব ফাঁকা

পার থেকে উত্তর এলো তারা পরদিন সকালে আসবে ঘর তৈরি রাখতে

ফোনটা কেটে উত্তর দিকের বড় ঘরটা ঝেড়ে পুঁছে সাজাতে শুরু করল আরফা ওদের জান্নতের এই ঘরটা থেকে ডাল লেকের দৃশ্য আর দূরের বরফের পাহাড় সব চেয়ে সুন্দর দেখা যায় কাল সকালে কিছু টাটকা ফুল এনে রাখতে হবে আর রুম ফ্রেসনার দিয়ে দিতে হবে বাথরুমে নতুন তোয়ালে সাবান সব গুছিয়ে রাখল

-''আজ কি কেউ আসবে? এই ঘরটা খুললি কেনো ?'' গুলসন এসে দাঁড়ায় দরজায়

-''কাল আসবে ফোন এসেছিল '' পর্দা গুলো সরাতে সরাতে বলে আরফা

-''ফোনে ... টুরিস্ট.... কোনো মজাক করেনি তো কেউ ?'' গুলসনের দু চোখে অবিশ্বাস

-''কেন ? মজাক হবে কেন?''

-''এবছর টুরিস্ট কই এখানে ? আর আমাদের জান্নত নামেই জান্নত ফাঁকা শ্রীনগরে এত হোটেল ডাল লেকে এত হাউস বোট ছেড়ে আমাদের এই পুরানো রঙ চটা মাঝারি মানের হাউস বোটে লোক থাকতে আসবে কেন ? আমরা তো বছর কোথাও আ্যড দেইনি নম্বর পেলো কোথায় ?''

 ঘুরে দাঁড়ায় আরফা বলে -''বিলে তো ফোন নম্বর থাকে, কত লোক ফিরে গিয়ে আমাদের কথা বলে বন্ধুদের তাছাড়া পুরানো আ্যড দেখেও লোক আসতে পারে তুই আজ ফেরার পথে কিছু সবজি, ব্রেড আর আণ্ডা এনে রাখিস বাঙালি মনে হল কথার টানে কাল আসলে না হয় জিজ্ঞেস করে মছলি আনবো আমি আব্বুকে বলে রাখি ''

-''আগে আসুক তোর মেহমান তখন আব্বুকে বলিস '' একটা তাচ্ছিল্যের হাসি উপহার দিয়ে ফিরে যায় গুলসন বরাবর এমন হাউস বোটের কাজ, সংসারের কাজ ওর পছন্দ না নিজেই রোজগারের রাস্তা খুঁজে নিয়েছে মুরাদ আর পরভেজ চলে যাওয়ার পর সংসারটা যখন ভেঙ্গে পড়েছিল শক্ত হাতে সামলেছিল

সকালের সব কাজ শেষ করে আরফা এসে দাঁড়ায় আব্বুর ঘরে এক মনে সন্তুর বাজাচ্ছে আজ আব্বু, তবে বিষাদের সুর শুনলে মন খারাপ হয়ে যায় আরফার ছোটবেলা তারা পাঁচ ভাই বোন হেসে খেলে কত আনন্দ করে বড় হয়েছিল মাঝে মাঝেই চাঁদনী রাতে আব্বু সন্তুর বাজাত আম্মির গানে গলা মেলাত ওরা ভাই বোনেরা মুরাদ ভালো সন্তুর বাজাত সেই সব আনন্দের সুর আর বাজায় না আব্বু মুরাদ আর পারভেজ চলে যাওয়ার পর আর কখনো ফিরে আসেনি আসলম খবর এনেছিল ওদের পাকিস্তানের ভেতর কোনো ট্রেনিং ক্যাম্পে রাখা হয়েছে বহু বার পুলিশ এসেছে ওর ভাইদের খোঁজে ওরা বিশ্বাস করতেই চায় না ছেলে দুটো নিজের ইচ্ছায় যায়নি পুলিশদের পছন্দ করে না আরফা জেহাদিদের থেকেও এরা বেশি শয়তান যতবার আসে ওদের জান্নতের ইজ্জত নষ্ট করে, ঘর গুলোতে তালাশের নামে তাণ্ডব চালায় আর্মিরা তবু ভালো আর্মিরা কড়া হাতে রাশ ধরেছে বলে কিছু ছেলে এখনো পড়াশোনা করতে পারছে তবে আজকাল সবাই ছেলেদের দিল্লি বা চণ্ডীগড় পাঠিয়ে দেয় এখানে থাকলে হয় জেহাদির গুলি নয় পুলিশের গুলি এই আছে কপালে এই জেহাদিরা আজাদ কাশ্মীর বলে যতই চেঁচাক সবাই জানে ইন্ডিয়ার সাথে থাকলেই বেশি লাভ শুধু আর্মিরা যদি তৎপর হয়ে জেহাদি গুলোকে শেষ করে দেয় তবেই অচ্ছে দিন আসবে

 

পরদিন সকাল থেকেই জান্নতকে নয়ি দুলহনের মত সাজিয়ে তোলে আরফা গুলশন স্কুলের জন্য বেরিয়ে যেতেই মেহমান চলে আসে উত্তরের ঘরটা পেয়ে ওরা ভারি খুশি আসলমের থেকে ওরা পেয়েছে জান্নতের খোঁজ বলল দিল্লিতে আসলমের থেকে ওরা কেনাকাটা করে নতুন বিয়ের পর ঘুরতে এসেছে কচি ছেলে মেয়ে দুটো একটু পরেই ওরা বেরিয়ে গেল শিকারা ভ্রমণে

এই সময় টিউলিপ গার্ডেন ফুলে ফুলে সেজে ওঠে সে এক দেখার মত দৃশ্য আসলামের সাথে আরফাও গেছিল কয়েকবার সত্যিই জান্নত আরফা ভাবে তাদের এত সুন্দর শহরটাকেই কেন জেহাদিদের পছন্দ সারা ইন্ডিয়ায় আর তো কোথাও এমন গণ্ডগোল নেই ছেলেগুলো একটু বড় হলেই ভয়ে মরে বাবা মায়েরা মেয়ে থাকলে আবার আরেক রকম আতঙ্ক আসলামের বোনটার সাথে যা হয়েছিল ভাবলেই শিউড়ে ওঠে আরফা তাই আসলম কে দোষ দেয় না আর পুলিশ আর্মি কেউ সেদিন আসলমের পাশে দাঁড়ায়নি পরভিনের একটাই দোষ ছিল, ছিল জান্নতের হুর, অপূর্ব সুন্দরী আর আসলম জেহাদিদের ভয়ে পালিয়ে গেছিল দিল্লি আসলমকে না পেয়ে পরভিনকে তুলে নিয়েছিল ওরা তিনদিন সময় দিয়েছিল আসলমকে কিন্তু আসলম ফিরে পুলিশে গেছিল সাহায্যের আশায়এত সহজে হার মানতে চায়নি পরভিনের কপালটাই খারাপ ছিল ডালের জলেই ফেলে দিয়ে গেছিল ওর ক্ষতবিক্ষত দেহটা ওরা আসলম এখন দিল্লিতে শালের ্যবসা করে বহুবার আরফাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে নিকাহ করে আব্বুর সাথেও কথা বলতে চেয়েছে আরফাই ভয় পায় আব্বু আর গুলসনকে ছেড়ে যেতে আসলমকে বহুবার ফিরে আসতে বলেছে কিন্তু আসবে না আর এখানে

 

অলস দুপুরে নিজের ঘরে বসে একটা চাদরে কাশ্মীরি ফুলের নক্সা তুলছিল আরফা, হঠাৎ ধুপ করে একটা শব্দে ওর ঘরটা একটু কেঁপে উঠল যেন হাতের কাজটা রেখে বাইরে তাকাতেই মনে হল একটা কালো ছায়া ওর ঘরে এসে ঢুকল দরজাটা বন্ধ করে কালো পোশাকে শরীর ঢাকা লোকটা ঘুরতেই আরফা চিৎকার করতে যাচ্ছিল কিন্তু এতদিন পর এভাবে মুরাদকে দেখবে কখনো ভাবেনি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে ওর এক বছরের ছোট ভাই মুরাদকে

-''একদম সময় নেই শোন .. মেহমান এসেছে তো ... তোকে একটা কাজ করতে হবে '' মুরাদ বলে

অবাক হয়ে তাকায় আরফা দু বছর পর ঘরে ফিরেছে ছোট ভাই দুচোখ ভরে দেখতে চায় ভাইকে

-'' এই ছোট্ট চিপটা লোকটার ফোনের মেমরি কার্ডের জায়গায় গুজে দিবি ''

ছোট্ট একটা কাগজের মোড়ক এগিয়ে দেয় মুরাদ

-''কে..কেনো ? কি আছে ওতে ?'' ভয়ে দু পা ছিটকে যায় আরফা

-''তোর না জানলেও চলবে আমার কথা ভেবে আজাদ কাশ্মীরের কথা ভেবে কাজটা করবি শুধু "

-''আমি পারবো না '' ভয় পায় আরফা এক অন্যরকম ভয় একটা শীতল স্রোত নামছে ওর শরীর জুড়ে

-''তুই পারবি জাস্ট ফোনে এটা গুঁজে দিবি কোনো অজুহাতে বাস ''

-''মুরাদ... মেহমান আমাদের আল্লাহ''

-''ধুর... আমি কৌনসা খুন করতে বললাম লোকটা একটা এজেন্ট একটা মিশনে এসেছে ওটা ওর বিবি না ওটাও এজেন্ট ''

-''আমি বিশ্বাস করি না তোর কথা চলে যা তুই ''

-''আরফি, আরফা, মেরে বহেন ... বাস ইতনা সা কাম ... আজাদ কাশ্মীরের জন্য তোর ভাই রক্ত দিচ্ছে আর তুই ...''

-''কৌনসা আজাদ কাশ্মীর ভাই? আমরা আজাদ না? কি বলছিস তুই?''

-''না, আজাদ না আমাদের আর ইন্ডিয়ার আর সব রাজ্যের লোকেদের মধ্যে অনেক ফারাক ইন্ডিয়া কিছুই দেয় না আমাদেরআমরা তো না ঘর কা না ঘাট কা হয়েই রয়ে গেলাম ''

-''চুপ কর তুই জেহাদি হয়ে গেলি এত তাড়াতাড়ি আব্বু এত বছর ধরে যা শিখালো সব ভুলে গেলি এই কদিনে? ''

-''আরফা... এটা আমাদের জমি, আমরা এখানকার লোক ইন্ডিয়ার কথা শুনব কেনো? এখন শোন কাজটা তুই না করলে ওরা আমায় মেরে দেবে''

-''তুই চলে যা''

-''যাচ্ছি কিন্তু কাজটা না হলে আমার লাশ দেখতে পাবি''

আরফা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জানালার কাছে

-''এটা রাখ আর চিপটা...''

-''আমি এসব করবো না ভাই তুই যা ''

-''এতে কিছু টাকা আছে, তোদের কয়েকটা মাস চলে যাবে রাখ আর এই চিপটা ওর ফোনে... শোন , লোকটা এজেন্ট কেন আমাদের বোটে আছে জানিস? আমাদের ্যপারে খোঁজ নিতে এসেছে দু দিন যাক টের পাবি ''

-''ওদের আসলম পাঠিয়েছে এখানে ''

-''ওটা তো ডবল এজেন্ট শালা... খবরি'' ঘৃণায় মুখটা বিকৃত করে মুরাদ

-''ওটা দিয়ে তুই ওদের খুন করবি!! ফোন বোমা !!'' ভয়ে সাদা হয়ে যায় আরফার মুখ বলে -''একটা চিটি মারতে ভয় পেতিস তুই!! রক্ত দেখলে কাঁদতিস একটু বড় হয়ে বলেছিলি ডাক্তার হয়ে সবার প্রাণ বাঁচাবি ....''

-'' আর ডাক্তার!! আমাদের জীবনটাই চিটির মত হয়ে গেছে রে '' মুরাদের গলার স্বরটা হঠাৎ ধরে আসে কেমন

-''তাই তুই ওদের খুন করবি ? আমাদের জান্নতে রক্ত ঝরবে !! ''

-''না রে পাগলী খুন না ওদের ফোনের কথা শুনতে পাবো এখনি মরবে না কেউসব তোর হাতে থাকল করে দিস কাজটা '' আবার আগের মত চাপা গলার স্বরে কথা গুলো বলে মুরাদটেবিলে প্যাকেটটা রেখে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায় জল কেটে একটা শিকারা চলে যায় মনে হয় আরফার টেবিলের উপর থেকে চিপটা তুলে নিয়ে দেখেখুব ছোট্ট একটা পাতলা মেমরি কার্ডের মত জিনিস টাকার ্যাকেটা খুলে দেখতে ইচ্ছা করে না ওর ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দেয় আব্বুর ঘর থেকে সন্তুরের আওয়াজ আসছে টের পায়নি কিছুই তার মানে এমনিতেই কানে কম শোনে

আরফা আসলমকে ফোন করে, নট রিচেবেল কি করবে এখন ভেবে পায় নাকাকে বলবে ! কে সাহায্য করবে ওকে?

কলকল করতে করতে ছেলেটা আর মেয়েটা ফিরে আসে সন্ধ্যায়মুরাদ বলেছিল ওরা মিয়া বিবি নয়, এজেন্ট!!

 গুলসন আগেই ফিরেছে ওকেও বলতে পারেনি আরফা

সন্ধ্যার গরম কাবা আর পকোরা নিয়ে মেহমানের ঘরে যায় আব্বুর সাথে সকালেই আলাপ হয়েছে ওদের রাতের খাবার বানাতে বানাতে আরফা ভাবে মুরাদের কথা

ওদের রাতের খাবার দিতে গিয়ে আরফা দেখে লোকটার ফোন চার্জে বসানো ইচ্ছা করলেই কাজটা করা যায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার ওরা দুজন ল্যাপটপে ফটো দেখতেই ব্যস্ত এদিকে দেখছেই না কেউ আচ্ছা, মুরাদ বলল ওরা কাপল নয় কিন্তু একই বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে যে উচ্ছ্বাসে ওরা ফটো দেখছে অন্ধ লোকেও বলবে ওরা কাপল

ফিরে আসে আরফা রাতে খেতেও ইচ্ছা করে না এতদিন পর মুরাদ এলো নিজের কথা, পরভেজের কথা কিছুই বলল না পরভেজ আরফার বড় দাদা রাতে শুয়েও ঘুম এলো না ওর বিছানায় উশখুশ উশখুশ করলে গুলসনের ঘুম হবে না বেরিয়ে আসে হলে সোফায় বসে ভাবতে থাকে পরপর ঘটনা গুলো কালো পোশাকে মুখে হাল্কা চাপদাড়ি ওটা মুরাদ.. ওর ভাই ছিল তো? অন্য কোনো বহুরূপীয়া নয় তো ? মুরাদ কী করে এমন বদলে গেলো আর পরভেজ !! রহমত আলির দুই ছেলেই তবে জঙ্গি! জেহাদি!! দাদাজান আহমেদ আলী শহীদ হয়েছিল কাশ্মীরের মাটিতে ইংরেজদের সাথে আজাদির লড়াইয়ে সেই খানদানে জেহাদি আর জঙ্গি!!

উত্তরের ঘরটার দরজার নিচ দিয়ে একটা হাল্কা আলো চুইয়ে আসছে, আলোটা কাঁপছে, কমছে, বাড়ছে কিসের আলো এটা, ঘরের কাঁচের জানালা দিয়ে তো আলো আসছে না!! ঘর তো অন্ধকার বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আরফা টি টি করে দুটো শব্দ পায় মেসেজ ঢুকল ল্যাপটপে কাজ করছে মেহমান রাত দুটো বেজে গেছে ঘড়িতে ওরা দুজন অথবা যে কোনো একজন জেগে রয়েছে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ে আরফা

 

পরদিন সকালের নাস্তায় আলু পরাঠা খেতে খেতে আব্বুর সঙ্গে গল্প করছিল মেহমানরা আব্বু ওদের আগের শান্ত কাশ্মীরের গল্প শোনাচ্ছিল বহুদিন পর আব্বুকে হাসিখুশি দেখতে লাগছিল এই ডাল লেকে আগে কত শুটিং হত, হিন্দি সিনেমার কত হিরো এখানে আসত সে সব স্বর্ণ যুগের গল্প করছিল আব্বু গল্পের মধ্যেই মেহমানরা ওদের পারিবারিক কথা জিজ্ঞেস করছিল টুকটাক

হঠাৎ আরফা শুনতে পার মেয়েটার গলা -''আপনার ছেলেরা এখন কোথায় ?''

-''ধান্দার কাজে সবাই এদিক ওদিক টুরিস্ট আসে না বলে শ্রীনগরে কাজ নেই ্যবসাও চলে না পুরো শ্রীনগর তো চলত ট্যুরিজম বিজনেসের উপর সব বন্ধ '' আব্বু এই উত্তর সবাইকে দেয়

-''কী করে আপনার দুই ছেলে? ''

-''অত লিখাপড়া করত খুব ভাল দিমাগ ছিল ওদের কিন্তু পড়া শেষ হল না এই ঝামেলাতেকাম কাজ ওতো জানে না ্যবসা করে টুকটাক ''

-''কতদিন পর পর বাড়ি আসে?''

-''কই ঠিক নেহি, বহুত দিন আসে না ''

আব্বুর ভাঙা গলার উত্তর ভেসে আসে মুরাদ বলেছিল ওরা জাসুস খোঁজ নিচ্ছে ওর ভাইদের পোড়া পরাঠার গন্ধে গুলসন এসে ঢোকে কিচেনে

আব্বু একটু পরেই মেহমানদের হজরতবল আর মোগল গার্ডেন দেখাতে নিয়ে গেল গুলসন স্কুলে চলে গেলো ছোট ছোট আওয়াজেও আজ কেঁপে কেঁপে উঠছিল আরফা ড্রয়ার থেকে টাকার প্যাকেট আর চিপটা আলমারিতে তুলে রেখেছে মেহমান আরও দু দিন থাকবে ওদিকে আসলমের ফোন লাগছে না

রনবীর চাচা এসেছিল সবজি দিতে আরফাকে দেখে বলে -''কি হয়েছে বিটিয়া? মু সুখা সুখা লাগছে !!''

এড়িয়ে যায় বলে -''আসমানের জন্য মন খারাপ লাগছে চাচা কতদিন দেখি না ''

-"ওদের কি খবর বিটিয়া? কেমন আছে ? আমার পাশের বাড়ির হায়দর কলকাতায় থাকে, শালের ্যবসা গত সপ্তাহে হঠাৎ কাশ্মীরি আতঙ্কবাদী সন্দেহে ওকে পিটিয়েছে ওখানকার লোক এখন হাসপাতালে পুলিশ সাথ দেয়নি বলেছে সুস্থ হলে ফিরে আসতে সব কপাল বিটিয়া ''

ঘটনাটা শুনেছিল আরফা কদিন আগেই জঙ্গি হানায় কয়েকজন সৈনিক মারা গেছিল পনেরো দিন আগে তাদের মধ্যে কলকাতার একজন ছিল হায়দর ভাই কলকাতায় শাল বিক্রি করে পুরো শীত কাল এবার বিক্রি শেষে কালেকশনে বেরিয়েছিল এটা তখনকার ঘটনা জঙ্গি বা আতঙ্কবাদী এমন একটা শব্দ যা মুহূর্তে মানুষকে বদলে দেয় ফরিদা, ফাহাদ ভাই আর আসমানের জন্য চিন্তা হয় মাঝে মাঝে ওদের ফর্সা রঙ, টিকালো নাক, উচ্চতা ওদের পরিচয় বলে দেয় যে

রনবীর চাচা চলে যেতেই ভয়টা ফিরে আসে হঠাৎ রান্নাঘরে একটা কিছু ছিটকে পড়ার শব্দে ছুটে যায় আরফা একটা পাথরে জড়ানো কাগজ কেউ ছুড়ে দিয়েছে জানালা দিয়ে কাগজ নয়, চিরকুট, লেখা রয়েছে -''আজ কাজটা করতেই হবে নয়ত মুরাদ খতম ''

ঠকঠক করে হাত পা কাঁপতে থাকে আরফার বসে পড়ে কাঠের মেঝেতে কি করবে এবার সে !! মুরাদকে বাঁচাতে মেহমানের ক্ষতি করবে?

 

-''এই দিদি, কি হয়েছে? এভাবে এখানে বসে ...'' কথা বলতে বলতে ওর হাতের কাগজটায় চোখ পড়ে গুলসনের হাতের এক গোছা ফুল ছড়িয়ে পড়ে কাঠের মেঝেতে চিরকুটটা পড়ে চোয়াল শক্ত হয় ওর

-''কি কাজ দিদি ? ''

চমকে ওঠে আরফা, ছিনিয়ে নেয় চিরকুটটা কুচিয়ে ছুড়ে ফেলে ডাল লেকের জলে ফুলগুলো তুলতে তুলতে বলে -'' কিছু না, তুই খাবি তো ? হাত পা ধুয়ে আয় ''

শক্ত হাতে আরফার দুই কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করায় গুলসন বলে -''কি হয়েছে খুলে বল কি কাজ ? কে এসেছিল ?''

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে আরফা আর পারে না লুকিয়ে রাখতে সব বলে দেয় বোনকে

চোয়াল শক্ত করে গুলসন বলে -''এই আমাদের কপাল না ঘরকা না ঘাটকা.. ঠিকই রে কোথায় যাবো আমরা ? কতদিন এভাবে বাঁচবো বল তো?''

-''মুরাদ, পরভেজ ...... ওরা...''

-''পরভেজ ভাইজান নেই দিদিতোদের বলতে পারিনি আজ বলছি শোন! জঙ্গি নয় শহীদ হয়েছিল রে কিন্তু এমন কপাল, আমরা বলতেও পারবো না কাউকে ''

-'' কী বলছিস তুই ?'' আবার মেঝেতে বসে পড়ে আরফা

-''ভাইজানদের যেদিন নিয়ে গেল রবীন্দরকেও নিয়ে গেছিল ওরা মনে আছে তোর ''

আরফার মনে পড়ে সেই নীল চোখ কোঁকড়া এক মাথা চুলের ছেলেটা মুরাদের বন্ধু ছিল শোনমার্গের পথে আপেল বাগান ছিল ওদের পড়তে এসেছিল শ্রীনগর ওর দুচোখে ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছেলেটা হিন্দু হলেও সে সময় গুলসনের চোখে স্বপ্নর ঝলক দেখেছিল আরফা ভাইজানদের চলে যাওয়ার পর ছেলেটাকে আর দেখেনি কখনো

-''রবি , আর ভাইজানরা একই ক্যাম্পে ছিল কঠোর অনুশাসনের মধ্যে ছিল ওরা মগজ ধোলাইয়ের সাথে নানারকম নাশকতার পাঠ পড়ানো হত রবি হিন্দু হয়েও ছাড় পায়নি কারণ মুসলমানদের সাথে মিশত, ওদের ভালোবাসতো ওর মগজ ধোলাই করা সহজ ছিলওকেও ভয় দেখিয়ে ধরে নিয়ে গেছিল  পরভেজ ভাইজান পালাতে চেয়েছিল আর ওদের চোখের সামনে পরভেজকে মেরে বাকিদের শিক্ষা দিয়েছিল জঙ্গি নেতারা রবীন্দরের সাথে আমার দেখা হয়েছিল সব বলেছিল আমায় আমাদের স্কুলে একটা নাশকতার প্ল্যান ছিল ওদের গোষ্ঠীর রবির বুদ্ধিতে বেঁচে যায় স্কুলটা কিন্তু বাঁচেনি চরম প্রতিদান দিতে হয়েছিল ওকে নিজের জীবন দিয়ে ওরা জঙ্গি হতে বাধ্য হয়েছে দিদি মনে প্রাণে ওরা আমাদের ভালো চায় ''

-''মানে রবীন্দর....'' টপটপ করে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গুলসনের বড় বড় চোখ থেকে

-'' রবির বোন চণ্ডীগড়ে থাকত তার ছেলেকে স্কুল থেকে তুলে নিয়েছিল ওরা দুধের শিশুর মাথায় বন্ধুক ধরে রবিকে জঙ্গি বানিয়েছিল ওরা ওদের দেওয়া বন্ধুকের গুলিতে কারো প্রাণ নিতে পারেনি রবিন্দর শিশুদের প্রাণ বাঁচিয়ে নিজের রক্তে চরম মূল্য দিয়েছিল পুলিশের রেকর্ডে হিন্দু জঙ্গি, ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, এদিকে আত্মঘাতী বাহিনীর সদস্য আমি জানি শহীদ ''

-''এখন আমরা কি করব?'' আরফা কোন দিশা পায় না

-''মুরাদ শহীদ হবে না জঙ্গি আমি জানি না তবে কাশ্মীরের জন্য আমাদের মত প্রতিটা পরিবারকে চরম দাম দিতে হয়, এটা জানি আমরা সেটাই করব যা আমাদের মন চাইবে ''

-'' আমি কিছুই বুঝতে পারছি না শুধু আমাদের সাথেই এমন কেনো হয় বলতো'' বোনের কাঁধে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আরফা

-''আমরা যে জান্নতের হুর, পরী, জানিস তো পরীদের গল্প শুনতে খুব ভালো লাগে ওরা আমাদের সব ইচ্ছা পূরণ করে, ওদের ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতে নেই ফুলদানীর নকল ফুলের মত জীবন ওদের আসলে ওদের জীবন খুব দুঃখের হয় রে সত্যি আমরা আজাদ হইনি আজওতাই তো সব সময় বলি আমরা না ঘর কা না ঘাট কা আজাদ কাশ্মীর আসলে একটা অলীক কল্পনা, অনেকটা রূপকথার মত সরকার মিলিটারি পুলিশ কেউ কী আমাদের কথা ভাবে? না, কেউ আমরা কি চাই ভাবে না সরকার রাজনীতি করে, বলি হই আমরা জান্নতের খোঁজে লোকে এখানে আসে আমরা জানি না জান্নত কোথায় ''

 গুলসন দিদিকে টেনে বাইরে নিয়ে যায় বলে -''দেখ, এতদিন মেহমান আসছিল না তাই তোর মন খারাপ ছিল এখন মেহমানের সাথে ঝামেলাও এলো এবার কি করবি বল? খেতে দিবি তো না কি ?''

-''দিচ্ছি, আগে একটা কাজ করি '' চোখ মুছে আরফা নিজের ঘরে যায়, ঠোঁটের কোনে করুন হাসি ফুটে ওঠে আলমারি খুলে চিপটা ডাল লেকের জলে ছুড়ে ফেলে দেয় মনে মনে ভাবে টাকাটা পরদিন কোনো অনাথালয়ে দিয়ে আসবে বহুদিন পর ভীষণ হাল্কা লাগে নিজেকে আর ভয় নেই, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে বোনের জন্য খাবার গরম করে আরফা

 

******

 

মেহমান ফিরে গেছিল ঠিকঠাক, কিন্তু হঠাৎ করে কাশ্মীরে পুলিশ ও মিলিটারি  সক্রিয় হয় উঠেছে। মুরাদের লাশ অবশ‍্য ফেলে যায়নি কেউ, ওরা আর আসেনি। জেহাদীরা সব গা ঢাকা দিয়েছে যেন। থমথমে পরিবেশ, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস।দুদিন ধরে নিউজ আসছে না, ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। মনটা বড় ছটফট করে আরফার। ও রোজ সকালে উঠে বরফের পাহাড়ের দিকে তাকায় এখনো, শান্ত ডাল লেকের জলে ছোটছোট ঢেউ ভাঙা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।  গুলসন হঠাৎ ছুটে এসে দিদিকে জড়িয়ে ধরে। বলে -''কাশ্মীর আজাদ হো গ‍্যায়া দিদি, আমরা এখন ইন্ডিয়াতে, কাশ্মীর আর আলাদা নয়সরকার বলেছে ৩৭০ ধারা আর নেই। ইণ্ডিয়ার সব রাজ‍্যের মত আমরাও একই নিয়মে বাধা আজ থেকে। তোকে আর থেকে থেকে বলব না যে আমরা না ঘর কা না ঘাট কা। দিল্লির মত তিরঙ্গা লহরাবে আমাদের এই নীল আকাশে।আসমান ফিরে আসবে, আব্বু ভালো হয়ে যাবে আবার আগের মত।''

 

বোনের বাকি কথাগুলো আর কানে ঢোকে না আরফার, ওর মাথায় একটাই শব্দ অনুরোণিত হয়, আজাদ কাশ্মীর। ঝাপসা চোখে ও ভাবে এবার মুরাদ ঘরে ফিরবে তো ?

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে

  বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে দেবদত্তা ব্যানার্জী   একটু শীতলতার খোঁজে   গরমের ছুটির...