বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০

বিপদ যখন জঙ্গলে

 




 

()

দরজার পাশ দিয়ে চুইয়ে একটা সরু আলোর রেখা ঢুকেছে ঘরের ভিতররাতুলের ঠিক মুখের উপর এসে পড়েছে ছোট্ট আলোর বিন্দুটা। একটু একটু করে চেতনা ফিরে পাচ্ছে রাতুল। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা নিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করে সে। একটা নরম শরীরে পা লাগে। ছেঁচড়ে সরে আসে সে। ভাল করে চোখ রগরে উঠে বসে এবার চারদিকে এগুলো ঠিক কী? অসংখ্য প্যাকিং বাক্স! রাতুল বুঝতে চেষ্টা করে সে কোথায়। আস্তে আস্তে অন্ধকারে চোখ সয়ে যায়। একটা চলমান কিছুর ভেতর রয়েছে এটুকু বুঝতে পারে কিন্তু এ কেমন যান বুঝতে পারে না। হঠাৎ ঘরটা বেশ জোরে দুলে ওঠে। ভূমিকম্প হচ্ছে মনে করে কিছু একটা ধরে শরীরের ভারসাম্য রাখতে চায় সে। বেশ দুলে দুলে চলছে এতো বড়ো ঘরটাঘরের মধ্যে এবার আরো তিনটে বাচ্চা ছেলে আর দুটো একটু বড় ছেলেকে দেখতে পায় ও। বাচ্চা তিনটে নেতিয়ে পড়ে রয়েছে এক কোনে।

অন্য ছেলে দুটো ভয়ার্ত চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছিল। ও বেশ অবাক হয়ে ওদের জিজ্ঞেস করে -"এটা কোথায় রয়েছি ? আমি কোথায় যাচ্ছি?"

কিন্তু ছেলেগুলো উত্তর না কেমন জড়সড় হয়ে ওকে দেখতে থাকে। শরীরের যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়ায় রাতুল। আলোর উৎসর দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার পাশের ফুটোয় চোখ রাখে । তেমন কিছুই দেখতে পায় না, অন্ধকারে একটা হলুদ আলো আর নীলচে দেওয়াল।

চারদিকে তাকিয়ে ওদিকে কয়েকটা প‍্যাকিংবাক্সের পিছনে একটা গোল জানালা মত চোখে পড়ে। যদিও বন্ধ করা ওটার দিকে এগিয়ে যায় ও। ওদিকে আরো দুটো ছেলেকে দেখতে পায়অজ্ঞান অথবা ঘুমন্ত জানালাটা খুলতেই চোখে পড়ল নীল জলরাশি। কাচের জানালার গায়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের নীল জল। আর উপরে এক খন্ড নীল আকাশ।

এর আগে কখনো সমুদ্র দেখেনি রাতুল। কিন্তু এতো জল সমুদ্র ছাড়া আর কোথায় হতে পারে! সিনেমা বা টিভিতে যতটুকু সমুদ্র দেখেছে সেই বুদ্ধিতে বুঝতে পারে ও একটা বড় নৌকা বা জাহাজের পেটের ভেতর রয়েছে। জাহাজ টা দুলে দুলে চলছে।

এবার মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে বসে রাতুল ঠিক কি হয়েছিল!! .....জঙ্গলের ধারে ভাইকে খুঁজতে গেছিল রাতুল। একটা খয়েরী রং এর বোলেরো দাঁড়িয়ে ছিল জঙ্গলের ভিতর। রাতুলকে ডেকে ওরা জিজ্ঞেস করছিল কিছু। তারপর আর মনে পড়ছে না। মাথাটা কেমন ভার লাগছে।

চোদ্দ বছরের রাতুলের বুদ্ধি ওর বয়সী আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে একটু বেশি। কারণ ওর মা নেই। বাবাও বাইরে বাইরে থাকে। ছোট একটা ভাই আছে রাতুলেরমিতুল। দশ বছর বয়স। রাতুল এই চোদ্দ বছরেই ওর মা হয়ে উঠেছিল। ভাইয়ের জন্য ওকে অনেক কাজ করতে হয়। দুভাই একসঙ্গে স্কুলে যায়। রাতুল নাইন আর মিতুল ফাইভে পড়ে দয়ানাথ আদর্শ বিদ্যালয়ে।

এই মুহূর্তে রাতুল বুঝতে পারছিল ওকে কোথাও পাচার করা হচ্ছে। সমুদ্র দেখে এটাও বুঝতে পারে অনেক দূরে কোথাওহয়তো অন্য কোনও দেশে। কারণ ওদের টাউনের আশেপাশে কোন সমুদ্র নেই। ও পড়ার বইতে পড়েছে ওদের রাজ্যের দক্ষিনে রয়েছে বঙ্গপোসাগর। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পর চোখ মুছে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে নেয় ও যে ওকে যে ভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে হবে। একবার ছোট ভাই মিতুলের মুখটা মনে পড়ে। মনে মনে ভাবে মিতুল তাকে খুঁজে না পেয়ে কি করবেবাবাও বাইরে গেছিল কয়েক দিনের জন্য। সে কতদিন এখানে আছে তাও বুঝতে পারে না।

 

দরজাটা খুলে দুটো লোক ঢুকেছিল। একজন পুরো নিগ্ৰোদের মত। অন্যজন ফর্সাটিকালো নাককিন্তু চোখ দুটো ভয়ংকর। আর একটা কান নেই। নাকের পাশটাতেও কাটা একটা দাগযা মুখটাকে আরো সাংঘাতিক করে তুলেছে। ওরা দরজা খুলে ঢুকতেই এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস আর একটুকরো আলো এসে ঢুকল। রাতুল কি করবে বুঝতে না পেরে প্যাকিং বাক্সের আড়ালে সরে গেছিল। লোকগুলো একটা গামলা আর দুটো বড় জলের বোতল নামিয়ে দিয়ে ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর ইংরাজিতে বড় ছেলে দুটোকে বলল খাবার থাকলসবাই যেন খেয়ে নেয়। এদিক ওদিক তাকিয়ে রাতুল কে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল ওদের ওর কথা।

 রাতুল নিজেই বেরিয়ে এলোওর পেটে অসহ্য চাপ আসছিল। তক্ষুনি টয়লেটে যাওয়া দরকার। ও বেরিয়ে এসে হিন্দিতে বলল যে ওর টয়লেট পেয়েছে। লোক দুটো নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কি যেন বললরাতুল বুঝতে পারলো না। ইশারায় ওদের অনুসরণ করতে বলায় ওদের পিছন পিছন এগিয়ে গেল। ঘরের বাইরে একটা সিঁড়ি দিয়ে ওরা উপরে উঠে এলো। পাশে একটা টয়লেট ওকে দেখিয়ে দিল। টয়লেট থেকে বেরিয়ে রাতুল দেখল ও পাশে চওড়া ডেক। তারপর বিশাল নীল জলরাশি। এক ঝাঁক নাম না জানা পাখি উড়ে যাচ্ছিল মাথার উপর দিয়ে। চারদিকে তাকিয়ে দেখল জাহাজটা খুব বেশি বড়ো না।

ওরা জোর করে ওকে আবার নিচে পাঠিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের ছেলে দুটো ঐ গামলা থেকে রুটি তুলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল। রাতুলের ও খিদে পেয়েছিল। গামলায় শুধু শুকনো রুটি পড়ে রয়েছে। ও খিদার মুখে একটা তুলে নিলো। খেতে খারাপ না। মিষ্টি মিষ্টি। তবে বড্ড শক্ত। দুটো রুটিতেই চোয়াল ব্যথা হয়ে গেছিল ওর। কয়েক ঢোক জল খেয়ে ও ছেলেগুলোর পাশে গিয়ে বসল। বাকি তিনটে তখনো ঘুমাচ্ছে অথবা জ্ঞান ফেরেনি।

অন্য ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে ও বলল -" আমি রাতুল। বাড়ি উত্তর বঙ্গের জলপাইগুড়িহিন্দিতেও বলল একই কথা

এবার একটা ছেলে বলল -" আমি আকাশআর ও হরি। বাড়ি মালদায়। আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরবে।"

রাতুল আগেই বুঝতে পেরেছিল এমন কিছু হয়েছে। এমন সময় আড়মোড়া ভেঙ্গে আরেকটা বাচ্চা উঠে বসল। বারো তেরো বছর বয়স হবে। ভাল বাড়ির বোঝা যায় দেখলে। রাতুল জানালাটা খুলে দেওয়ায় আলো আসছিল কিছুটা। রাতুলের মিতুলের কথা মনে পড়ছিল খুব। গিয়ে বাচ্চাটার পাশে বসে ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলো সে। বাচ্চাটা বিহারের। কিষাণগঞ্জ থেকে ওকে ধরে এনেছে বলল। একে একে অন্যদের ও জ্ঞান ফিরল। এই ঘরে ওরা মোট আটজন ছিল। তিনজন বাংলাদেশেরআরেকজন নেপালের।

 রাতুল সবাইকে বোঝাল এই জাহাজ থেকে পালানো যাবে না। চারদিকে জল। জাহাজ কোথাও নোঙর করলে চেষ্টা করতে হবে। হরি ওর কথা শুনে বলল-" এরা সাংঘাতিক। এসব পালানোর কথা ভেবো না তুমি। আমরা দেশের বাইরে চলে এসেছি। টাকা পয়সা নেই। কোথায় যাব পালিয়ে?"

বাচ্চাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোটো তার নাম রিও। ভাঙ্গা হিন্দিতে জানাল সে পালাতে চায়, বাড়ি ফিরতে চায়। সে রাতুলের সঙ্গে আছে।

রাতে আবার এক গামলা রুটি দিয়ে গেছিল লোকগুলো। এর মধ্যে সমুদ্রের একঘেয়ে দুলুনিতে সবার শরীর খারাপ করেছে। রিওর শুধু বমি হচ্ছিল। ঘরটায় গরম। হাওয়া নেই। চাপা দুর্গন্ধে সবার অস্বস্তি হচ্ছিল।

পরদিন সকালে রাতুল দরজা ধাক্কাতে থাকে। এবার একটা অন্য লোক আসে। লোকটা পরিষ্কার বাংলায় জানতে চায় কি হয়েছেরাতুল ওকে বলে -" এখানে এভাবে থেকে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের উপরে হাওয়া আসে এমন একটা জায়গায় থাকতে দাও।"

-" ওপরে তোদের রাখা যাবে না। ঘর নেই।"

-"এখানে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। মরেও যেতে পারে এই দম বন্ধ করা পরিবেশে। আমাদের বাইরে থাকতে দাও। জলের ভেতর কেউ তো পালাতে পারবে না।"

লোকটা দরজা বন্ধ করে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পরে আগের লোক দুটো আসে। রাতুল আবার বলে যে তাদের বাইরে নিয়ে যেতে। অনেকেই টয়লেটে যেতে চাইছে। সবার শরীর খারাপ লাগছে। এবার লোকগুলো বলল ওদের ওপরে নিয়ে যাবে কিন্তু পালাতে গেলেই জলে ডুবে মৃত্যু হবে।

ওপরে বাথরুমের পাশের একটা ছোট ঘরে রাখা হল। আর তখনি রাতুল দেখল পাশের ঘরে বেশ কয়েকটি অল্প বয়সি মেয়েকে রাখা হয়েছে। মেয়েগুলো ভয়ার্ত চোখে ওদের দেখছিল।

সেদিন বিকেলে বাংলা জানা লোকটা এসে ওদের বলেছিল সবাইকে কিছু না কিছু কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঠিকমত কাজ করলে ভাল খেতে পড়তে পাবে সবাই, মায়নাও পাবে। আরো ছয় সাত দিন সবাইকে এভাবে সমুদ্রে থাকতে হবে। তবে বসে না থেকে ওরা যদি সবাই কিছু কিছু কাজ করে সময় কেটে যাবে। রাতুল ভাবছিল এটাই ভাল সুযোগওদের সম্পর্কে আরো কিছু জানা যাবে। ও এককথায় রাজি হয়ে গেল।

সেদিন থেকেই রাতুলকে মেশিন ঘরে কিছু কাজ দিয়েছিল লোকটা। এখন রাতুল ওর নাম জানেসবাই ওকে রাভি বলে ডাকছিল। ঐ নিগ্ৰোটার নাম জন। আর নাক কান কাটার নাম উমর। এ ছাড়াও আরো চার পাঁচ জন আছে। আকাশ আর হরিকে সাফাইয়ের কাজ দিয়েছে। রিও আর বাকিরা রান্নাঘরের কাজে লেগেছিল। রাতুল দেখেছিল জাহাজটা ছোটো হলেও দুটো লাইফ বোট ছিল। কিন্তু নৌকা সে কখনো চালায়নি আর সমুদ্রের বুকে ঐ লাইফ বোটের ভরসায় ঝাঁপিয়ে পড়া আর আত্মহত‍্যার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

মেশিন ঘরের একঘেয়ে আওয়াজে মাঝে মাঝে মাথা ধরে যেত। ও ডেকের উপর এসে দাঁড়াত। মেয়েদের ঘরটা বন্ধ থাকত সব সময়। একমাত্র খাবার দিতে দুবার খোলা হত। অবশ্য গরাদ দেওয়া জানালা দিয়ে দেখা যেত মেয়েগুলো নেতিয়ে পড়ে রয়েছে। ওদের ঘরের সামনে একটা মহিলা পাহারায় থাকতো সব সময়। রাতুল সবার বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছিল ধীরে ধীরে। রাভি বলেছিল তাকেও ছোটবেলা এভাবে তুলে এনেছিল বাংলাদেশ থেকে। আরব দেশগুলোতে কাজের জন্য প্রতিবছর প্রচুর প্রচুর লোকের দরকার হয়। এভাবেই ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ থেকে প্রচুর ছেলে মেয়ে ওদেশে পাচার করা হয়। শেখদের খিদমতে মেয়েও লাগে প্রচুর। ওদেশে ভারত আর বাংলাদেশের মেয়েদের চাহিদা ভীষণ।

ছয়দিন পর একটা ভূখণ্ড দেখতে পেয়েছিল রাতুল। ওদের জাহাজটা দাঁড়িয়ে ছিল মাঝ সমুদ্রে। দূরের ধূসর সবুজ ভূখণ্ডটা নাকি ওমান। একটা বড় নৌকা এসে লেগেছিল ওদের জাহাজের গায়ে। অনেকগুলো মেয়েকে আর চারটা ছেলেকে নামিয়ে দেওয়া হল। রিও, আকাশ, হরি আর রাতুল থেকে গেছিল জাহাজেই। স্যাটেলাইট ফোনে লোকগুলো অন্য ভাষায় কিছু আলোচনা করছিল। এ ভাষাটা রাতুলের জানা নেই। ও মন দিয়ে শুনে বোঝার চেষ্টা করছিল শুধু।

বিকেলে আবার যাত্রা শুরু হল। তিনটে মেয়ে আর ওরা চারজন এখন জাহাজে থেকে গেছে। উমর বলেছিল আরো দু থেকে তিনদিন লাগবে যেখানে ওরা যাচ্ছে সেখানে পৌঁছাতে।

রাতে রাতুল ডেকে বসে আকাশ দেখছিল। পরিষ্কার আকাশে প্রচুর তারা দেখতে দেখতে ওর বারবার বাড়ির কথা, বাবার কথা, ভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল। ওরা এতদিন ওকে খুঁজে না পেয়ে কী করছে কে জানে। কয়েক বছর আগে ওদের পাড়ার সৃজন বলে একটা ছেলেও হারিয়ে গেছিল। লিপি আর পিউ বলে দুটো মেয়েও হারিয়ে গেছিল কয়েক মাস আগে। সবাই ভেবেছিল উঠতি বয়সের মেয়ে বোধহয় পালিয়ে গেছে কারো সঙ্গে কিন্তু আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আজ হয়তো ওকে খুঁজে না পেয়ে ওকে নিয়েও লোকে নানারকম গল্প বানাচ্ছে। বাবা আর ভাই কি ভাবতে পারবে ও এত দূরে জাহাজে চরে চলেছে আরব মুলুকে।

ওদের স্কুল থেকে একবার শিশু দিবসে একটা সিনেমা দেখিয়েছিল সব বাচ্চাদের, "লাইফ অফ পাই"। ওর আজ নিজেকে সেই সিনেমার ছেলেটার মত মনে হচ্ছে। চারদিকে জলের মাঝে সে ভেসে চলেছে কোথায় কে জানে।

 

()

পাখির ডাকটা শুনে বাংলোর বাইরে বেরিয়ে এসেছিল রিনি। কদিন ধরেই ডাকটা শুনছে কিন্তু পাখিটাকে দেখতে পাচ্ছে না কোথাও। এই কম্পাউন্ডের মধ্যে অজস্র গাছপালা। গেটের বাইরে বড় রাস্তার ওপারে ঘন জঙ্গল শুরু। সন্ধ্যা হলেই ইলেকট্রিক তারের মাধ্যমে ওদের কম্পাউন্ডকে সুরক্ষিত রাখা হয়। মাঝে মাঝেই বড়ো বড়ো বন্য জন্তু বেরিয়ে আসে এদিকে।

আজ দু মাস রিনি এখানে রয়েছে। কলকাতার কোলাহল আর ব্যস্ত জীবন থেকে বহু দূরে পাহাড়ের কোলে এই তরাই অঞ্চলকে প্রথম দিনই ভালবেসে ফেলেছিল রিনি‌। ওদের বাংলোর পিছনে একটা ছোট্ট নদী বা ঝোরা রয়েছে। এখানকার লোকেরা ওদের ভাষায় খোলা বলে। তারপর ঢেউ খেলানো চা বাগান। দুরে নীল পাহাড় আর সামনে সবুজের ঘন জঙ্গল। এ যেন এক রূপকথার দেশ। এই দুমাসে একা একাই তিনদিন জঙ্গলে চলে গেছিল রিনি। আসলে এসে থেকেই ঋজু খুব ব‍্যাস্ত। বিয়ের পর পর ওরা চলে এসেছিল এই ডুয়ার্সে। রিনি জীবনে প্রথম বাবা, মা, দাদা কে ছেড়ে এত দূরে একা এসেছে। তবে এই সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে মন ভাল হয়ে গেছিল ওর। ঋজু এখানকার ফরেস্টের রেঞ্জার।

ওদের বিয়েটা একটু তাড়াহুড় করেই হয়েছিল। ভালো সম্বন্ধ পেয়ে বাবা মা আর হাত ছাড়া করেনি। অষ্টমঙ্গলার পরদিন ঋজুর হাত ধরে এই লাটাগুড়ির কাছে জঙ্গলে চলে এসেছিল রিনি। ঋজু ওকে বাংলোয় পৌঁছে সেদিনই জয়েন করেছিল। বাংলোয় কাজের লোক, রান্নার লোক, মালী সবাই ছিল। রিনি তো মা এর কাছেও তেমন কোনো রান্না শেখেনি। পড়ার বাইরে খেলাধুলো ছাড়া আর কিছুই করেনি কখনোক্যারাটেতে ব্ল্যকবেল্ট রিনি একটু ডাকাবুকো চিরকাল। কিন্তু বিয়ের পর এখানে এসে বই পড়েগান শুনে আর ফেসবুক হোয়াটস এপেই সময় কাটছিল। আসলে ঋজু এসে থেকেই ব্যস্ত । তাছাড়া ওর কাজের কোনো সময় অসময় নেই। যখন তখন জিপ নিয়ে বেরিয়ে যেতে হয় ওকে। জঙ্গলে কাঠ চুরি থেকে চোরা শিকারি সব একাই সামলাতে হয় ওকে। ভাল করে বন্ধুত্বটাও হয়নি এখনো দুজনের। এতো সুন্দর পরিবেশে এসে কোথায় কত রোম্যান্টিক জীবন কাটাবে ভেবেছিল রিনিসেখানে রাতেও ওর ডিউটি থাকে। তাই রিনি একা একাই ঘুরে বেড়ায়। এই দু মাসে একদিন ওকে নিয়ে ঋজু শিলিগুড়ি গেছিল । আর একদিন বিন্দু ঝালং ঘোরাতে নিয়ে গেছিল। এতো কাছে কত সুন্দর সুন্দর পাহাড়ি জায়গা, রিনি ভেবেছিল বিয়ের পর জীবনটাই বদলে যাবেকিন্তু এখন মাঝে মাঝে ঋজুর উপর রাগ হয়। এ কেমন ধারার চাকরী ও বুঝে উঠতে পারে না । নতুন বিয়ের পর বৌ কে ভুলে কেউ এভাবে চাকরীকে আপন করে নিতে পারে তাও রিনির জানা ছিল না।

দুপুরের রোদ মরে এসেছিল। রিনি পাখির খোঁজে পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসে। পিছন দিকে ঝোরাটার ধারে একটা রাধাচূড়া গাছ ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে আছে। মনে হয় ঐ গাছটায় লুকিয়ে আছে পাখিটা। কিন্তু কাছে এসেও দেখতে পায় না রিনি। তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট ঝোরাটা। পরিষ্কার জলের নিচে রুপালী বালি আর কুচো পাথর চিকচিক করছে। পায়ে পায়ে নেমে আসে রিনি। ঠাণ্ডা জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে দেয়। জলের ধারায় পা ভিজিয়ে হাঁটতে ভালই লাগছিল ওর। একটু দূরে একটা বড় পাথর দেখে বসে পড়ে । ও ধারে একটা বড় গাছে হলুদ হলুদ স্পঞ্জের মতো ফল হয়েছে। এক ঝাঁক পাহাড়ি টিয়া উড়ে গেল ওদিকে। দূরের নীল পাহাড়ের গায়ে গোছা গোছা সাদা মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। ঢেউ খেলানো চা বাগান রিনিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে যেন। পায়ে পায়ে ঝোরাটা পার হয়ে ওপারে গিয়ে ওঠে রিনি। এই প্রথম এদিকটায় এলো ওকোমর সমান চা গাছের ফাঁকে পায়ে চলা সরু পথ ধরে বাগানে ঢুকে পড়ে ও। চটিটা ওপারে ছেড়ে এসেছিল। খালি পায়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলো। সামনের চাগাছগুলো বেশ গায়ে গায়ে। এগোতে কষ্ট হচ্ছিল। একটা লোকও চোখে পড়লো না কোথাও। নিস্তব্ধতা ভেদ করে মাঝে মাঝে একটা দুটো পাখি ডেকে উঠছে। একটা ছোট্ট ফাঁকা ঘাস-জমি চোখে পড়লো ওদিকে। কয়েকটা গরু, ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে সেখানে। রিনি ঝোড়ার কাছে ফিরে এলো। বড় পাথরটা লক্ষ্য করে জলটুকু পার হয়ে এসে আবার বসল পাথরের উপর। এখান থেকে দূরে বাংলোটা দেখা যাচ্ছে। পাশেই অফিস আর স্টাফ কোয়াটার। দু ঘর নেপালি একঘর বিহারী আর দুটো আদিবাসী স্টাফের পরিবার থাকে। একজন বাঙ্গালী আছে কিন্তু বিয়ে করেনি। নেপালি বৌ দুটোর সঙ্গে গত মাসে আলাপ হয়েছিল। বেশ মিশুকে ওরা। কিন্তু রেঞ্জার সাহেবের বৌ বলে ওকে একটু সমীহ করে কথা বলে ও বুঝতে পারে দুদিন আগে কিসের যেন প্রসাদ দিয়ে গেছিল ওকে, ফল আর শেল রুটি, গোল গোল মিষ্টি মিষ্টি খেতে।

হঠাৎ ওর চিন্তা জাল ছিন্ন করে কী একটা জন্তু পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে পালাল। রিনি বুঝে ওঠার আগেই একটা গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। সারা গায়ে আঁশ আর লম্বা লেজ। রিনি প্রথমে গোসাপ ভেবেছিল। সূর্য লাল টুকটুকে একটা বলের মতো বড় হয়ে ওধারে গাছগুলোর মাথায় নেমে এসেছে। বসন্তের শেষ হলেও হাওয়ায় বেশ ঠাণ্ডার আমেজ। রিনি উঠে পড়ে। গর্ত টার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রাণীটাকে আরেকবার দেখার চেষ্টা করে কিন্তু দেখতে পায় না আর।

গেটের কাছে গিয়েই ঋজুকে দেখতে পায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছে নিচু গলায়। আর চোখে রিনিকে লক্ষ্য করে ফোন কেটে এগিয়ে আসে। বলে -" আবার একা একা জঙ্গলে গেছিলে তোমার কি ভয় করে না? "

-" কি করবো বলো। দোকা আর পাবো কোথায় ? " রিনি গম্ভীর হয়ে বলে ওঠে।

-" এই সময়টা আমার একটু ব্যস্ত কাটে। আমি মানছি। কিন্তু তাই বলে তুমি এমন ছেলে মানুষী কোরো না। চিতা, হাতি, গণ্ডার কি নেই এখানে!! এভাবে কেউ ঢোকে না ফরেস্টে।"

-" আমি চা বাগানে গেছিলাম। জঙ্গলে যাইনি। আর গেলেও রেঞ্জার সাহেবের ভয়ে তার বৌকে কোনো বন্য জন্তু ছোঁবে না।বলে হাসতে হাসতে রিনি চলে যায় ভিতরে।

ঋজু পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের শেষ রেশ টুকুর দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা বড্ড একরোখা আর জেদি, বিপদে না পড়ে!

 

()

 

সেদিন রাতে খাওয়ার পর একটা সরবত মতো কিছু খেতে দিয়েছিল রাভি ওদের। ওটা খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল রাতুল। ওতে মনে হয় কোনো ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল। জ্ঞান ফিরতেই দেখল সে আর আকাশ একটা ট্রাকে করে কোথাও যাচ্ছে। অনেক ভেড়া আর ছাগলের সাথে ওদের হাত, পা, মুখ বেঁধে তুলে দিয়েছে। সেই জাহাজ থেকে এখানে এলো কী করে কিছুই মনে পড়ছিল না ওর। একটা এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে ট্রাকটা ছুটে চলেছে। চারদিকে ধুলো, রুক্ষ প্রান্তর। গরমে চামড়া পুড়ে যাচ্ছে যেন। রাতুল হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই উঠে বসতে চেষ্টা করলো। পা দিয়ে আকাশ কে ঠেলা মারল একটু। একটু পড়ে আকাশেরও জ্ঞান ফিরল। ও উঠে চারদিক দেখে অবাক হয়ে রাতুলের দিকে তাকাল। রাতুল ততক্ষণে নিজের মুখের সেলটেপ পা দিয়ে খুলে ফেলেছে। আকাশ কে বলল -"আস্তে আস্তে আমার কাছে এসোদেখি তোমার বাঁধন খুলতে পারি নাকি। তারপর তুমি আমারটা খুলে দিও।কিন্তু ওরা এতো শক্ত করে বেঁধেছিল যে রাতুল পারছিল না। তবে মুখের সেলটেপ খুলে দিতে পেরেছে। এরমধ্যেই গাড়িটা মরুভূমির রাস্তা ধরেছে। চারদিকে শুধু ধুধু বালিয়াড়ি। কাঁটা ঝোপ ছাড়া কিছু নেই কোথাও।

অবশেষে ওদের একটা বড় পাঁচিলে ঘেরা বিশাল বাড়ির সামনে নামানো হল। বাড়িটার পিছনে একটা বড়ো খোয়ারঅনেক ভেড়াছাগল রাখা ছিল। একটু পিছনে একটা বড় খোয়ারে প্রচুর উট। রাতুল বই আর টিভির বাইরে এই প্রথম উট দেখল। ওই খোয়ারের এক পাশে ওকে আর আকাশকে বেঁধে রাখল লোকগুলো। এরা আবার সব নতুন লোকআগে দেখেনি রাতুল। একটা ছেলে ওদের থেকে একটু বড়উটগুলোকে খেতে দিচ্ছিল আর ওদের আড় চোখে দেখছিল। লোক দুটো ছেলেটাকে কিছু বলেই চলে গেল বাড়ির দিকে। ছেলেটা মাথা নেড়ে কিছু উত্তর দিল।

রাতুলের গলা শুকিয়ে গেছিলআকাশের ও একই অবস্থা। এই মরুভূমির গরমে ওদের শরীর বিদ্রোহ করছিল এবার। ছেলেটা ওদের কাছে এসে ওদের ভাল করে লক্ষ্য করে বলল-"বাংলাদেশ?"

রাতুল মাথা নেড়ে বলল -"ইন্ডিয়া"

ছেলেটা ঘাসের বোঝার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা বোতল বের করে আনল। ওদের গলায় জলটুকু ঢেলে দিয়ে জানালো ওর নাম হামিদ। পাঁচবছর আগে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে এসেছে। দূরে লোকগুলোকে আসতে দেখে বোতলটা ও চট করে লুকিয়ে কাজে মন দিল আবার।

এবার ঐ লোক দুটোর সঙ্গে আরো দুজন এসেছিল। শেখেদের মতো আলখাল্লা পরনে লোকটা ওদের দেখে কী যেন বলল অন্যদের। সবাই হেসে উঠল। ওরা হামিদকে ডেকে কী সব বলে চলে গেল।

একটু পরে দুটো গাড়ি এলো ঘাস বোঝাই হয়ে । ওদের থেকে একটু বড় পাঁচটা ছেলে নামলো গাড়ি থেকে। সবার পায়ে বেড়ি । ঘাসের বোঝাগুলো নামিয়ে গুছিয়ে রাখল ওরা সবাই। রাতুলদের পাশের ছাওনিতে বসল সবাই। রাতুলদের দেখছিল ওরা সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে। হামিদ এবার রাতুলদের খুলে দিল। সবাইকে রুটি দিল দুটো করে। বান রুটির মত মোটা মোটা। আর একটা করে অজানা ফল। সবাই ঐ শুকনো রুটি খাচ্ছিল।

এক-বোতল জল এনে রাখল হামিদ বলে ছেলেটা। এবার রাতুলদের বাংলায় বলল।-"আপাতত তোরা ওদের সাথে ঘাস কাটতে যাবি কাল থেকে। আর বিকেলে ছাগল, ভেড়াগুলোর দেখাশোনা করবি। ঐ মোতি তোদের শিখিয়ে দেবে সব কাজ" মোতি বলে ছেলেটা মিচকি হাসল ওদের দিকে তাকিয়ে।

সবগুলো ছেলেই ভারত আর বাংলাদেশের। কয়েকদিনেই রাতুল আর আকাশ ওদের বন্ধু হয়ে গেছিল। ভোর রাতে ওদের গাড়ি করে নিয়ে দূরের কোনো ঘাস জমিতে ছেড়ে আসত লোকগুলো। শুরু হত ঘাসকাটা। দুপুরে সূর্য যখন মধ্য গগনে ওদের ফিরিয়ে আনত এখানে। ঐ রুটি খেয়ে অল্প বিশ্রাম। আবার ছাগল ভেড়া আর উটের পরিচর্যা করে সময় কাটতো। সন্ধ্যায় আবার বাসন মাজারান্নাঘরে সাহায্য করা। এসব তো ছিলই। রাতে আবার রুটি খেয়ে ঘুম ঐ উটের খোয়ারের একপাশে। জলের অভাবে এই গরমে স্নান করতে পেতো সপ্তাহে একদিন।

না শুধু এতেই শান্তি ছিল না। মাঝে মধ্যে মালিকের ঘরে ডাক পড়ত ওদের। মালিকের দুই ছেলেই ছিল বিকৃত মনস্ক। সারা রাত তাদের বিকৃত যৌন অত্যাচারের শিকার হতে হত তাদের । সেই রাতে অবশ্য পেট ভরে খেতে পেত নানা উপাদেয় খাবার। আর পরদিন সকালে ঘাস কাটতে যেতে হত না। একবেলার ছুটি মিলত। চারটা মেয়ে বাড়ির ভিতরটা পরিষ্কার রাখত। ঐ মেয়েগুলোকে বাইরে আসতে দিত না কেউ। এছাড়া সপ্তাহে একদিন মালিকের বন্ধুরা আসতো। খানা পিনা হতো দেদার। তাদের খুশি রাখতে আরো মেয়ের আমদানি হত কখনো কখনো আবার কখনো এই ছেলেগুলোর ও ডাক পড়ত মালিকের কোন বন্ধুকে খুশি করতে।

 রাতুল এই নারকীয় জীবন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার রাস্তা খুঁজছিল। কিন্তু এই বিশাল মরুপ্রদেশের সাথে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। হামিদ বলেছিল পালালে অবধারিত মৃত্যু। পায়ের বেড়িটা ছিল আরেক অসুবিধা। ওতেই চিহ্ন থাকতো ওরা কোন শেখের ক্রীতদাস। ঐ বেড়ি পায়ে পালাতে গেলে ধরা পড়বে জানা কথা। আর টাকা পয়সা ছাড়া পালিয়ে যাবেই বা কোথায়!

রাতুল কয়েক দিনেই বুঝে গেছিল এখানে সব কর্মচারীরাই এক সময় ক্রীতদাস ছিল। ভাল কাজ করে মালিকের নেক নজরে পরে কেউ কেউ প্রমোশন পেয়েছিল। অনেকে নাকি বিদ্রোহ করে মারাও পরত। মেয়েগুলো অনেক সময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত‍্যা করতো। একটা নতুন মেয়ে পালাতে গিয়ে ওদের চোখের সামনে মারা গেছিল একদিন।

রাতে শুয়ে শুয়ে চোখের জল ফেলত রাতুল। বাড়ির কথা মনে পড়ত শুধু। আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখত ও। আকাশের তো এই গরম আবহাওয়া সহ্য হয়নি। বার বার অসুস্থ হয়ে পরছিল। একদিন কয়েকটা উটের সাথে ওকে চালান করে দেওয়া হয়েছিল অন্য কোথাও। বোধহয় আবার বিক্রি হয়ে গেছিল অন্য কোনো খামারে। তার পরের সপ্তাহে দুটো নতুন ছেলে এসেছিল। রঘু বলে ছেলেটাও পালাবার স্বপ্ন দেখত রাতুলের মতো। একটা গাড়ির চালকের সাথে ভাল বন্ধুত্ব করেছিল ও। চালকটা বলেছিল সুযোগ মতো ওদের শহরে ছেড়ে দেবে ওর গাড়িতে। কিন্তু রাতুল ভাবত শেখানে গিয়েই বা কি করবে ওরা। টাকা না থাকলে যাবে কোথায়!! খাবে কিরঘু খাবার আর জল জমাতো লুকিয়ে। খাবার জলের খুব সমস্যা ছিল। তবুও রঘু এসব জমিয়ে রাখতো পালাবার জন্য। এই রুটিগুলো খারাপ হতো না সহসা। ঐ মহলের মেয়েদের সাথেও রঘুর চাপা খাতির ছিল। একটা মেয়ে ওকে রুপার গহনা দিয়েছিল কয়েকটা। আর কিছু এদেশিও টাকা। রঘু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল শুধু। রাতুল ঘাস কাটতো আর ভাবতো কবে মুক্তি পাবে । দেওয়ালের গায়ে দাগ দিয়ে ও দিনের হিসাব রাখতো। দেখতে দেখতে একমাসের উপর হয়ে গেছিল। ঘাস কাটতে কাটতে হাতে কড়া পড়ে গেছিল। গরমে শরীর খারাপ লাগত খুব। পালা করে মালিকের ছেলের ঘরেও ডাক পড়েছিল ওর দু দিন। হামিদ একটা কি গুড়ো দিয়েছিলবলেছিল পানীয়ের সাথে মিশিয়ে লোকটাকে খাইয়ে দিলে ও বেহুঁশ হয়ে যাবে। এক ধরনের কাঁটা গাছের শিকরের গুড়ো। রাতুল তাই করেছিল সেদিন। হিংস্র লোকটা ঘুমিয়ে পড়েছিল সেই রাতে।

 

 

()

 

মাঝ রাতে গাড়ির আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেছিল রিনির। মোবাইলে দেখে রাত দুটো বাজে। ঋজু ফিরে এলো রাতের রাউন্ড সেরে বুঝতে পারে রিনি। পাশ ফিরে শোয়। বেশ কিছুক্ষণ পর ঋজুকে বেড রুমে আসতে না দেখে উঠে বসে সে। পাতলা রাত পোশাকের উপর একটা হাল্কা হাউস কোট চাপিয়ে বাইরের ঘরে আসে। কিন্তু অন্ধকার ঘরে ঋজুকে কোথাও দেখতে পায় না। পাশের দুটো ঘর ফাঁকা। অথচ কম্পাউন্ডে গাড়িটা দেখতে পায়। অন্ধকার স্টাডিতে একটা হাল্কা আলোর রেখা ধরে এগিয়ে গিয়ে দেখে ঋজু ল্যাপটপে মগ্ন। পা টিপে টিপে ঢোকে রিনিভেবেছিল চমকে দেবে। স্কিনে চোখ পড়তে চমকে ওঠে। যেই জন্তুটাকে সেদিন বিকেলে জলের ধারে দেখেছিল সেটার মতোই দেখতে একটা প্রাণীর ছবি। পরের এটাচমেন্টে একটা গিরগিটির মতো প্রাণীর ছবি। পাশে কিছু কোড লেখা। পা দুটো আটকে যায় রিনির । এতো রাতে কী করছে ঋজু বুঝতে পারে না। আরেকটা মেল ঢোকেকিছু কোড আর সংখ্যারিনি বুঝতে পারে না কি করবে। ঋজুকে সাট ডাউন করতে দেখে পা টিপে টিপে ফিরে যায় বিছানায়। বেশ কিছুক্ষণ পর ঋজু এসে পাশে শোয় টের পায় রিনি।

পরদিন সকালে জলখাবারের পর রিনি ঋজুকে প্রশ্ন করে -"তুমি তো ফরেস্টের কাঠ সংক্রান্ত ডিপার্টমেন্টে আছো রোজ রাতে তোমায় রাউন্ডে যেতে হয় কেনো?"

-"ফরেস্টের ও সব ব্যাপার তুমি বুঝবে না। কাঠ চুরি একটা মারাত্মক সমস্যা। তাও ভাল আমায় বন্যপ্রাণীদের দেখতে হয় না। ওটা আরো খারাপ কাজ।"

-" রোজ তুমি এতো রাতে ফেরো....."

-" এটা তো বিয়ের আগেই বলেছিলাম যে আমাদের চাকরিতে সময় অসময় বলে কিছু নেই।"

-"তবুও..... চিন্তা তো হয়ই"। রিনি কী বলবেকী করবে বুঝতে পারে না। ঋজুর ফোন আসায় ও উঠে বাইরে চলে যায়। একটু পরে গাড়ির আওয়াজে রিনি বোঝে ও বেরিয়ে গেলো। এ সময়টা রিনি রোজ বাবা মা কে ফোন করে। আজ একবার নিয়মরক্ষা করেই ফোন রেখে দিলো। কম্পাউন্ডের ও ধারে ফরেস্ট অফিস। ও দিকটায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় রিনি। সামনেই কমলদার বাংলো। উনি বন্য প্রাণী বিভাগের রেঞ্জার। বিয়ে করেননি এখনো। রিনি ইতস্তত করছিল ঢুকবে কিনা। এমন সময় কমলদাকে দেখতে পায়। তার দিকেই এগিয়ে আসছে। দূর থেকেই কমলদা বলেন -" নমস্কারবৌদি। কিছু খুঁজছেন নাকি? "

-"নামানে এই ঘুরছি একটু।"

-" ঋজু তো বেরিয়ে গেলো দেখলাম। আপনি নিশ্চই বোর হচ্ছেন এই জঙ্গলে।"

-"কি আর করবোও তো সর্বদা ব্যস্ত। একা একাই ঘুরে বেড়াই তাই।"

-" তা ভাল। তবে ফরেস্টে একা ঢুকবেন না কিন্তু। কত রকম জন্তু রয়েছে, তাছাড়া পোকা মাকড় সাপ খোপ তো আছেই।"

রিনি এবার আসল কথায় আসে। বলে -" আচ্ছা কমলদাসেদিন ঐ চা বাগানে একটা গো সাপ আর সজারুর মত সারা গায়ে আঁশ একটা জন্তু দেখলাম। ওটা কী ছিল?''

-"কোথায় দেখা পেলেনও তো ভীষণ দুর্লভ জন্তুপ‍্যাঙ্গোলিন। আজকাল দেখাই যায় না। খুব কমে গেছে।"

-" ঐ চা বাগানের ভিতরে একটা গর্তে"

-" খুব নিরীহ প্রাণীআপন মনে পিপড়া ধরে খায়। কিন্তু এখন বিপন্ন। সব বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে।"

-" বাবাআমি যা ভয় পেয়েছিলাম। ভাবলাম ডাইনোসরের বাচ্চা নাকি।রিনি হেসে ওঠে। কথা ঘুরাতে চায়। বলে -"আচ্ছাওর এতো নাইট ডিউটি পড়ে কেনো রোজ রাতে ডিউটি থাকে।"

-" বৌদিওটাই আমাদের চাকরি। কাঠ পাচার হয় তো ভীষণ। তাই ওকে রাউন্ড দিতে হয় । বিট ম্যানগুলো সব অলস। হাড়িয়া খেয়ে ঘুমবে রাতে আর জঙ্গল সাফ হয়ে যাবে। আর এই সময় একটু সজাগ থাকতে হয়। বর্ষার পর ওর প্রেশার কমবে একটু।"

আর একটা দুটো সৌজন্য মূলক কথা বলে রিনি ফিরে আসে। মনটা খচখচ করতে থাকে।

গেটের পাশে একটা জামরুল গাছে লাল লাল জামরুল হয়ে আছে। এর আগে লাল জামরুল দেখেনি রিনি। খুব মিষ্টি খেতে। একটা বাচ্চা ছেলে গাছটায় ঢিল মারছিল। এর আগেও একদিন দেখেছিল রিনি। আজ পা টিপে টিপে গিয়ে পিছন থেকে খপ করে ধরে রিনি। ভয় পেয়ে গেছিল ছেলেটা। কেঁদে ফেলে ভয়ে। রিনি ওকে আদর করে বলে -" তুমি জামরুল খাবে? আমার সঙ্গে এসো। গাছে ঢিল মেরো না। আমি পেড়ে দিচ্ছি। "

মালী কাকার লম্বা বাঁশের আঁকশিটা দিয়ে কয়েক থোকা জামরুল পারে রিনি। ছেলেটার মুখে তখনো অবিশ্বাস আর ভয়।

-" তোমার নাম কি কোথায় থাকো ? " রিনি ওর চুলটা ঘেঁটে দিয়ে জিজ্ঞেস করে।

-" মিতুল। ঐ বাজারের কাছে থাকি। ভয়ে ভয়ে বলে বাচ্চাটা। ওকে নিয়ে বারান্দায় এসে বসে রিনি।

 বলে -" তুমি একা একা এখানে জামরুলের জন‍্য এসেছ?"

চুপ করে থাকে মিতুল।

-"তোমার মা বাবা খুঁজবে না তোমায়!! " রিনি বলে।

-" মা নেই আমার। বাবা কাজে গেছে। বাবাকেই খুঁজছিলাম আমি। খিদা পেয়েছিল তো। ছেলেটা জামরুল খেতে খেতে বলে।

রিনি ভাবে, আহা রে। এতটুকু বাচ্চার মা নেই!! ফ্রিজ থেকে একটা চকলেট বার এনে ওর হাতে দেয়। বলে -" তুমি স্কুলে পড়ো কোন ক্লাস?"

-"পড়তামফোরে। এখন আর যাই না।"

-" কেনোপড়তে ভাল লাগে না?"

-" দাদার সাথে যেতাম। এই জঙ্গল পার হয়ে ঐ লাটাগুড়িতে স্কুল। বাসে করে যেতে হয়। দাদা নেই তো। কে নিয়ে যাবে?" উদাস হয়ে যায় ছেলেটা।

-"তোমার দাদা আছে বুঝি। কত বড়কোথায় গেছে দাদা?"

-" দাদা নাইনে পড়তো। খুব ভালবাসতো আমায়। কত কি খাবার বানাতো। পড়াতো। ঘুম পাড়াতো। কোথায় যে চলে গেল একদিন!! আর খুঁজে পাইনি।"

রিনি ভাবে এইটুকু ছেলেটার জীবনে কত দুঃখ।

মুখে বলে -" তুমি এখন থেকে আমার কাছে চলে আসবে খিদা পেলে। আর গাছে ঢিল মারবে না। আমায় বললে আমি পেড়ে দেব ফল। "

ছেলেটা জামরুল খেতে খেতে মাথা নাড়ে

ওদের গলার আওয়াজে রাঁধুনি মাসি বেরিয়ে আসে। মিতুলকে দেখে বলে -" কি রেদাদার কোনো খবর পেলি তোরা ?"

মাথা নাড়ে মিতুল। রাঁধুনি মাসি বলে -" তোর বাপটা তো চোলাই খেয়ে পড়ে থাকে। থানায় না গেলেচাপ না দিলে কি করে পাবি?"

-" কি হয়েছে ওর দাদার?" রিনি প্রশ্ন করে।

-" খুব ভাল ছিল ছেলেটা বৌদি। কি করে যে কি হল!! উবেই গেলো যেন। কেউ বলে জঙ্গলে কোনো জন্তুতে খেয়েছে। কেউ বলে পালিয়ে গেছে। ভগবান জানে কী হয়েছে।মাসী বলে।

রিনি অবাক হয়। বলে -" কতদিন আগেতোমার বাবা পুলিশে খবর দেয়নি?"

-" হ্যাঁদিয়েছিল। ওরা বলেছিল হয়তো শহরে পালিয়ে গেছে। অনেকেই তো পালিয়ে যায়। কিন্তু দাদা তো আমায় ছেড়ে কোথাও যেতো না।"

ছেলেটার চোখে জল। গলাটা বুজে আসে। রাঁধুনি মাসি বলে -" এই দেড় দু মাস বৌদিতোমার বিয়ের সময় হবে।"

আরো কিছুক্ষণ মিতুলের সাথে গল্প করে রিনি। মাসিকে বলে ওকে খেতে দেয় দুপুরে। এই বিদেশে ছোট ছেলেটাকে এভাবে পেয়ে ওর সাথে কথা বলতে ভালই লাগছিল রিনির। মিতুল আবার আসবে বলে যায়

 

ঋজু বেশ বেলা করেই খেতে আসে রোজ। রিনি একটা গল্পের বই খুলে বসে ওয়েট করতে থাকে ঋজুর জন‍্য। হঠাৎ ফোনটা বাজায় চমকে উঠেছিল। ঋজুর ফোন। একটা দরকারে জলপাইগুড়ি হেড অফিসে গিয়ে আটকে গেছেওকে খেয়ে নিতে বলে ঋজু। তার ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে দেয়।

রিনি খেতে খেতে ভাবছিল ঋজুর কথা। চাকরিটাই যেন জীবনের একমাত্র লক্ষ। কেন জানি মনে হয় ঋজু ইচ্ছা করেই দূরে দূরে থাকতে চায়।

রিনি বুঝতে পারে না ঐ প্রাণীগুলোর ফটো নিয়ে ঋজু কি করছিল !! ঋজুর কাজ তো জঙ্গলে কাঠ আর গাছ নিয়ে!! মনটা কেন জানি খুঁতখুঁত করে ওঠে।

বিকেলে রাস্তার ধারে এক ঝাঁক হরিণ দেখে মনটা ভাল হয়ে যায়। এরা মাঝে মাঝেই বেড়িয়ে আসে জঙ্গল থেকে।

রিনি ওর প্রিয় ক্যামেরাটা নিয়ে ফটো তুলতে বেরিয়ে পরে। দাদা ওকে ক্যামেরাটা বিয়েতে দিয়েছিল। এখানে আসার পর এটাই এখন ওর সঙ্গী। হরিণের ফটো তুলতে তুলতে জঙ্গলে ঢুকে যায় রিনি। সরু পায়ে চলা পথটা ধরে চলতে থাকে। অনেক চালতা গাছ এদিকে। গাছের নিচে পাকা চালতা পরে রয়েছে। নানা রং এর নাম না জানা ফুল চারদিকে। একটা বুনো ফুলের গন্ধ। এক-ঝাঁক পাখি উড়ে যায়। ওদিকে আবার এক দল বাদর ওকে দেখে হুটোপুটি করতে থাকে। একটু এগিয়েই সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। রিনি চারদিকের সৌন্দর্য উপভোগ করে প্রাণ ভরে । ও ধারে একটা জলা মতো। নরম মাটিতে কত রকম প্রাণীর পায়ের ছাপ। রিনি আপন মনে ফটো তুলতে থাকে। হঠাৎ একটা লোককে দেখতে পায় ওর লেন্সে। বেশ দূরেএকটা গাছের আড়ালে। চট করে সরে গেল যেন। রিনি একটু অবাক হয়। একটা সিগারেটের গন্ধ নাকে লাগে। মনে হয় কেউ ওকে লক্ষ্য করছে। রিনির গা টা একটু ছমছম করে। ভয় যদিও ওর কমতবু জঙ্গলের এতটা ভেতরে একা এসে কাজটা ভাল করেনি বুঝতে পারে ও। ফিরে চলে সরু পথটা ধরে। হঠাৎ একটা গাছের পাশ থেকে ঋজু এগিয়ে আসে। বলে -"মানা করেছি না একা এভাবে জঙ্গলে ঢুকতে। এখানে কত রকমের প্রাণী আছে জানোএভাবে আর আসবে না তুমি।"

-"তুমি কখন ফিরলেএখানে আমি আছি কে বলল?" রিনি একটু বিরক্ত হয়েই বলে ওঠে।

-"একটু আগেই ফিরেছি। তোমায় কোথাও না পেয়ে এদিকে আসছিলাম। আমার বিটের ছেলেটা তোমায় দেখতে পেয়েছিল। ও বলল তুমি এদিকে আছো।"

-" বাবারেআমাকে কি তোমার লোকেরা চোখে চোখে রাখছে?" রিনি গম্ভীর হয়ে বলে।

-" ছেলেমানুষের মতো কথা বলো না। তোমার যদি এখানে কিছু হয় আমি সবাইকে কি জবাব দেবোকদিন আগে একটা ছেলে হারিয়ে গেছে। তার আগেও দুটো মেয়ে কয়েকটা ছেলে হারিয়েছে। কোনো জন্তু খেলে হাড়গোর তো পাওয়া যাবে!! নিদেন পক্ষে ছেড়া জামা কাপড়!! কিছুই পায়নি কেউ। এবার চলো ।

পায়ে পায়ে ওরা বেরিয়ে আসে বাইরে।

 

()

 

অবশেষে একদিন সুযোগ এলো। গাড়ির ড্রাইভার বলেছিল ঘাসের বোচকার নিচে যদি চার ঘণ্টা লুকিয়ে থাকতে পারে ওদের শহরে ছেড়ে দেবে। কিন্তু ধরা পড়লে সে স্বীকার করবে না যে সে এদের সঙ্গ দিয়েছে। নিজেদের দায়িত্ব নিজেদের নিতে হবে। রুপার গয়নাগুলোর বদলে ওরা এই সুযোগ পেয়েছিল।

সবাই যখন দুপুরে ফিরে এলোওরা যে ঘাসের গাড়িটা শহরে যাবে তাতে উঠে লুকিয়ে ছিল। সন্ধ্যার সময় ওদের শহরে নামিয়ে দিল ড্রাইভার। কিন্তু একে ভাষার অসুবিধাতাছাড়া ওরা বুঝতে পারছিল না কি করবেকোথায় যাবে। ভারতীয় দূতাবাসের খোঁজ করতে গিয়ে আরো বিপদে পড়ল। পায়ের বেড়ি ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেও ওরা পালাতে পারছিল না। পুলিশের কাছে যেতেও ভয় পাচ্ছিল ওরা। বাজারে এক দোকানদারের সাথে আলাপ করে রঘু রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু সেই লোকটা যে ওদের আবার সে রাতেই বিক্রি করে দেবে বোঝেনি ছেলে দুটো। লোকটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দি জানত। রাতে লোকটা ওদের সঙ্গে অনেক গল্প করে সব জেনে নিয়েছিল। আশ্বাস দিয়েছিল সাহায্য করবে। পরদিন ভোরে ঐ লোকটা সঙ্গেই ওরা গেছিল এক নতুন জায়গায়। একটা গাড়ি ভাড়া করে ওদের আরেকটা বড় মহলের মতো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নতুন একটা শেখের বউয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল লোকটা।

তবে এবার খাটনি কম ছিল। এ এক মহিলার খামারভেড়া আর ছাগল দেখে রাখতে হতো। বাড়ির কাজ করতে হতো। খেতেও দিতো পেট ভরে। তবে এ সুখ বেশিদিন টিকলো না।

রঘুর বুদ্ধিতে দ্বিতীয় বার পালাতে গিয়ে আবার এক শেখের খপ্পরে পড়তে হলো। আবার কাতারের এক মরুভূমির মধ্যে বিশাল পশু খামারে বন্দী হলো ওরা। এবার রঘুকে অন্য কোথাও পাঠিয়েছিল মালিক। রাতুল একা এক নতুন পরিবেশে এসে এবারেও মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিল। এখানে একটা মাত্র বাঙ্গালী ছেলে ছিল। রাতুল এখন অবশ্য কিছুটা আরবি শিখেছিল ভাঙ্গা ভাঙ্গা। কাজ চলে যেত। এখানে ছেয়ারা মানে গাড়িখাদ্দামা মানে কাজের মেয়েহাবিল মানে দুধ এমন অনেক কিছুই ও শিখে নিয়েছিল। এই শেখের একটা মেয়ে ছিল অপূর্ব দেখতে। একদিন ওর ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে রাতুলের সাথে মেয়েটার আলাপ হয়েছিল। মেয়েটা ওকে জিজ্ঞেস করেছিল -" ইন্তা পেন বলদ ?" রাতুল জানত এর মানে তোমার দেশ কোথায়। ও বলেছিল -" আনা বলদ ইন্ডিয়ান"

এর পর এই মেয়েটাই ওকে অনেক কিছু শেখাত। কিন্তু শেখ একদিন জানতে পেরে ওকে আবার অন্য জায়গায় বিক্রি করে দিয়েছিল। রাতুল চিন্তা করতো কবে সে মুক্তি পাবে। এভাবে উটের ঘাস কেটেই কি দিন যাবেভাই আর বাবাকে আর কি কখনো দেখতে পাবে না!

এবার যেখানে রাতুল এসেছিল এটা ছিল মালিকের বাগান বাড়ি মতো। শেখের তেলের ব‍্যবসা। মাঝে মাঝে বন্ধুবান্ধব নিয়ে মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করতে আসতো এই বাড়িতে মালিক। আসল বাড়ি ছিল শহর দোহা তে। একজন ভারতীয় একদিন এসেছিল এমন পার্টিতে। রাতুল সুযোগ পেয়ে তাকে খুলে বলেছিল নিজের দুর্দশার কথা। দেশে ফিরতে চায় জানিয়েছিল। লোকটা আশ্বাস দিয়েছিল চেষ্টা করবে। রাতুল কে ভারতীয় দূতাবাসের নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছিল লোকটা।

পরদিন মালিক ফিরে যাওয়ার পর সুযোগ এসেছিল। এই বাগানবাড়ি যে দেখাশোনা করতো সে ওকে বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে দিয়ে বাইরে গেছিল কোনো কাজে। সেই সময় সাহস করে দূতাবাসে ফোন করে এক মহিলাকে সব বলেছিল রাতুল। জায়গাটা কোথায় তাও বলেছিল। মালিকের নাম বলেছিল।

উত্তেজনায় ফোনটা করে ফেলে ভাবছিল সত্যি কি কিছু হবে এই বাড়িতে ওর কোনো বন্ধু ছিল না। কয়েকটা কাফ্রি ছেলে ছিল যাদের সাথে ভাষার অসুবিধায় বন্ধুত্ব হয়নি তেমন।

রোজ কাজ করতে করতে রাতুল ভাবতো কবে বাড়ি ফিরতে পারবে!! কিন্তু আশা ছাড়ত না। তিনদিন পর দূতাবাসের লোক এসেছিল। ওকে নিয়ে গেছিল উদ্ধার করে। ওখানেই ঐ ভারতীয় লোকটার সাথে আবার দেখা হয়েছিল রাতুলের। ওনার নাম ছিল রাম পবন সিং। একজন বড় তেলের ব‍্যবসায়ী। উপর মহলে ভালোই যোগাযোগ ছিল ওঁঁর। সেই সোর্স কাজে লাগিয়ে ওকে উদ্ধার করেছিলেন উনি। পরদিন উনি দেশে ফিরে গেছিলেন। কিন্তু রাতুলের ফেরা অত সহজ ছিল না। অনেক রকম নিয়মের ব‍্যপার ছিল। ওর ভিসা পাসপোর্ট ছিল না। অবৈধ ভাবে অনুপ্রবেশ করায় ঐ দেশের আইনে ও ছিল অপরাধী। আসল অপরাধীদের কেউ ধরেনি অবশ‍্য।

রাতুল কে যে চুরি করে আনা হয়েছে তার কোনো প্রমাণ ও দিতে পারেনি। কি প্রমাণ ও দেবে। আর অত বড় তেলের কারবারি শেখকে ওদের দেশের পুলিশ ঘাটায়নি। আসলে ওরা কখনোই নিজেদের দেশের লোকের দোষ দেখবে না। সবাই জানত যে এভাবে ওদের কাজের জন্য নিয়ে আসা হয় বাইরের থেকে। ওর বাড়ির ঠিকানায় যোগাযোগ করবে বলেছিল দূতাবাস। ওর ঠাঁঁই হয়েছিল ওদেশের সংশোধনাগারে। ওর মতো কয়েকটা ছেলে ছিল ওখানে।

 

 

()

রিনি গান শুনছিল নিজের ঘরে বসে। ঋজু কোনো কাজে শহরে গেছিল। গেটের কাছে মিতুলকে দেখে বাইরে আসে রিনি। মিতুল ওর জন্য পেয়ারা নিয়ে এসেছিল কোথা থেকে। মা হারা ছেলেটা একটু ভালবাসার ছোঁয়া পেয়ে ওকে ভালবেসে ফেলেছিল ভীষণ। দু দিন ধরে নাকি ওর বাবা বাড়ি আসেনি বলে ও।

রিনি ওকে খেতে দিয়ে বলল -" তোর বাবা কোথায় গেছে বলে যায়নি ?"

ও খেতে খেতে মাথা নাড়ে। বলে -" দাদা হারিয়ে যাওয়ার পর বাবা রোজ বাড়ি ফিরতো। এই প্রথম বাবা দু দিন বাড়ি আসেনি। "

রিনি রান্নার মাসীকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ওর বাবার কথা। মাসী বলে-" ওর বাবাটা জঙ্গলে কাঠ চুরি থেকে বন্য প্রাণী পাচার সবেতেই আছে। তবে চুনোপুঁটিএসব করেই যা ইনকাম। মা টা মরে বেঁচেছে। "

রিনি ভাবে একবার থানা থেকে ঘুরে আসবে। থানাটা বাজারের কাছে। মিতুলকে নিয়েই বেরিয়ে পড়ে একটু পরে। মিতুল থানার কাছে এসে একটু ভয় পেয়েছিল। রিনি সাহস দেয় ওকে। থানার অফিসার কে দেখে অবাক হয় রিনিওর দাদার বন্ধু অভি দা।

অভিও রিনিকে দেখে ভীষণ অবাক। রিনি বলে সে এখানকার রেঞ্জারের স্ত্রী। অভি জানার ঋজুর সাথে তার পরিচয় আছে।অনেক গল্পর পরে রিনি কাজের কথায় আসে। মিতুলকে দেখিয়ে সব বলল অভিকে। অভি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মিতুলকে বলল -" ওর বাবাকে আমি চিনি। পরশু রাতে কাঠ পাচার করতে গিয়ে ধরা পরেছিলসদরে চালান হয়েছে। ঋজুর লোকেরাই ধরেছে।"

-" আর ওর দাদার কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো?" রিনি জানতে চায়।

-" নামনে হয় নিজেই কোথাও চলে গেছে।অভি উত্তর দেয়।

রিনি বলে -" ও ভাইকে ছেড়ে কোথাও যেতো না। পড়াশোনায় ভাল ছিল। এভাবে কোথায় যাবে ?"

ফোনটা হঠাৎ বেজে ওঠায় অভি ফোনে কথা বলতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে রিনিকে বলে -" চলতোদের ছেড়ে দি। আবার কাল রাতে একটা গণ্ডারের খড়গো কেউ কেটে নিয়ে গেছে। তোদের ওখান থেকে কমল বাবুর ফোন এসেছিল। যেতে হবে।"

 

রিনির মনে তখন হাজারটা প্রশ্ন। সব কেমন গোলমাল হয়ে যায়। মিতুলকে বাড়ি যেতে দেয় না আর। নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। মিতুল বারবার জানতে চাইছিল বাবার কথা। বাড়ি এসেই ঋজুকে ফোন করে রিনি। মিতুলের বাবার কথা জানতে চায়। ঋজু একটু অবাক হয়। বলে বাড়ি এসে কথা বলবে।

দুপুরে মিতুল ঘুমিয়ে পরলে ঋজুর ল্যাপটপটা খুলে বসে রিনি। ক্যামেরা থেকে ফটোগুলো ল্যাপটপে নেয়। হঠাৎ কি মনে করে জিমেইলটা খোলে। লগ আউট করেনি ঋজু। সহজেই খুলতে পারে রিনি ঋজুর মেল বক্স। কটা মেল চেক করে সে। খুব খারাপ লাগছিল এই ভাবে ঋজুর মেল দেখতে। কিন্তু ঋজুর ব্যবহারে কি একটা সন্দেহ ওর মনে ঢুকে গেছিল তাই ও মেলটা চেক করতে থাকে। কয়েকটা মেলের ভাষায় কোড ব্যবহার করেছে ঋজু। হঠাৎ দুটো মেল ঢোকে। প্রথমটায় লেখা আর দু দিনে কাজটা শেষ করতে হবে।

পরেরটা আবার কোডে লেখা। সাঙ্কেতিক ভাষার কিছুই বোঝে না রিনি। মেল দুটো আন রিড করে রেখে দেয় সে।

ফটো শপে গিয়ে নিজের তোলা ফটোগুলো এডিট করতে থাকে। হঠাৎ একটা ফটোয় এসে আটকে যায়। পরিষ্কার লোকটাকে দেখতে পায়। ওকেই যেন লক্ষ্য করছিল গাছের আড়াল থেকে। ফোনে কথা বলছে কারোর সঙ্গে পরের ফটোতে।

-" এটাই আমার বাবা," ঘুম ভেঙ্গে মিতুল কখন উঠে এসেছিল রিনি লক্ষ্য করেনি। অবাক হয়ে তাকায়। ফটোটা বড় করে মিতুলকে দেখায়। ও বলে-" হ্যাঁ… ওটাই আমার বাবা।"

রিনি বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে ছেলেটাকে। ওর মনটা অন‍্যদিকে ঘুরাতে বলে -" চলআমরা ঘুরে আসি।"

ওকে নিয়ে চা বাগানের দিকে যায়। ঝোরার পাশে প‍্যাঙ্গোলিনের ডেরাটায় একবার উঁকি মারে রিনি। কিছু দেখতে পায় না। বড় হলুদ স্পঞ্জের মতো ফুলের গাছটার নিচে বসে মিতুলকে নিয়ে। মিতুল বলে -" এটা ডেউয়া গাছ। দাঁড়াওপেড়ে আনি।''

তরতর করে গাছে উঠে যায় মিতুল। ছোট ছোট কাঁঠালের মতো কিছুটা আতার মতো দেখতে হলুদ সবুজ মেশানো কয়েকটা ফল পেড়ে আনে। রিনি একটা ভেঙ্গে মুখে দেয়। বেশ টকটক খেতে। খারাপ লাগে না। মিতুলের সাথে টুকটাক গল্প করে সময় কাটায়।

সন্ধ্যায় ফিরে আসে। মিতুল বাড়ি যেতে চাইছিল। কিন্তু যেতে দেয় না রিনি। বসার ঘরের পাশের ছোট ঘরটায় ওর থাকার ব্যবস্থা করে। মিতুল সকাল থেকে একটাই জামা পরে আছেতাই কাজের লোকটাকে দিয়ে ওকে বাড়ি পাঠায় কয়েকটা জামা আনার জন্য।

 

ওরা বেরিয়ে গেলেই ঋজু ফেরেওর থমথমে মুখ দেখে একটু ঘাবড়ে যায় রিনি। ওকে চা দিয়ে আস্তে আস্তে খোঁজ নেয় মিতুলের বাবার। ঋজু সংক্ষেপে বলে কাঠ চুরির কেসে লকআপে আছে ওর বাবা। রিনি জানায় যে মিতুলকে সে এখানে থাকতে বলেছে। একা অতটুকু ছেলে কি করে থাকবেতাই।

ঋজু বলে -" এখন আমি একটু ব্যস্ত থাকবো বেশ কিছু দিন। তোমায় কলকাতা পাঠিয়ে দেবো ভাবছিলাম। ছেলেটা এখানে থাকুক। তুমি ঘুরে এসো কয়েক মাস।"

রিনি বলে -" আমি এখন কোথাও যাব না। কলকাতায় এই গরমে কেউ যায় !! বাবা মাকেই এদিকে আসতে বলব ভাবছিলাম।"

-" আমাকে এখান থেকে ট্রান্সফার করবে গয়ের-কাটা রেঞ্জে। ওদিকে গিয়ে গুছিয়ে বসলে সবাইকে আসতে বলো। এখন আমিও ব্যস্ত। আর যে কোনোদিন বদলির খবর আসবে। "

রিনির মনে হয় ঋজু এড়িয়ে যেতে চাইছে। ও এ দু মাসে কখনো বলেনি বাবা মা কে আসতে বলতে। দু মাসে হাতে গুনে দু বার মাত্র কথা বলেছে মা বাবার সাথেতাও রিনি ফোনটা জোর করে দিয়েছিল বলে। রিনির মনটা খারাপ হয়ে যায়।

ঋজু ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপটা খুলে বসে । মিতুলকে খাইয়ে শুতে পাঠিয়ে দেয় রিনি। তারপর নিজেদের খাবারের ব্যবস্থা করে ঋজুকে ডাকতে যায়। বেশ উত্তেজিত হয়ে কারো সঙ্গে কথা বলছিল ঋজু। রিনি শুনতে পায় হিন্দিতে ও কাউকে বলছেদু দিনে হবে না। এক সপ্তাহ লাগবে তার। রিনির মনে পড়ে যায় মেলটার কথা। ঋজু কি টের পেয়েছে যে রিনি ওর মেলে ঢুকেছিল। অবশ্য রিনি ভেবেই রেখেছিল কিছু জিজ্ঞেস করলে সত্যি কথাই বলবে যে মেল করবে বলে ল্যাপটপ খুলেছিল। কিন্তু ঋজু সাইন আউট করেনি বলে ও মেল করেনি আর।

পরদিন সকালে উঠে দেখে ঋজু খুব ভোরে বেরিয়ে গেছে রাউন্ডে। একটু বেলায় একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়ায়। অভি নেমে আসে। সাথে কমল দা। রিনি ওদের ভেতরে এনে বসায়। কমল দাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। এখনো চোরের হদিশ পাওয়া যায়নি। গণ্ডারের এমন মৃত্যুতে লোকাল লোকজন খেপে গেছে। কদিন আগে একটা হাতির দাঁত ও এভাবেই চুরি হয়েছিল। কমল দা চাপে আছে তাই। অভি দা মিতুলের খোঁজ নিলোওর দাদার ফাইলটা খুলেছে আবার জানালো।

একটু পরে ঋজু এসে ওদের দেখে খুব অবাক। রিনি আর অভি পরস্পর পরিচিতরিনি যে থানায় গেছিল সব শুনল। রিনি কাল কিছু বলেনি বলে হাল্কা অভিযোগ করলো। থানা থেকে ফোন আসায় অভিকে বেরিয়ে যেতে হল একটা দরকারে।

 

 

()

 

পরদিন প্লেন ড্রেসে অভি আবার এসেছিল। একটা ভাল খবর এনেছিল ও। যদিও খবরটা কতটা ভাল তা নিয়ে সন্দেহ ছিল রিনির।

অভি জানিয়েছিল গতকাল জেলা অফিস থেকে রাতুলের ব‍্যপারে জানতে চেয়েছিল উপর মহল। কবে কোথায় কি করে হারিয়ে যায়। থানায় জানিয়েছিল কিনা ওর পরিবারএসব। মনে হয় ওকে পাওয়া গেছে কোথাও। ভেরিফাই হচ্ছিল ওর আইডেন্টিটি। অভি সব রিপোর্ট পাঠিয়েছে। মনে হয় কোনো খবর আসবে তাড়াতাড়ি।

রিনি একথা সেকথার পর চোরা শিকারির কথা জানতে চায়কতদূর এগোল অভিরা ?

অভি একটু গম্ভীর হয়ে বলে -" আসলে এগুলোতে লোকাল লোকেরাই জড়িত। তাই লোক দেখানো এনকোয়েরি হয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না । "

-" মানে!! এই যে পেপারগুলো কত কি লিখছে আর তোমরা বসে আছো সব ছেড়ে ......."

-" আমরা কি করবো কদিন আগে দুটো চিতা বাঘের বাচ্চা পাচার ধরলাম। এক লোকাল এমএলএর ভাই জড়িয়ে ছিল। কেস বন্ধ করে দিতে হল উপর মহলের চাপে। "

রিনি অবাক হয়ে শোনে সব কথা। অভি বলে -" এই যে মিতুলের বাবা বলাই ধরা পরেছেও তো চুনোপুঁটি। ঐ দিকে আমাদের বিজি করেই সেদিন গণ্ডারের খড়গটা চুরি হয়েছিল। ওর বাবার কাঠ চুরিটা গটাপ মতো। কদিন জেলে থাকলে ওর বাবা টাকা পাবে হয়তো। তোদের ফরেস্টের লোকগুলোই জড়িয়ে আছে এসবে।"

রিনির কান মাথা গরম হয়ে ওঠে। উঠে গিয়ে চোখে মুখে জল দেয় ও। আয়নায় নিজের মুখটা দেখে। কপালের সিঁদুর জলের ছিটা লেগে গলে গলে নামছে নাক বেয়ে। মনে হয় রক্ত ধারা। কেউ যেন ওর কপালে আঘাত করেছে। মনে পড়ে মেলগুলোর কথা। একবার ভাবে অভিদা কে সব বলেই দেবে। যা হয় হোক। আবার মনে হয় যে অভি দার ও তো হাত পা বাঁধা। কি করবে অভিদা এসব শুনে। চোখ মুখের জল মুছে শক্ত হয় রিনি। রান্নাঘরে গিয়ে হাল্কা জলখাবার নিয়ে আসে অভিদার জন্য। টুকটাক কথা বলে। অভিদার বৌ বাচ্চার খবর নেয়। আগেই শুনেছিল ওরা শিলিগুড়ি থাকে বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য।

সেদিন রাতে শুতে গিয়ে ঋজুকে একটা প্রশ্ন করে রিনি । বলে -" মিতুলের বাবা কি সত্যি চুরি কর জেলে গেছে?"

-" হঠাৎ এ প্রশ্ন !!" হকচকিয়ে যায় ঋজু।

-"নাআসলে চুরি করেও অনেক বড় অপরাধিরা পার পেয়ে যায় তো একটা গরীব লোক ধরা পড়ে জেলে আছে তাই জিজ্ঞেস করলাম তোমায়।"

-"ও কাঠ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। জেলে না দিলে ওকে ওর দলের লোকেরাই মেরে ফেলত। তাই ওকে জেলে রাখা হয়েছে।একথা বলে ঋজু উঠে যায় বিছানা ছেড়ে।

রিনিও পিছন পিছন বেড়িয়ে আসে বারান্দায়। পূর্ণিমার রাত। আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। সামনের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রিনি দেখে একটা বড় কালো ছায়া এগিয়ে আসছে। ভাল করে দেখে বিশাল দলটাকে। বড় বাচ্চা মিলিয়ে তিরিশ পঁয়ত্রিশটা হবে। সামনের দাঁতালটা দলপতি। মাগুলোর চার পায়ের ফাঁকে বাচ্চাগুলো। বড় রাস্তা পার করে ওদের কম্পাউন্ডের পাশ দিয়ে ঘুরে পিছনের চা বাগানে নেমে গেল দলটা। ঋজুও দেখছিল ঐ দৃশ্য।আস্তে আস্তে দূরের পাহাড়টার দিকে চলে গেল দলটা। রিনি ঘরে ঢুকে বিছানায় এসে বসে। চাঁদের আলোয় বারান্দায় দাঁড়ানো ঋজুর সহজ সরল মুখটা দেখে বিশ্বাস হয় না ও খারাপ কিছু করতে পারে। ঐ নিষ্পাপ চেহারার পেছনে যদি সত্যিই কোনো খারাপ মুখ লুকিয়ে থাকে সব চেয়ে বেশি দুঃখ পাবে রিনি। এই দু মাসে ছেলেটাকে খুব ভালবেসে ফেলেছিল ও। ঋজু সময় না দিলেও ও ঋজুর অপেক্ষায় থাকত। এটাই অভ‍্যাস হয়ে গেছিল ওর। কিন্তু অভিদার কথা আর মেলগুলো যদি পর পর রাখে তবে ........

আর ভাবতে পারে না রিনি। ঋজুর অপেক্ষায় একাই শুয়ে পড়ে বিছানায়। ভোর রাতে একটা স্বপ্ন দেখে ওঘন জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছে রিনি। একদিকে হাতির দলঅন‍্যদিকে গণ্ডার। যত ছুটছে ও আরো গহীন বনে ঢুকে পরছে। এবার ঋজুকে দেখতে পায়। ডাকতে গেলে গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না আর‌ । অভিদা কাকে তাড়া করেছে। প‍্যাঙ্গোলিনটা তাড়া খেয়ে গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। মিতুলের বাবা দৌড়চ্ছে। কে যেন রিনির নাম ধরে ডাকছে। ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়। একটা গুমোট গরম। ঘামে ভিজে গেছে বিছানা। স্বপ্নের রেশটা কাটেনি। বাইরে খুব জোরে একটা বাজ পরে বিদ্যুৎ চমকায়। রিনি কেঁপে ওঠে। ভোর হয়নি। আকাশ কালো করে ঝড় বৃষ্টি নামে। রিনি উঠে কাচের জানালা গুলো বন্ধ করে তাড়াতাড়ি। ঋজু টের পায় নি। অঘোরে ঘুমাচ্ছে। একবার মিতুলের ঘরে যায় রিনি। জানলা দিয়ে হাল্কা ছাট আসছিল। বন্ধ করে পর্দা টাঙ্গিয়ে দেয় সে। ছেলেটার গায়ে একটা পাতলা চাদর দিয়ে ফ্যানটা কমিয়ে দেয়।

বসার ঘরে এসে বসে। ঘড়িতে সারে চারটাবাইরে ঘন অন্ধকার। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিয়ের আগে এই বিদ্যুৎ চমকালে খুব ভয় পেত রিনি। আজ নিজেরই অবাক লাগছে নিজেকে দেখে। মুষল ধারে বৃষ্টি নেমেছিল। এমন বৃষ্টি কলকাতায় সচরাচর হয় না। চারদিক ঝাপসা হয়ে গেছিল। জঙ্গলটা দেখাই যাচ্ছিল না। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। আউট হাউসে রান্নার মাসী ঘুমায়। রিনি একাই এক কাপ কফি বানিয়ে এনে কাচে ঘেরা বারান্দায় বসে। বৃষ্টিটা মনে হচ্ছিল সব ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে ।

কতক্ষণ এভাবে বসে ছিল নিজেই জানে না রিনি। ঝড় বৃষ্টি থামে সেই সকালে। ঋজু উঠে ওকে এভাবে বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হয়েছিল। 

রিনি উঠে যখন রাঁধুনি মাসীকে দরজা খুলে দিল সদ্য স্নাত গাছের পাতা থেকে তখনো টুপ টাপ জল পরছে।আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্য উঠে গেছে। এক ফালি বৃষ্টি ভেজা রোদ এসে পরেছে বারান্দায়। ভেজা হাওয়ায় বুনো ফুলের গন্ধ। একটা মন ভাল করা সকাল।

মিতুলকে নিয়ে আজ একবার ওদের বাড়ি যাবে ভেবেছে রিনি। ওর বই পত্র এনে পড়ানো শুরু করবে ভেবে রেখেছে। ঝড় বৃষ্টিতে প্রচুর গাছপালা ভেঙ্গেছিল। ঋজু জলখাবার খেয়েই চলে গেল সব দেখতে। প্রচুর জামরুল পড়ে আছে গাছের নিচে। মিতুল সে সব কুড়াতে ব্যস্ত। কোথা থেকে এক কোচর কচি আম কুড়িয়ে এনেছে ছেলেটা। রিনির ছোটবেলা মনে পড়ে যায়। সল্টলেকে কোয়াটারে কেটেছিল ছোটবেলা। ঝড় হলেই সে আর দাদা আশেপাশের সব বাচ্চাদের সাথে আম কুড়াতে যেতো। সেই আম থেঁতো করে মাখা খেতো সবাই। সঙ্গে মায়ের বকাটা ফ্রি।

এ সব বৃষ্টিতে ঝোরায় জল বেড়ে যায়। জানালা দিয়ে দেখল রিনি প্রচুর জল এসেছে ঝোরাটায়। স্রোতের মত ঘোলা জল বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখে স্রোতের টানে হলুদ রঙের কি যেন একটা ভেসে যাচ্ছে। আকুলি বিকুলি করছে পারে ওঠার জন্য কিন্তু পারছে না। ভাল করে লক্ষ্য করেএকটা না দুটো মনে হয়। দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে রিনি। মিতুল কে ডেকে নেয়। কাছে গিয়ে দেখে বিড়ালের মতো দুটো হলুদ বাচ্চাকালো ছোপ ছোপ। খুব চেষ্টা করছে জল থেকে ওঠার। শিকড় বাকর আঁকড়ে ধরে ভেসে থাকছে। মিতুল ততক্ষণে একটা ভাঙ্গা গাছের ডাল এগিয়ে দিয়েছে। একটা উঠে এসেছিল ওটা ধরে। অন্যটা আবার ভেসে গেল। রিনি নিজের গায়ের সুতির চাদরটা ছুড়ে দেয় জলে। অন্য প্রান্ত শক্ত করে ধরে রাখে। কামড়ে ধরেছে বাচ্চাটা। এবার টেনে তোলে। মিতুল এক ছুটে মালী-কাকা কে ডেকে এনেছে। ছানা দুটো ভেজা শরীর ঝাড়া দিচ্ছে। এ ওর গা চেটে দিচ্ছে। কি সরল নিষ্পাপ দৃশ্য। রিনি কোলে নিতে যাচ্ছিল বাচ্চাগুলোকে। মালী কাকা বারণ করলো বলল -"ধরবেন না বৌদি। ওদের লালায় জলাতঙ্কর জীবাণু থাকে। জিব দিয়ে চাটার সময় ঐ জীবাণু সারা গায়ে ছড়িয়ে দেয় ওদের মা। তাই হাত দেবেন না। তাছাড়া আপনি ছুলে মানুষের গন্ধ লেগে যাবে ওদের শরীরে।একটা বড় ঝুড়ি দিয়ে মালিকাকা ওদের চাপা দিয়ে যায় অফিসে খবর দিতে। রাঁধুনি মাসী ওদের চিৎকারে চলে এসেছিলএ সব দেখে একটা মালসায় করে দুধ নিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। ঝুড়ি উঁচু করে দুধটা দেওয়া হল। মিনিটের মধ্যে চেটে খেয়ে নিলো বাচ্চা দুটো।

 

কমল দা ততক্ষণে দুটো ছেলে কে নিয়ে চলে এসেছেন। সব দেখে শুনে বললেন -" চা বাগানে কোনো গর্তে লুকিয়ে রেখেছিল ওদের মা। জল ঝড়ে বেরিয়ে এসেছিল ছানা দুটো। এরপর মা খুঁজতে বের হবে। এখনি এগুলোকে জঙ্গলে ছেড়ে দিতে হবে।"

একটা বড় খাঁচায় পুড়ে ছেলে দুটো ওদের জীপে তুলল। কমল দা বেরিয়ে গেল ওদের নিয়ে। এই টুকু সময়েই রিনির কেমন মায়া পড়ে গেছিল ওদের ওপর।

 

 

()

 

রাতুল সংশোধনাগারে বসে বসে ভাবে তার সাথেই কেনো এমন হল। সে ছোটো থেকে ঐ পাহাড় জঙ্গলের বুকে মানুষ হয়েছেবনে জঙ্গলে একা ঘুরে বেরিয়েছে কখনো তেমন বিপদে পরেনি। আজ এতো দিন সে এখানেছোট ভাইটার কি অবস্থা কে জানে!! বাবা বাড়ি না থাকলে ও কি খায়!!কে ওকে স্কুলে নিয়ে যায় !! এমন হাজারটা প্রশ্ন ওর মনে ভিড় করে আসে। এই খানেও ওদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। ভুল হলেই চাবুকের আঘাত নেমে আসে। পেট ভরে খেতেও দেয় না এরা। সে কবে দেশে ফিরতে পারবে কেউ বলতে পারে না। একেক সময় বাকি ছেলেগুলোর কথা ভাবে। কেউ কি পালাতে পেরেছিলনিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে। দূতাবাসে যোগাযোগ করলে বলে তার বাড়ির থেকে কোনো খবর আসেনি। তাকে কবে পাঠানো হবে কেউ জানে না। এই সংশোধনাগারে চোর ডাকাত গুণ্ডাদের সাথে থাকতে থাকতে হাফিয়ে ওঠে রাতুল। আজকাল আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না যে সে বাড়ি ফিরতে পারবে।


অভি এসেছিল জলপাইগুড়ি হেড অফিসের কিছু কাজে কলকাতায়। ওর এক দাদা একজন সরকারি আমলা। কথায় কথায় সেই দাদা জানতে চায় রাতুলের ব্যাপারে। অভি প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল শুনে যে দাদা রাতুলের কথা জানল কি করে। পরে বিতানদা তাকে খুলে বলেছিল ব্যাপারটা। কাতার দূতাবাস থেকে এনকোয়ারি হয়েছিল রাতুলের ব্যাপারে। পাচার চক্রের হাত ঘুরে ছেলেটা ওখানে পৌঁছে গেছিল। এখন লাল ফিতার ফাঁসে আটকে পরেছে ওর দেশে ফেরা।

অভি যত শুনছিল অবাক হচ্ছিল। একটা পাচার চক্র তার এলাকায় মাঝে মধ্যে হানা দিচ্ছে খবর ছিল। কিন্তু তাদের হাত যে কত লম্বা সেটা কল্পনাও করেনি সে। রিনি বলায় রাতুলের ফাইলটার ধুলো ঝেড়ে খুলেছিল। তার শেকড় যে সুদূর আরবে চলে গেছে ভাবেনি কখনো। একবার মিতুলের মুখটা মনে পরে। বিতানদাকে বলে -"ফ‍্যামেলিটাকে কাছ থেকে চিনি। বাবাটা জেলে একটা পেটি কেসে আটকে আছে। ছোট ছেলেটা লোকের দয়ায় বেঁচে আছে। এখনি যদি ভেসে যায় আর একটা গুণ্ডা তৈরি হবে। আর ঐ জঙ্গলের দেশে তো ওদের দেখার কেউ নেই। পাশেও কেউ দাঁড়াবে না। কোনো নেতা নেত্রি ওদের হয়ে গলা ফাটাবে না। মোমবাতি মিছিল হবে না। আমরা কি সরকারী ভাবে পারিনা ছেলেটাকে ফিরিয়ে আনতে। তাহলে ভাইটা বেঁচে যাবে হয়তো।"

-" একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে যদি এমএলএ কে দিয়ে এম পি কে দিয়ে এসেম্বলিতে বলাতে পারো তাড়াতাড়ি কাজ হবে। না হলে লাল ফিতার গল্প তুমি জানো ভাই । "

-" আমি চেষ্টা করবো ফিরে গিয়ে।অভি বলে।

পরদিন ফিরেই রিনিকে সব জানায় অভি। মিতুল আর রিনিকে নিয়ে এমএলএর বাড়ি গিয়ে সব জানায়। জলপাইগুড়ি গিয়ে এমপিকেও জানায়। কমিশনার থেকে মাজিস্ট্রেট সবাইকে অভি নিজে জানায় ঘটনাটা।

এমপি বলেন -" আপনার এলাকার ছেলে আরবে পাচার হচ্ছেআপনার দলবল কি করছিল তখনএখন মনে পড়েছে!!"

-''আমি মানছিআমাদের ভুল। এটা নতুন দল মনে হয়। এক-দুটো কেস হয়েছে। কিন্তু আপাতত বাচ্চাটাকে ফিরিয়ে আনা দরকার "

কমিশনারের প্রশ্নের উত্তরে অভি বলে উপর মহলের চাপে তার লোকজন কাজ করতে পারছে না। চোরা শিকারি থেকে কাঠ চুরি সবেতেই ওপর মহল জড়িত। তাকে সুযোগ দিলেই সে এসব বন্ধর জন্য উঠে পড়ে লাগবে। কিন্তু তাকে কাজ করতে দিতে হবে।

কমিশনার ও জানেন গল্পটা চুপ করে শোনেন সব কিছু।

রিনি কদিন ধরেই দেখেছে ঋজুর ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। যখন তখন বেরিয়ে যাচ্ছে। মিতুলকে স্কুলে পাঠানো শুরু করেছিল রিনি। নিজেই দিয়ে আসত। বাসে উঠলে কুড়ি মিনিট লাগে। বিকেলে মালী কাকা নয়তো কাজের লোকটাকে পাঠাতো।ওর বাবার ছ মাসের জেল হয়েছিল। সেদিন রাতে ঋজু কাঠের বদলে দুটো তক্ষক ধরেছিল। ট্রাক ফেলে লোকগুলো পালিয়ে গেছিল। ওটা কমল দার ডিপার্টমেন্ট। ট্রাকটা ওদের ক্যাম্পাসেই রাখা ছিল। রিনি মিতুল কে নিয়ে গিয়ে তক্ষক দুটো দেখেও এসেছিল। সারা গায়ে লাল লাল বুটি গোসাপের মতো একটু বড় দুটো নিরীহ প্রাণী। এই প্রাণীটাই ঋজুর মেলে ছবি এসেছিল বুঝতে পারে রিনি।এগুলো দিয়ে নাকি ওষুধ তৈরি হয় । কয়েক কোটি টাকা দাম।

ওদের আবার জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেছিল ঋজু। এমনভাবে শুয়ে ছিল প্রাণী দুটো জীবিত না মৃত বোঝা যাচ্ছিল না। দলে দলে লোক আসছিল ওদের দেখতে।

রিনি মিতুলকে স্কুলে দিয়ে আসে। ফেরার পথে কমলের সঙ্গে দেখা।জিপ নিয়ে লাটাগুড়ি থেকে ফিরছিল। রিনিকে দেখে বলে -" চলে আসুন বৌদি। ছেড়ে দিচ্ছি। "

রিনি একবার ইতস্তত করে উঠে আসে। লাটাগুড়ি বাজারের পর দু ধারে শুধু রিসোর্ট। টুরিস্টের মেলা বসেছে যেন। জঙ্গল সাফারির গাড়িগুলো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েরিনি বলে।-" আচ্ছাওরা জঙ্গলে ঢুকলে কিছু কি দেখতে পায় বন্যপ্রাণী কি এতো সহজে দেখা দেয় সবাই কে?"

হেসে ওঠে কমল। বলে-" যে আনন্দ করে ওরা দেখতে যায় সামনে যখন হাতি বা গণ্ডার পরে তখন এই সব টুরিস্টদের অবস্থা হয় দেখার মতো। আর এদের চেঁচামেচিতে সব বন্য জন্তুই পালিয়ে যায়। "

হেসে ফেলে রিনি। কমল বলে -"আপনি দেখতে চান বন্য জন্তুঋজু তো কিছুই দেখাল না আপনাকে। চলুন আজ আমি দেখাই । রিনি কি বলবে বুঝতে পারে না। কিছু বলার আগেই কমল গাড়িটা মেইন রাস্তা থেকে একটা কাঁচা রাস্তায় নামিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যায়। রিনি বলে -" কমল দা আজ থাকআমার দেরি হয়ে যাবে।"

-" এই তো দাঁড়ান । এসেই গেছি প্রায়। এদিক দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাব আমরা। "

জঙ্গল ক্রমশ ঘন হতে থাকে। যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে সেখান দিয়ে গাড়ি যে কম চলে বোঝা যায়। গাছের ডাল পালা ঢুকে পড়ছে গাড়ির ভেতর। মৃদু ইঞ্জিনের শব্দ আর একটানা ঝি ঝির ডাক ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। রিনি মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে সিগন্যাল নেই কোনো।

 

একটা তিরতিরে ঝোরার মধ্যে নেমে যায় জিপটা। কমল বলে -" ভয় পাচ্ছেন বৌদি আজ কিন্তু বন্য প্রাণী দেখাবোই আপনাকে। এটা চিতা বাঘের কোর এড়িয়া। টুরিস্ট ঢোকা বারণ। ইনফেক্ট এদিকে কেউ আসে না বন্য জন্তু ছাড়া।"

রিনি একটু বিরক্ত হচ্ছিল। বলল -" এবার ফিরে চলুন কমলদাআমাকে আবার মিতুলকে আনতে যেতে হবে। "

ঝোরাটা ধরে বেশ কিছুটা আসার পর একটা পরিত্যক্ত ব্রিজ পার করে আবার ঘন জঙ্গলে ঢুকল গাড়ি। একটা পরিত্যক্ত ভাঙ্গা প্রাচীন বাড়ির ধংসাবশেষের সামনে এসে দাঁড়ালো কমল। রিনি কে নামতে বলে নিজেও নেমে এলো। বাড়িটা পরিত্যক্ত হলেও লোকজন আসে বোঝা যায়। মেঝের ধুলোর অনেক জুতোর ছাপ। কমলের সঙ্গে বাড়ির ভেতর ঢুকল রিনি। একটা বড় ঘর। ছাদের টিনে শত সহস্র ছিদ্র দিয়ে আলো ঢুকছে। ঘরের এক কোনায় একটা ছোট খাঁচায় দুটো চিতা বাঘের বাচ্চা। আর একটা খাঁচায় প্রমাণ সাইজের একটা চিতা। রিনি বলে -" এসব কি কমলদাএগুলো তো সেদিনের ছানা দুটো মনে হচ্ছে!!"

-" ঠিক বলেছেন বৌদি। এই বড়টা ওদের মা।আপনি ছানা দুটো ধরে দেওয়ায় মা টাকে সহজেই ধরতে পেরেছিলাম। কিন্তু এদের পাচার করতে খুব কষ্ট হচ্ছে জানেন। কাল তক্ষক দুটোও ধরা পড়ে গেল একটুর জন্য। ঋজুর জন্য প‍্যাঙ্গোলিনগুলোও পাচার করতে পারছি না। নতুন বিয়ে করে কোথায় সুন্দরী বৌ নিয়ে মজা করবে তা নারাত বিরাতে বনে বাদারে ঘুরে আমার ক্ষতি করে বেড়াচ্ছে"

রিনির চোখে পড়ে ওধারে খাঁচায় তিনটে ঐ আঁশ আলা প্রাণী। রতনের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিনি।

রতন বলে -" ঐ প‍্যাঙ্গোলিনের একটা অবশ্য আপনার সাহায্যে ধরেছিলাম। লুকিয়ে থাকে দুষ্টুগুলোসহজে ধরা দেয় না। তা আজ আপনি এখানেই থাকুন বৌদি। আমার কয়েক কোটি টাকা আটকে আছে এসব প্রাণীর সাথে। সবাইকে ভাগ দিয়েও হাতে যা থাকবে আমি পায়ের উপর পা তুলে বসে খাবো। আমি সিঙ্গাপুর চলে যাচ্ছি কালকেই। ঋজুকে বলবেন এগুলো পৌঁছে দিতে জায়গা মত। তাহলেই আপনি বাড়ি ফিরে যাবেন। কাজটা খুব সোজা। ঐ তক্ষক দুটোকে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার কথা আমার আর ঋজুর। ও শুধু সই করবে ও ছিল ছাড়ার সময়। আর এগুলো ও নিজেই চ‍্যাংরাবান্দা দিয়ে বর্ডার পার করে দেবে বাংলাদেশে। খুব সোজা কাজ। তারপর আপনারা আনন্দে থাকুন। আমি আর আসবো না জ্বালাতে। "

-" আচ্ছাআমাকে ঋজুর কাছে নিয়ে চলুন । আমি বলে দিচ্ছি।রিনি বলে ওঠে।

-" না না বৌদি। আপনি এই ফোনে বলুন।নিজের স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে কমল। -"এই ফোন ঋজুর আছে। আপনি এই কাগজে লেখা কথাগুলো বলে দিন। আর মিতুলকে আমার ছেলেরা তুলে নিয়েছে স্কুল থেকে। ওকেও এখানেই পৌঁছে দেবে একটু পরে। আপনি সাহায্য না করলে অবশ্য ওকেও ওর দাদার কাছে পাঠিয়ে দেবো। জন্তুদের চেয়ে মানুষের বাচ্চা পাচার করা খুব সহজ। কিন্তু টাকাটা কম দেয়। "

রিনি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নেয়। দেখে কি লেখা আছে। তারপর বলে -" আমি এসব কিছুই বলব না ।"

-" তাহলে মিতুলের কি হবে ?" হাসতে হাসতে বলে কমল।

ফোন লাগিয়ে রিনির হাতে দেয় কমল। রিনি ঋজুর গলা পেলেই বলে ওঠে -" কমল যা যা বলবে করে দাও। আমার আর মিতুলের খুব বিপদ। তাই ও যা বলবে সব শুনো । "

ফোনটা কেটে দেয় রিনি। এতক্ষণ দুটো লোক দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। কমল তাদের বলল -" বৌদিকে ঐ ঘরে রাখ। আর ছেলেটা এলে ওখানে ঢুকিয়ে দিবি। কোনো ঝামেলা যেন না হয়। দুজনেই শান্ত। "

লোক দুটো রিনিকে নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেয়। রিনির ফোনটা কমল নিয়ে নেয়। একটু পরে গাড়ীর আওয়াজে রিনি বুঝতে পারে কমল চলে গেলো। ছোট ঘরটার দরজা জানালা মজবুত। রিনি বুঝে পায় না কি করবে। বেলা বয়ে যায় । অনেকক্ষণ পরে রিনি আবার গাড়ির আওয়াজ পায়এবার মিতুলের গলা পায় রিনি। মিতুল চিৎকার করছে। দরজা খুলে ওকেও এই ঘরে ঢুকিয়ে দেয় লোকগুলো। মিতুল রিনিকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে। ভয় পেয়েছে ভীষণ বোঝা যায়।

 

()


মিতুলকে আস্তে আস্তে সব বুঝিয়ে বলে রিনি। বলে ভয় পেলে চলবে না। রাতের আগে যে ভাবেই হোক পালাতে হবে। আর অভি আর ঋজুকে খবর দিতে হবে। মিতুল খুব বুদ্ধিমান। বলে সে পারবে পালিয়ে গিয়ে খবর দিতে। রিনি বলে -" আমরা জঙ্গলের অনেক ভেতরে আছি। জিপেই প্রায় এক ঘন্টা লেগেছিল আসতে। এতটা পথ হেঁটে যেতেও সময় লাগবে অনেক। আর রাত হয়ে গেলে বন‍্য জন্তু বেরিয়ে আসবে।"
-" 
কিন্তু যদি ঝোরাটা ধরে যাই তাড়াতাড়ি হবে। এই ঝোরাটা তোমার বাড়ির পিছনের ঝোরাটায় মিশেছে আমি জানি। এখানে দুটোই ঝোরা। বাবাও বলতো।"
মিতুলের সাথে প্ল্যান করে রিনি দরজা ধাক্কায়। বলে -"আমাদের জল তেষ্টা পাচ্ছে। খিদাও পাচ্ছে। দরজা খোলো। " 
একটু পরে একজন দরজা খুলে একটা জলের বোতল আর একটা বিস্কুটের প‍্যাকেট দেয়। রিনি লক্ষ‍্য করে ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। লোকটা আবার বন্ধ করে দেয় ঘরটা। খেয়ে নিয়ে রিনি আবার দরজা ধাক্কায়। বলে বাচ্চাটা বাথরুম করবে। ওকে দরজা খুলে দাও। এবার রিনি রেডি ছিল। এক পাশে এক গোছা দড়ি পড়ে ছিল। রিনি ওটার ফাঁস বানিয়ে দরজার সামনে পেতে রাখে। যেই লোকটা দরজা খুলেছিল রিনি ওর ওড়নাটা ফাসের মতো লোকটার গলায় পরিয়ে টেনে দেয়। আর মিতুল নিচের ফাস টা ধরে তান মারে। লোকটা টাল সামলাতে না পেরে ঘরের ভেতর পড়ে যায়। বেটে লোকটা লম্বা রিনির সাথে পেরে ওঠে না।রিনি বরাবরি এসব ব্যাপারে সাহসি আর ডাকাবুকো। মিতুল নিজের সার্টটা ওর মুখে পুরে দেয়। বেল্ট দিয়ে ওর হাতটা বাঁধে। ওরনাটা খুলে নিয়ে ওকে ঘরে বন্ধ করে ওরা বেরিয়ে আসে। অন‍্য লোকটা বাঘের খাঁচার পাশে বসে আই পটে গান শুনছিল। কিছুই টের পায়নি। ওড়নাটা আর দড়ি দিয়ে একেও বেঁধে ঐ ঘরে ভরে দেয় ওরা। এদের কাছে একটা ফোন ছিল। কিন্তু সিগন‍্যাল নেই। রিনি প্রথমেই প‍্যাঙ্গোলিন গুলোকে বাইরে ছেড়ে দেয়। চিতার বাচ্চার খাঁচাটাও খুলে দেয়। বড় চিতাটাকে খোলার সাহস পায় না। এবার ঝোরার পাশ দিয়ে প্রাণ হাতে করে ছুটতে থাকে দুজনে । বেশ কিছুটা আসার পর ঝোড়াটা দু ভাগ হয়ে যায়। মিতুল রিনির দিকে তাকায় । কি করবে বুঝতে পারে না। মিতুল বলে -" তুমি একদিকে যাওআমি অন‍্যদিকে যাই। "
রিনি ভরসা পায় না। 
এই ঘন জঙ্গলে বাচ্চাটাকে একা ছাড়তে ভয় লাগে। ওদিকে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। ছায়া ঘন হয়ে এসেছে। ঘরে ফেরা পাখিদের ঐকতান মনে করিয়ে দেয় দিন শেষ হচ্ছে। রিনি একটা আন্দাজ করে বাদিকের ঝোরাটা বরাবর দৌড়াতে থাকে। 
চটিটা ছিড়ে যায় নুড়ি পাথরে। তবুও দৌড়ে যায় রিনি। মিতুল পড়ে যায় মুখ থুবরে। থুতনি হাত হাটু ছুলে যায়। কিন্তু দুজনেই বুঝতে পারে দাঁড়ালে হবে না। হঠাৎ রিনি দেখে মোবাইলে আলো জ্বলছে। সিগনাল এসেছে। অভির নম্বর মনে নেই। ঋজুর নম্বর টেপে। পি পি করতে থাকে ফোন। আবার লাইন চলে যায়। দাঁড়িয়ে চেষ্টা করার সময় নেই। ওরা ছুটতে থাকে। এমন সময় একটা জিপের আওয়াজ ভেসে আসে। একটা ঝাঁকড়া গাছের আঁড়ালে লুকিয়ে যায় দুজন। কমলকে দেখতে পায় জিপের মধ‍্যে। ঐ বাড়িটায় কমল গেলেই টের পাবে ওরা পালিয়েছে। এবরো খেবরো রাস্তায় লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে আসছে কমলের জিপ। মিতুল একটা পাথর তুলে ছুড়ে মারে সামনের কাচটা লক্ষ‍্য করে। টাল সামলাতে না পেরে কমল গাড়ি নিয়ে একটা গাছে ধাক্কা মারে। রিনি আর মিতুল ছুটতে থাকে আবার। বেশ কিছুক্ষণ জঙ্গলের ভেতরে ছোটার পর আরো গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়। মিতুল বলে সামনেই মনে হয় বড় রাস্তা। একটা মোড় ঘুরেই ওরা পেয়ে যায় বড় রাস্তা। রিনি আবার ফোনে চেষ্টা করে । এ বার লেগে যায় ঋজুর নম্বর।
রিনি হাফাতে থাকে। কোনো রকমে বলে সে আর মিতুল পালিয়ে বড় রাস্তায় এসেছে। কমল জঙ্গলে ঢুকেছে তাও বলে। কমলের গাড়ি গাছে ধাক্কা খেয়েছে বলে। ঋজু বলে ঠিক কে কে কমলের দলে বোঝা যাচ্ছে না। তাই ওরা যেনো লুকিয়ে থাকে । ঋজু গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ঋজুর গাড়িতেই যেন ওঠে।

একটা বড় গাছের পাশে এসে বসে মিতুল আর রিনি। হুশ হাশ গাড়িগুলো চলে যায় দেখতে থাকে ওরা। অন্ধকার হয়ে আসে। হঠাৎ ওরা কমলকে দেখতে পায়। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে ফোন বের করে কমল।ওর মাথা ফেটে রক্ত ঝরছিল। রিনি প্রমাদ গোনে। তখুনি সশব্দে রিনির ফোনটা বেজে ওঠে। আচমকা বেজে ওঠায় ফোনটা পড়ে যায় হাত থেকে। আর কমল ওদের দেখে ফেলে।

মোবাইলের আলো লক্ষ‍্য করে কমল এগিয়ে আসে। ঋজু ফোন করেছে। স্কিনে ওর নম্বরটা ফুটে ওঠে। কিন্তু কমলের হাতে উঠে এসেছে একটা পিস্তল। রাস্তার দিকে তাকায় রিনি। একটা হেড লাইট বহু দূরে। লাফ দিয়ে মাঝ রাস্তায় এসে পরে রিনি। মিতুল লুকিয়ে থাকে গাছের আড়ালে। এলো মেলো দৌড়ায় রিনি হেডলাইট লক্ষ‍্য করে। গুলি ছুটে আসে কয়েকটা। অভির গাড়ির উপর উপুর হয়ে পড়ে রিনি। গুলিটা কাধ ঘেসে চলে গেছে। পিছনে ঋজুর গাড়ি। অভি নিজের পিস্তল বার করে কমল কে লক্ষ‍্য করে। উল্টো দিক থেকেও দুটো গাড়ি এসে দাঁড়ায়। চারদিকে পুলিশ ঘিরে ফেলে। কমল ভেঙ্গে পড়ে এবার। রিনিকে জড়িয়ে ধরে ঋজু। মিতুল বেরিয়ে আসে পুলিশ দেখে। সবাই মিলে আবার চারটে জিপ নিয়ে জঙ্গলে ঢোকে। কমলকেও হাত কড়া পরিয়ে তুলে নেওয়া হয়। ডি এফ ও সাহেব এসে পৌছে গেছেন ততক্ষণে। কিছুটা গিয়েই কমলের জিপটা রাস্তা জুড়ে পরে থাকায় গাড়ি এগোতে পারে না। ঋজু একটা অন‍্য পথ দেখায়। অন্ধকারে জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এগিয়ে চলে গাড়িগুলো। ঐ বাড়িটার সামনে গিয়েই চারদিক থেকে সবাই ঘিরে ফেলে বাড়িটা। ঐ ঘরে দু জনকে পাওয়া যায়। চিতাটা তখনো খাঁচায় গজরাচ্ছে। বাচ্চা দুটো আশেপাশেই আছে কোথাও। অভি ও ঋজুর ততপরতায় বাকি দলটাও সেই রাতেই ধরা পরে।

সারারাত অপারেশনের পর সকালে ঋজুদের বাংলোয় সবাই জড়ো হয়। মিতুল আর রিনির মুখ থেকে সবাই পুরোটা শুনতে চায়। রিনি বলে পুরোটাকি করে কমল ওকে ওখানে নিয়ে গেছিল।

সবাই ওদের সাহসিকতার প্রশংসা করে। ঋজু বলে সে অনেকদিন থেকেই কমল কে সন্দেহ করছিল। কারন কমল আসার পর এই সব চুরি বেড়ে গেছিল। যদিও ঋজুর ডিপার্টমেন্ট কাঠ আর গাছপালাতবুও ও কমলকে চোখে চোখে রাখতো। আর পাহারা বাড়িয়ে দিয়েছিল জঙ্গলে। কিন্তু প্রমান পায়নি কোনো।
বাধ‍্য হয়ে কমলের যাদের সাথে ব‍্যবসা ছিল সেই লোকগুলো ঋজুকেও দলে টানতে চেয়েছিল। ঋজু রাজি হয়নি। লোকগুলো প্রচুর লোভ দেখিয়ে ওকে ফোন আর মেল করতো। সামনে আসেনি কখনো। ওকে বলেছিল ওদের দলে যোগ না দিলে ওর বৌ এর ক্ষতি করে দেবে। আর ও যদি একটু সাহায‍্য করে ওর একাউন্টে টাকা ঢুকে যাবে। ঋজু সব জলপাইগুড়ি গিয়ে ডিএফওকে জানায়েছিল।
এই প‍্যাঙ্গোলিন আর তক্ষকের দাম কেটি কোটি টাকা বিদেশের বাজারে।বাংলাদেশ হয়ে জলপথে এগুলো পাচার হয়ে যেতো।
মিতুলের বাবা জঙ্গলে শুকনো কাঠ চুরি করলেও আসলে পুলিশ আর বনবিভাগের ইনফর্মার ছিল। কমলের সব খবর ওঁর কাছে ছিল। এই তক্ষকের খবরটাও ঋজুকে মিতুলের বাবাই দিয়েছিল। কিন্তু কমলের লোকেরা বুঝে গেছিল যে ও ইনফর্মার। তাই ওকে মেরে দেবে প্ল্যান করেছিল। ঋজুই কায়দা করে অভির সাহায‍্যে ওকে লকআপে ঢুকিয়েছিল যাতে ওর ক্ষতি না হয়। তক্ষক দুটো যে কমলের নির্দেশে ধরা হয়েছিল ঋজু জানলেও প্রমান ছিলনা বলে কিছু করতে পারেনি। এদিকে কমলের সময় কমে আসছিল। তক্ষক আর প‍্যাঙ্গলিনের জন‍্য টাকা নিয়ে নিয়েছিল এডভান্স। চাকরি ছেড়ে চলে যাবে বলে সব ব‍্যবস্থা করে ফেলেছিল। সিঙ্গাপুরের টিকিট ও হয়ে গেছিল। কিন্তু ঋজুর জন‍্য কাজে বাঁধা পরছিল।

গন্ডারটাকেও কমলের লোকেরাই মেরেছিল স্বীকার করেছিল। খড়্গটা কমলের কাছেই আছে। কমলের বয়ান অনুযায়ি বাকি লোকগুলোকে লাটাগুড়ির এক রিসোর্টের থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
রিনি মনে মনে লজ্জিত হয় যে ঋজুকে সন্দেহ করেছিল সে। আবার কমলের কাছেই গেছিল খোঁজ নিতে। মনে মনে ভাবে ঋজুকে একা পেলেই ক্ষমা চেয়ে নেবে। মিতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে রিনি বলে,-" এসব তো বুঝলাম। কিন্তু রাতুলকে কে চুরি করেছিল? "

অভি বলে -" আসলে ঋজুর এতো কড়া পাহারা দিচ্ছিল যে কমলরা ঠিক করে চুরি করে উঠতে পারছিল না। বন‍্য প্রানী চাইলেই ধরা যায় না। কয়েক দিন ধরে ওয়াচ করে তবে কপাল ভাল থাকলে ধরা যায়।সেই ফাঁকেই ওর দলের লোকেরা একটা দুটো বাচ্চা তুলে বিক্রি করে দিয়েছিল।ঋজু বিয়ে করতে গেছিল। ঐ সুযোগে ওরা বাচ্চাটাকে পাচার করেছিল। রাতুল বনে জঙ্গলে একা ঘুরত। ও ছিল সহজ টারগেট। আজ সকালে দুজন স্বীকার করেছে রাতুলের কথা। অনেক হাত ঘুরে ও আরবে পাচার হয়েছিল। অন্ধকার দুনিয়ার জাল যে সারা পৃথিবী জুড়ে।"

কমিশনার এবং ডি এফ ও সাহেব বলেন যে ওনারা চেষ্টা করবেন যাতে মিতুলের দাদা তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। কারন আজকের অভিযানের আসল হিরো তো মিতুল। আর ওর বাবাও ছাড়া পেয়ে যাবে এবার।
মিতুল এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। এবার ওর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

*****

সাদা ধবধবে প্লেনটার মধ‍্যে ঢুকেও রাতুলের বিশ্বাস হয় না সে বাড়ি ফিরছে। মনে হয় স্বপ্ন দেখছে। নিজেকে আরেক বার চিমটি কেটে দেখে সে। দুটো লোক আর একজন মহিলার সঙ্গে ও ফিরে আসছে। বহুদিন পর আজ ও পরিস্কার জামা পরেছে। ঐ মহিলা অফিসারের দেওয়া চকলেটবারটা ভাইএর জন‍্য পকেটে রেখে দিয়েছে।

নীল আকাশে সাদা মেঘের মাঝখান দিয়ে যখন কাতার এয়ারের বিমানটা উড়ে যায় রাতুল নিচের দিকে তাকিয়ে ভাবে বাকিদের কথা। রিওআকাশরঘু এমন কত অসহায় ছেলেমেয়ে এখানে পড়ে রইলবাড়ি ফেরার জন‍্য সবাই উদগ্রিব। দেশে ফিরেই এদের জন‍্য কিছু করতে হবে। যাতে সবাই বাড়ি ফিরতে পারে সেই চেষ্টা ও নিজেই করবে। সে যখন ফিরতে পেরেছে একদিন সবাই ফিরে আসবে নিজের বাড়ি।

******

মিতুল এই প্রথম কলকাতা এসেছে। রিনির সাথে এয়ার পোর্টে অপেক্ষা করছে দাদার জন‍্য । আজ বহু দিন পর তার দাদা দেশে ফিরছে। আকাশের বুকে ডানা মেলে একের পর এক প্লেনের ওঠা নামা দেখতে দেখতে মিতুল অপেক্ষা করে অনেকেই এসেছে আজ দাদাকে দেখার জন‍্য। কত ক‍্যামেরা কত রিপোর্টারদাদাকে সবাই দেখবে বলে বসে আছে। মিতুলের ও ইন্টারভিউ নিয়েছে সবাই। এত ভিড়ের মধ‍্যেও মিতুল রিনির হাতটা শক্ত করে ধরে থাকে। এই হাত সে কখনো ছাড়বে না। রিনির জন‍্যই আর কিছুক্ষণ পর দাদাকে ফিরে পাবে সে।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে

  বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে দেবদত্তা ব্যানার্জী   একটু শীতলতার খোঁজে   গরমের ছুটির...