এই মন ব্যাকুল যখন তখন…..
দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়
***প্রথম পর্ব
বিকেলের এই
সময়টা আমাদের নিজস্ব গঙ্গার ঘাটে এসে বসতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। অস্তগামী সূর্য যখন
নদীর জলে সিঁদুর গুলে পশ্চিম আকাশে ঢলে পরে আমার মন যেন কোথায় উড়ে যায়। এক মন কেমন
করা সুর কানে ভেসে আসে। একেই বোধহয় বলে গোধূলি বেলা, সেই কনে দেখা আলোয় ঘরে ফেরা
পাখীদের ঐকতান আর বাড়ি বাড়ি শাঁখের আওয়াজে আমার মন চলে যায় কোন অতীতে। সেই
ছোট্টবেলায় , গঙ্গার পারেই আমাদের বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদে।
যৌথ পরিবারে অনেক ভাইবোন মিলে এই সময় খেলা শেষে সবাই ঘরে ফিরে পড়তে বসতাম......
গঙ্গার বুকে ইতি
উতি ভেসে চলা নৌকা ,
জলের ছোট ছোট ঢেউ এর ভাঙ্গা গড়া আর উদাসী হাওয়ার সঙ্গে আমিও এ সময়
রোজ কোথায় ভেসে যাই। আস্তে আস্তে সূর্যের শেষ রশ্মিজালের রেশ টুকু যখন কেটে যায় ও
পারে পলতার দিকে সব বাড়ি বাড়ি আলো জ্বলে ওঠে, আমিও পায়ে পায়ে
এগিয়ে যাই আমার ঘরের দিকে। এই আশ্রমের শেষের ছোট্ট দোতালা বাড়ির দোতলায় আমার ঘর।
জানালা দিয়ে দেখতে পাই পতিত পাবনী গঙ্গা, যা প্রতিনিয়ত
স্নিগ্ধ করে আমার অন্তরকে।
আজ দীর্ঘ সাত
বছর আমি এখানেই আছি। বাড়ি ফিরে যেতে আর ইচ্ছাই করে না। আগে মাঝে মাঝে মা আসতো, বাড়ি নিয়ে যেতে
চাইত, কিন্তু আমি যেতে চাই না দেখে এখন আসা কমিয়ে দিয়েছে।
বাবা সেই একবার এসেছিল, শরীর ভেঙ্গে পড়েছে বলে আর আসতে চায়
না। সুদূর বহরমপুর থেকে আসাও কষ্টকর। দুই দাদাই বাইরে চাকরি করে। বড়দা দুবাই,
ছোড়দা রিয়াদ। দু বছর পর পর আসে। দিদির শ্বশুর বাড়ি বারাসত। দুবার এসেছিল
মায়ের সঙ্গে, ও সংসারে এমন জড়িয়েছে বাপের বাড়িও যেতে পারে
না।
তবে আমি সত্যি
এখানে বেশ ভাল আছি। প্রথম যখন গঙ্গার গায়ে বৈদ্যবাটির এই আশ্রমে এসেছিলাম ঠিক
জানতাম না কেন এসেছি?
আস্তে আস্তে জায়গাটাকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। আমার জীবনের সব দুঃখ কষ্ট
ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছিল।
ডাক্তার জেঠুর সঙ্গে
আমার পরিচয় এখানেই। প্রথমদিনই আমায় উনি খুব আপন করে নিয়েছিলেন। এখন আমি এই
আশ্রমেরই একজন। এখানে না আসলে আমি জানতামই না যে পৃথিবী তে এত সুন্দর একটা জায়গা
আছে। আমাদের এই আশ্রমের নাম "মনের ঠিকানা", সত্যি এখানে এসে
সবাই মনের ঠিকানার খোঁজ পায়।
-"দিদি,
তুমি এখনো এখানেই বসে আছো, জেঠু তোমায় ডাকছেন।
তাড়াতাড়ি এসো।" শ্রেয়ার ডাকে আমার মন ফিরে এলো এখানে। ওর সঙ্গে পা বাড়ালাম
ডাক্তার জেঠুর অফিস ঘরের দিকে। এই শ্রেয়া দু বছর ধরে এখানে আছে। এখন ও পুরো সুস্থ,
হয়তো এবার বাড়ি ফিরে যাবে।
জেঠুর অফিসটা
গেট দিয়ে ঢুকেই উপাসনা ঘরের পাশে। একতলায় একটা ঘরে জেঠুর চেম্বার। পিছনে ছোট্ট
নার্সিং হোম। পাশের লম্বা ঘরে এডমিশন আর অ্যাকাউন্টসের কাজ হয়। এখন সন্ধ্যায় ও
দিকটা বন্ধ থাকে।
শ্রেয়া চলে গেল
উপাসনা ঘরের দিকে। জেঠু বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় দেখেই সেই সুন্দর হাসিটা
হেসে বললেন -"আয়,
তোর সঙ্গে কথা আছে।"
আমায় বসতে বলে
নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। বললেন -"আর্যর কথা মনে আছে তোর। সেই ছোট ছেলেটা ...
ও কাল আসছে। কিছুদিন থাকবে এখানে।"
-"আর্য
তো তিন বছর আগেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছিল। ও তো পড়াও শুরু করেছিল জানতাম। প্রথম
কদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। গত বছর ও কলেজ শেষ করে এমবিএ তে ভর্তি হয়েছিল,
এই শেষ কথা হয়েছিল।" আমি একটু অবাক হয়েই বললাম।
-" হ্যাঁ,
ও সুস্থ। তবে ওর হয়তো অন্য কিছু প্রবলেম হচ্ছে। ও আমায় মেল করেছিল
দু দিন আগে। আজ কথা হয়েছে। ও এখানে এসে কদিন থাকতে চায়।"
-"তাহলে..."
আমার কথা শুরুর
আগেই জেঠু বললেন -"আমি বাদলকে বলেছি বলাকায় ওর থাকার ব্যবস্থা করতে। তুই
একবার সব দেখে নিস। আর্যকে এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ করতে পেরেছিলাম তোর জন্য। ও তোকে
নিজের দিদির মতোই ভালবাসে। মন খুলে তোকে সব বলে। ডাক্তার হিসাবে আমায় হয়তো সব বলতে
ভরসা পায় না। তাই তোকেই সব জেনে আমায় জানাতে হবে ।"
-"ঠিক
আছে। তবে ও প্রথম প্রথম ফোন করলেও ইদানীং আর করতো না আমায়।"
-"ওর
নাকি ফোন হারিয়ে গেছিল, সঙ্গে সবার নম্বর। ও কোনো ভাবে
ইমেইলটা জোগাড় করে মেল করেছিল আমায়। তোর নম্বর ও হারিয়ে ছিল ফোনের সঙ্গে। যাইহোক
আমি উঠলাম, তুই দেখে নে একবার। ও কাল সকালেই পৌঁছে যাবে
বলেছে।"
আমিও উঠে বলাকার
দিকে এগিয়ে গেলাম। উপাসনা-ঘরের থেকে ভেসে আসছে শ্রেয়ার গান......"আগুনের
পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে,
এ জীবন পুণ্য কর....."
আমবাগানের ফাঁকে
ফাঁকে এই ছোট ছোট পাঁচটা কটেজ বানিয়েছিল জেঠু, নাম গীতালি, শ্যামলী,
বলাকা, চৈতালি, পূরবী।
কোন আবাসিকের আত্মীয় বা বাড়ির লোক এলে থাকে এখানে। আর পুরানো কোনো আবাসিক এলেও
থাকতে দেওয়া হয় এই কটেজে। কোনোটায় চারজন কোনটায় দুজনের থাকার ব্যবস্থা। ওধারে
কৃষ্ণচূড়া শিমুল আর পলাশের মাঝে যে বড় দোতলা বাড়ি ওখানে সব ছেলে আবাসিকদের থাকার
ব্যবস্থা। আর আমার ঘরের পিছলে বকুল আর রাধাচুড়া গাছের পাশের নতুন একতলা বাড়িতে
মেয়ে আবাসিকদের। ডাক্তার জেঠু মনের ডাক্তার। খুব বড় সাইকোলজিষ্ট। এই আশ্রম ওনার গত
পঁচিশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টার ফল। উনি ছাড়াও এখানে আরো তিনজন ডাক্তার আছেন। এখানে
অন্য পদ্ধতিতে সবার মনের চিকিৎসা হয়। আমি জানি অনেকেই এই "মনের ঠিকানা" কে পাগলা গারদের সঙ্গে তুলনা করে। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর এখানে
কাটিয়ে আমি বুঝেছি বাইরের পৃথিবীর থেকে এই ছোট্ট আশ্রম অনেক ভাল জায়গা। ঐ
পৃথিবীটাকেই আমার পাগলা গারদ মনে হয় মাঝে মাঝে। সুস্থতার মুখোশ পড়ে একদল অসুস্থ
রুগী ওখানে খোলা ঘুরে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। আর অসহায় দের উপর দাঁত নখ বের করে ঝাঁপিয়ে
পরে সুযোগ পেলেই। এখানে মনের অসুস্থতা দূর করে সবাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে
সাহায্য করা হয়। আর সমাজে বেঁচে থাকার যুদ্ধটাও আমাদের মতো ভুক্তভোগী মেয়েদের
শেখানো হয়। আমার পায়ের নিচে আজ মাটি এনে দিয়েছে এই "মনের ঠিকানা"।
সব রকম বয়সী
লোকের চিকিৎসা হয় এখানে। মেহুলী দি আর শুভমদা দেখেন ছোটদের।
আর জেঠু আর অজিত-দা দেখেন বড়দের। এছাড়া সরমা দি আছেন। উনি সাইকোলজির স্টুডেন্ট
ছিলেন। বহুদিন জেঠুর সঙ্গে থাকতে থাকতে এখন উনি জেঠুর ডান হাত বলতে গেলে। সবাই
ওনার পরামর্শ নেয় প্রয়োজনে।
এছাড়া আছে দুজন
মেয়ে নার্স, তিনজন ছেলে নার্স। বাদলদা, গনেশদা আর কাকলী দি আছে
বাকি সব কিছু দেখাশোনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও অন্যান্য সব কিছুর জন্য। এছাড়া কয়েকজন
অফিস স্টাফ, রাঁধুনি মালী সবাই আছে। ভাবতে অবাক লাগে এদের
বেশির ভাগ এক সময় জেঠুর পেশেন্ট ছিল। যেমন আমি।
আমিও আজ এখানে
চাকরী করছি সবার সাহায্য করার জন্য। জেঠুই আমায় এখানে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।
ওনার লক্ষ্য সুস্থ মনের সঙ্গে সবাইকে সুস্থ জীবন দিয়ে সমাজের মুল স্রোতে ফিরিয়ে
দেওয়া। আমি আজ শুধু সুস্থ নই স্বাবলম্বীও শুধু ওনার জন্য। এই আশ্রম ছেড়ে কোথাও যাওয়ার
কথা আর আমি ভাবতেই পারি না।
দ্বিতীয়
পর্ব
*****
আর্য
যখন প্রথম এই আশ্রমে এসেছিল ওর বয়স তখন মাত্র সতেরো, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে
কলেজে ভর্তি হয়েছিল ও সেই সময়। ওর মা ছোটবেলায় মারা গেছিল। আর বাবা মারা যায় ও যখন
উচ্চমাধ্যমিক দেবে তখন। ওর এক কাকা কাকিমা ওর দায়িত্ব নিতে ওদের বাড়ি এসেছিল সেই
সময়।
কাকা দিল্লীতে ব্যবসা করত। নিঃসন্তান কাকিমাকে আসানসোলে ওদের বাড়ি
রেখে কাকা ফিরে গেছিল। মাঝে মধ্যে আসবে বলে গেছিল। সদ্য বাবা হারিয়ে অনাথ ছেলেটা
কাকিমার মধ্যে মা কে ফিরে পাবে ভেবেছিল। আসলে মা এর আদর ভালবাসা কখনো পায়নি ছেলেটা।
বাবা যতই আগলে রাখুক ওর মনে একটা শূন্যটা তৈরি হয়েছিল। কাকিমাকে পেয়ে ও সেই মা এর
ভালবাসাই খুঁজতে গেছিল।
কিন্তু
এরপর কেমন বদলে গেছিল ছেলেটা। পরীক্ষার পর সব বন্ধুরাই ঘুরতে চলে গেছিল, যোগাযোগ
কমে গেছিল। কলেজে ভর্তির পর বন্ধুরা দেখেছিল আর্য পুরো বদলে গেছে। সদা হাসিখুশি
চঞ্চল মিষ্টি স্বভাবের মিশুকে ছেলেটা কেমন যেন গুটিয়ে গেছিল। কারো সঙ্গে মেশা তো
দুর ভাল করে কথাই বলতো না। সবাইকে এড়িয়ে যেতো। কলেজেও আসতো না। স্কুল লাইফের শেষে
কলেজে এসে সবার যখন ডানা গজায় ও তখন নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে গৃহবন্দি থাকতেই ভালবাসত।
বন্ধুরা বেশি কিছু জিগ্যেস করলে কথা কাটাকাটি থেকে মারপিটে নেমে আসত।
অথচ দু একবার ওর বাড়ি গিয়ে বন্ধুরা দেখে এসেছিল ওর কাকিমা ভীষণ ভালো,
ওকে খুব যত্ন করে। ঠিকা কাজের লোক রাঁধুনি সবাই বলেছিল কাকিমা ওকে
খুব ভালবাসে। বাবা মায়ের অভাব বুঝতে দেয় না। আর্থিক অবস্থাও ওদের ভাল ছিল। বাবা
প্রচুর সম্পত্তি রেখে গেছিল। বাবার ব্যবসা দেখতেন বাবার বিশ্বাসী লোক আলম কাকু।
এই আলম কাকু ওকে ছোট থেকেই ভালবাসতেন। মালিকের মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলের এই পরিণতি
মেনে নিতে পারেননি উনি। মাঝে মধ্যে ব্যবসার কাজে বাড়ি গিয়ে উনি বুঝতে পেরেছিলেন
কাকিমা যতই ভাল হোক আর্যর একটা কিছু অসুবিধা হচ্ছে।
উনি একদিন ব্যবসার কাজ আছে বলে জোর করে আর্যকে বের করে নিয়ে
এসেছিলেন। আগেই উনি মনের ঠিকানা আর ডাক্তার শতানিক ঘোষালের নাম শুনেছিলেন। গাড়ি
করে ওকে নিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছিলেন একদিন।
সেই
দিনটা আজো আমার মনে আছে, আর্য কেমন ভয়ে ভয়ে সবাইকে দেখছিল। কোনো কথা বলছিল
না। প্রথমে গাড়ী থেকে নামতেই চাইছিল না, মহিলাদের দেখলে আরো
ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছিল। অনেক করে ওকে জেঠুর চেম্বারে নিয়ে গেছিল শুভম দা আর বাদল দা।
একটু
পরেই আবার চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গিয়ে শুনেছিলাম ও মেহুলী দিকে দেখে ক্ষেপে গেছিল।
আলম কাকুর সঙ্গে ডাক্তার জেঠু অনেক্ষণ কথা বলে যা যা জানার জেনে নিয়েছিলেন। আর্যকে
রেখে উনি একাই ফিরে গেছিলেন সেদিন।
এরপর
জেঠু নিজেই আর্যর চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। রোগ নির্ণয় করতে বেশি সময় লাগেনি জেঠুর। ক্লান্ত আর্যকে নিজের চেম্বারে হাল্কা মায়াবী আলোয় সম্মোহিত করে প্রায় পুরো ঘটনাই জেনে নিয়েছিলেন জেঠু। আমি অবশ্য পরে জেনেছিলাম ওর সব কথা। চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া জেঠু কারোর গোপন কথা কাউকে বলতেন না।
দুদিন
পর ওর কাকিমা ছুটে এসেছিল ওকে ফিরিয়ে নিতে। সে সময় আমি জেঠুর ঘরে বসে একটা মেল
পাঠাচ্ছিলাম। এক পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স সুন্দরী স্মার্ট মহিলাকে ওভাবে
জেঠুর ঘরে আসতে দেখে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। মহিলা এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিল
আর্যের কাকিমা বলে। আমি কাজ করতে করতে ওদের কথা শুনছিলাম। মহিলার মূল বক্তব্য ছিল
আর্যর কিছু হয়নি। বাবার মৃত্যুতে ও বদলে গেছিল একটু। আলম ওদের ব্যবসা দখল করতে
চায় বলে ওকে পাগল সাজিয়ে পাগলাগারদে দিয়ে গেছে। জেঠুর মাথা কত ঠান্ডা সেদিন প্রমাণ
পেয়েছিলাম। ঐ মহিলা স্মিতা দেবীকে জেঠু পাশের ঘরে বসতে বলে আর্যকে ডেকে এনেছিলেন।
পাশের ঘরে আর্যকে নিয়ে যেতেই আর্য ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছিল। জেঠুর হাত আঁকড়ে ধরে
স্মিতা দেবীকে ইশারা করে কিছু বলতে চাইছিল, ঠোঁট কাঁপছিল কিন্তু শব্দ
তৈরি হচ্ছিল না। ওদিকে ওর কাকিমা ওকে দেখেই আদুরে গলায় ওকে ডাকছিল ফিরে যাওয়ার
জন্য। আস্তে আস্তে উঠে এসে আর্যর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে কিছু বোঝাতে গেছিল ওর
কাকিমা।
হঠাৎ
চিৎকারে আমরা সবাই চমকে উঠেছিলাম। আর্য মুহূর্তের মধ্যে কেমন বদলে গেছিল। জ্বলন্ত চোখে ওনাকে আক্রমণ করতে গেছিল ছেলেটা। বাদল
দা শুভম দা রেডি ছিল । ও ঝাঁপিয়ে পড়তেই ওকে টেনে ধরেছিল ওরা।
আর্যর গায়ে তখন অসুরের শক্তি। ও হয়তো গলা টিপেই ওর কাকিমাকে সেদিন শেষ করে দিত।
অজিত-দা ঠিক সময় ইনজেকশনটা পুশ করায় আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে গেছিল ছেলেটা।
ওকে বেডে শুইয়ে জেঠু স্মিতাদেবীকে নিয়ে নিজের চেম্বারে ফিরেছিলেন ।
আমি তখনো কাজ করছিলাম। আর চোখে একবার আমাকে দেখে জেঠু ওনাকে বসতে বলে নিজেও
বসেছিলেন। জলের একটা গ্লাস ওনাকে দিতেই এক নিশ্বাসে জলটুকু খেয়ে নিয়েছিলেন আর্যর
কাকিমা।
জেঠু
স্থির দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন -"এখনো বলবেন ও সুস্থ? ওকে
আপনি নিয়ে যেতে চান ?"
জেঠুর
এই দৃষ্টির সামনে তাকিয়ে থাকা যায় না আমরা জানি। স্মিতাদেবীও চোখ নামিয়ে নিয়ে
বলেছিল -" ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে যাব ভাবছি।"
-"আর যখন ঘুম ভাঙ্গবে !! তখন? নাকি সারা জীবন ওষুধ
দিয়ে আচ্ছন্ন করে রাখবেন ছেলেটাকে ?" জ্বলে উঠেছিল
জেঠুর শান্ত চোখ দুটো।
-" এসব কি বলছেন আপনি ?"
-" কাল ওর অবচেতন-মনের সব কথাই আমি শুনে নিয়েছি স্মিতা দেবী। নিজের ছেলের
বয়সী একটা বাচ্চার সঙ্গে এসব করতে লজ্জা করেনি আপনার?..."
জেঠুর
কথার মাঝেই হিসহিসে গলায় বলে উঠেছিল ওর কাকিমা স্মিতা দেবী -"কী করেছি আমি
আপনি কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না ডক্টর। বেটার ওকে আমার কাছে দিয়ে দিন।"
-"প্রমাণ আমি কী করবো তা আপনাকে বলতে যাব কেন? আর আজ
আপনাকে এখানে ঢুকতে দিলাম ওর সঙ্গে কথা বলতে দিলাম এ সব আমার চিকিৎসার মধ্যেই পরে। আমার ডায়গোনোসিস ঠিক কিনা বুঝতে চাইছিলাম। আর আজ আপনি প্রমাণ দিয়ে দিলেন যে আপনি সত্যিই ওকে যৌন উৎপীড়ন করতেন। রোজ ওকে উত্তেজক ওষুধ, নেশার
ওষুধ খাইয়ে আপনার বিছানায় টেনে নিতেন। ও আপনাকে মায়ের আসনে বসাতে চেয়েছিল। আর
মাতৃসমা মহিলার এই কদর্য রূপ দেখে ওর সম্পর্কর উপর বিশ্বাস উঠে গেছিল। ও নিজেকে
দোষী ভেবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিল। ও কারো সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা পেত। সর্বদা ভাবত ওকে
দেখে সবাই জেনে যাবে ও খুব খারাপ। একটা অপরিণত মনের বাচ্চা ছেলেকে আপনি নিজের
শরীরের চাহিদার জন্য কোথায় নিয়ে গেছিলেন বুঝতে পারছেন..."
আবার
জেঠুর কথার মধ্যেই ঐ মহিলা বলে উঠেছিল-" আপনি লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছেন ডক্টর।
আমি পুলিশে কমপ্লেন করবো আপনারা ওকে পাগল বানাচ্ছেন এখানে রেখে। আমার স্বামীর সব
মন্ত্রীদের সঙ্গে ওঠা বসা। আমি আপনাকে কোথায় টেনে নামাবো আপনি জানেন না। "
-"চেষ্টা করে দেখুন। তবে লাভ হবে না। মন্ত্রীদের অনেকের চিকিৎসা আমায় গোপনে করতে হয় তো। তাই ওরা কিছু বলবে না সব জানলেও। আর প্রমাণ আমি কোর্টে দেব
ভেবেছি।" জেঠু ঠান্ডা মাথায় একটু হেসে বলেছিলেন।
এবার
বোধহয় স্মিতা দেবী একটু ভয় পেয়েছিল। আমতা আমতা করে বলেছিল -" না, আসলে
ও খুব নীলছবি দেখে আর নেশা করে। ও নিজেই আমার প্রতি দুর্বল ছিল........ ঠিক আছে
আপনি ওকে সুস্থ করুন। আমি আবার পরে আসবো।"
-" নীল ছবি দেখে নেশা কে করে আমি জানি। চিকিৎসার প্রয়োজন তো আপনারও আছে। আপনি স্বামীর কাছে ফিরে যান। নিজের রোগের চিকিৎসা করান। না হলে আমি পুলিশে খবর দেব ।"
জেঠু ওনাকে কথাগুলো বলায় ঐ মহিলা সেদিন উঠে চলে গেছিল। আমি
কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে শ্রুতি নাটকের মতো পুরোটা শুনেছিলাম সেদিন। আর অবাক
হয়েছিলাম যে এই বয়সী একজন মহিলা কতটা নিচে নামতে পারে দেখে।
জেঠু
খুব যত্ন নিয়ে আর্যর চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। ওকে নিজের পাশের ঘরে শুভম দার চোখের সামনে রেখেছিলেন। মেয়েদের ও সহ্য করতে পারত না বলে আমাদের ওদিকে যাওয়া বারণ ছিল। ওকে একা রাখা হতো না কখনো। কেউ না
কেউ সব সময় থাকতো ওর কাছে। গান শুনিয়ে গল্প বলে ওর মনে বিশ্বাস জাগিয়ে ওকে ধীরে
ধীরে স্বাভাবিক করা হচ্ছিল। মাঝে মধ্যে ওর আলম-কাকু এসে ওর খবর নিয়ে যেতেন। ওর
কাকিমা নাকি ফিরে গেছিল, কাকু এক দু বার আলমকে ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল ওর ব্যপারে।
দু
মাস পর থেকে জেঠু ওকে নিয়ে বাগানে আসতেন। গঙ্গা-ঘাটে বসতেন। আমদের বলা হয়েছিল সে
সময় একটা দুটো কথা বলতে ওদের সঙ্গে। সরমা দি কে আস্তে আস্তে ওর দায়িত্ব দেওয়া
হয়েছিল। ও সরমা দি কে মনি বলে ডাকত। খুব ভাল গানের গলা ছিল আর্যর। মাঝে মধ্যে গান
গাইত ঘাটে বসে। গিটার বাজাত ভাল। আলম-কাকুর সঙ্গে ওর প্রিয় দুই বন্ধু একবার এসে
ওকে দেখে গেছিল। ওরাই ওর গিটারটা দিয়ে গেছিল।
হঠাৎ
একদিন জেঠু এসে আমায় বলেছিলেন পরদিন রাখী বন্ধন। আশ্রমে সবাইকে আমরা রাখী পরাতাম। আমি যেন আর্যকে রাখী পরিয়ে ওর মনে ভাই বোনের সম্পর্কের উপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনি। আসলে ওর কাকিমার ঐ রকম
অত্যাচারে ওর মেয়েদের প্রতি একটা ঘৃণা জন্মেছিল। সব সম্পর্কের উপর বিশ্বাস নষ্ট
হয়ে গেছিল। সেটার থেকে ওকে বের করে আনা খুব দরকার ছিল। সরমাদি বয়স্ক, মাতৃস্নেহে
ওকে আগলে রাখতেন। আমি ওর থেকে অল্প বড় বলে আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন জেঠু।
পরদিন
আমি ওকে জেঠুর সামনে রাখী পরিয়ে একটা চকলেটের প্যাকেট দিয়েছিলাম। ও রাখীটা ঘুরিয়ে
ঘুরিয়ে দেখছিল আর আমাকে দেখছিল। হঠাৎ বলেছিল -" রাখী তো ভাইকে বোন পরায়, তাই
না? "
-"হ্যাঁ, আজ থেকে তুমি আমার ভাই।" আমি বলেছিলাম।
ও
অবাক চোখে তাকিয়ে বলেছিল -"আমি তো তোমায় চিনি না। আমি খুব বাজে ছেলে, আমায়
..."
ওর
কথার মাঝেই বলে ছিলাম,-"কে বলেছে তুমি বাজে ছেলে? তুমি আমার ভাই। আমি তোমার দিদি, চল এখন আমার সঙ্গে
।"
জেঠুর
শেখানো মতো ওর হাত ধরে ওকে বাইরে বাগানে নিয়ে গেছিলাম। একটা দশ বছরের ছেলে ছিল
আশ্রমে,
রাহুল। ওর ও কিছু মনের সমস্যা ছিল। কাটিয়ে উঠেছিল। আর্য আর রাহুল কে
নিয়ে অনেক আনন্দ করে ছিলাম সেদিন। বকুল গাছের ছায়ায় বসে গিটার বাজিয়ে আর্য আমাদের
গান শুনিয়েছিল -" এই মন ব্যাকুল যখন তখন ডেকে যায় বারে বারে ..."।
এরপর
আমার সঙ্গে ওর গভীর সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। আমায় ও দিদিভাই বলেই ডাকতো। প্রায় নমাস পর
ও সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছিল।এখানে থাকতেই আবার পড়া শুরু করেছিল।বাড়ি গিয়ে ও ভালই ছিল,
মাঝে দুবার ঘুরে গেছিল এখান থেকে। ফোনে কথা হতো মাঝে মাঝে।
***** তৃতীয় পর্ব
পরের
দিন সকালে নিজে একাই গাড়ি চালিয়ে এসেছিল আর্য। ঝকঝকে তরুণ আর্যকে দেখে আমার খুব
আনন্দ হয়েছিল। আশ্রমে সবার জন্য ও বর্ধমানের সীতাভোগ, মিহিদানা
এনেছিল। জেঠু আর সরমা দিকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিল এসেই। ওকে বলাকায় পৌঁছে
দিয়ে ফ্রেশ হতে বললাম। আমার ওকে দেখে পুরো সুস্থ মনে হচ্ছিল।
দুপুরে
ও সারাক্ষণ জেঠুর চেম্বারে কাটালো। তারপরেই দেখলাম জেঠু সরমা দির সঙ্গে কিছু
আলোচনা করছে।
আমি
আর্যর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করছিলাম। ও রাহুলের খোঁজ নিলো।
রাহুলের বাবা মা আলাদা হয়ে গেছিল বলে রাহুল একটা মানসিক চাপে ছিল।
ওর বাবা হঠাৎ আবার বিয়ে করে নতুন মা নিয়ে আসায় ও খুব হিংস্র হয়ে উঠেছিল। আত্মীয়রা তাতে ইন্ধন জুগিয়ে ছিল প্রচুর। নতুন মা কে সহ্যই করতে পারত না রাহুল।
প্রায় একবছর ওকে এখানে রেখে সুস্থ করতে লেগেছিল। এখন ও দার্জিলিং এ হোস্টেলে থেকে
পড়ে। ওর নিজের বাবা মা পালা করে ওকে নিয়ে আসে বা দেখা শোনা করে।
সব বললাম আমি। চারদিকে সব নতুন আবাসিক, আর্য
সবাইকে দেখছিল। ও এখন পড়ার সঙ্গে ব্যবসাও দেখাশোনা করে আলম কাকুর সঙ্গে। ওর মাথার
উপর ছাতার মতো রয়েছে আলম কাকুর হাত।
পরদিন
সকালে আর্য একটা কাজে কলকাতা গেছিল, তখন জেঠু আমায় ডেকে পাঠালেন।
গিয়ে দেখি মেহুলী দি, সরমা দি শুভম দা সবাই আছে। জেঠু যা বলল
তার সার মর্ম হল, আর্য এখন পুরোপুরি সুস্থ হলেও ঐ ঘটনা ওর
মনে এমন দাগ কেটে গেছিল যে ও আজ নতুন জীবন শুরু করতে ভয় পাচ্ছে। কলেজে কোনো মেয়ে
ওর ঘনিষ্ঠ হতে চাইলেই ওর কেমন লাগতে থাকে। এমনি ও নিজেও যদি কোনো মেয়ের প্রতি
আকৃষ্ট হয় কিছুদিন পর থেকেই ওর মনে হয় ও পারবে না মেয়েটাকে সুখী করতে। ও নিজেই
একটা দন্ধে ভুগছে যে ওর কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো উচিত কিনা।
শুভম
দা এইটুকু শুনেই বললেন -" এভাবে তো ও আবার অসুস্থ হয়ে পরবে। ও কেন ঘটনাটা
ভুলতে পারছে না?"
-"ওর অবচেতন মনে সেই ঘটনার রেশ রয়ে গেছে, ওটা কেউ
মুছতে পারবে না কখনো। কিন্তু ওকে স্বাভাবিক জীবনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে
আমাদের। ও মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হলেও ঘনিষ্ঠ হতে ভয় পাচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো মেয়ে
যদি অগ্ৰনী ভূমিকা নেয়, ওকে জোর করে হিতে বিপরীত হবে। ওর
কাকিমা যে জোর জবরদস্তি করতো সেই স্মৃতি ফিরে আসবে বার বার। অথচ যদি আজ ওর সম্বন্ধ
করে বিয়ে হয় হয়তো ও মেয়েটাকে কাছেই আসতে দেবে না। নারী পুরুষের যে একটা সুন্দর
সম্পর্ক হতে পারে সেটাই ওর মনকে বোঝাতে পারিনি আমরা। এখানে সরমা ওকে মায়ের ভালবাসা
দিয়েছিল। আমি বাবার স্থানটা পূরণ করতে পেরেছিলাম, মেহুলী আর
প্রিয়া ওকে বড়দিদি বন্ধুর মতো ভালবেসেছিল। কিন্তু মনে জীবনসঙ্গী নিয়ে যে আশংকাটা
ঢুকে গেছে তাকে আমরা কি করে দুর করবো!!" জেঠু একটানা বলে জলের গ্লাসটা তুলে
নিয়েছিলেন।
-"ওর যদি কাউকে ভাল লাগে আমরা তাকে সব খুলে বলে তার সাহায্য
চাইতে পারি।" সরমা দি বললেন।
-"তেমন কেউ নেই। আর এ সব শুনলে কি আর কেউ এগিয়ে আসবে ওর দিকে?
এমন সহৃদয় মেয়ে কোথায় পাবো ?" জেঠু
বললেন।
-"কিন্তু যে ওর জীবনে আসবে তাকে ওর সবটুকু জেনেই ওকে ভালবাসতে
হবে।লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না।" এবার মেহুলী দি বললেন।
জেঠু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন -" প্রিয়া তোকে আজ কেন ডেকেছি
জানিস? তুই ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে পারিস। তুই ওর দিদির
মতো। তুই ওকে বোঝাতে পারিস এসব ভুলে যেতে। ওর মনে সাহস আনতে পারিস।এর সঙ্গে সঙ্গে
তুই ওকে বোঝাবি ওর মত অত্যাচার অনেক মেয়েও সহ্য করে। প্রচুর মেয়ে আছে এধরনের
কলঙ্কর জন্য যাদের বিয়ে হয় না, সমাজ ছুড়ে ফেলে। ও যদি তেমন
কাউকে গ্রহণ করে দুজন নিজেদের দুঃখ ভাগ করে নিয়ে একসঙ্গে হাত ধরে জীবনের সুন্দর
দিকটা উপলব্ধি করতে পারবে। "
আমি কী উত্তর দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। বললাম -"আমি চেষ্টা করবো
বোঝাতে।"
আরো
কিছু আলোচনা হল। আমি সব শুনলাম। ভাবছিলাম ছেলেটার জীবনে এ কী বিড়ম্বনা। এর জন্য কে
দায়ী? এ সপ্তাহে শ্রেয়া আর আমার কাজ ভাড়ার ঘর সামলানো, কী
রান্না হবে দেখা। এখানে সবাইকে ঘুরে ফিরে এসব কাজের দায়িত্ব নিতে হয়। শ্রেয়া পুরো
সুস্থ অথচ ওর বাড়ির লোককে খবর দিলেও কেউ ওকে নিতে আসছে না। ওর জীবনের
ট্র্যাজেডিটাও খুব বেদনাদায়ক।
আমের চাটনি হবে বলে গাছতলায় আম কুড়চ্ছিলাম আমরা। জেঠু গাছের আম পাড়তে
বারণ করেন, কিন্তু নিচে পড়া আম আমরা নিতে পারি। সাদা রং এর
ইকো স্পোর্টস টা এসে আমগাছের নিচেই দাঁড়ালো। নেমে এলো আর্য। শ্রেয়ার সঙ্গে ওর আগে
পরিচয় হয়নি, ও এই প্রথম দেখল ওকে। আমি পরিচয় করিয়ে ওদের সঙ্গে
গাছতলার বেদীতে বসলাম। জেঠুর কথা মত সহজ ভাবে আর্যকে বললাম -" এতদিন পরে আবার
এখানে ? কী হল আবার ?"
-"কেন? তোমাদের কথা মনে পড়লো তাই এসেছি
দিদিভাই।"
-" এবার তোমার কথা শুনি। কলেজ পাশ করে এমবিএ করছ, নতুন বান্ধবী হল কজন?"
-"না গো। আমি একাই আছি। এই পাগলকে কে বন্ধু বানাবে বলো"।
আমি ওর চোখে এক গভীর বিষাদের ছায়া দেখলাম।
হেসে বললাম, -"পাগলদেরকেই সবাই ভালবাসে।
আর পাগলরাই ভালবাসতে জানে। ভালবাসা মানেই পাগলামি।"
ও
করুন হেসে আপন মনে গেয়ে উঠল -"এই মন ব্যকুল যখন তখন......" গানটা গুন
গুন করতে করতেই ও নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। আমার কানে লেগে রইল এক চেনা উদাস মন
উথাল পাতাল করা সুর।
শ্রেয়া ওকে দেখছিল, বলল -" কী হয়েছে ওনার?
-"ঠিক তোর মতো ওর ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে কেউ। ভালবাসার বদলে এক
নোংরা অন্ধকার কদর্য সম্পর্কের আবর্তে ওকে টেনে নিয়ে গেছিল ওর এক নিকট
আত্মীয়।"
দেখলাম শ্রেয়ার চোখের কোল ভিজে উঠেছে।
*****চতুর্থ পর্ব
শ্রেয়া
এসেছিল দু বছর আগে। গভীর ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা করতে গেছিল ও। এখানে এসেও দুবার
চেষ্টা করেছিল আত্মহত্যার। আমি আর সরমা দি ওকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতাম। আজ ও
সুস্থ।
আমরা
প্রথমে জানতাম ও গন-ধর্ষণের শিকার, তাই ডিপ্রেশনে ভুগছে। ও
কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর জানতে পেরেছিলাম আসল ঘটনা। খুব অবাক হয়েছিলাম জানতে পেরে ।
শ্রেয়াদের
বাড়ি ছিল হাওড়ার একটু ভেতরে, বেলগাছিয়ার দিকে। রোজ কলেজ করে কম্পিউটার
ক্লাস করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। দু দিন প্রাইভেট কোচিং এ পড়ে ফিরতো প্রায় রাত
নটায়। বাস রাস্তা থেকে শুনশান গলিটা পেরিয়ে বড় পুকুরের ধার দিয়ে দ্রুত হেঁটে যেতো
সে। ঐ পুকুর পারেই কতগুলো ছেলে রোজ নেশা করতো আর ওর মতো অল্প বয়স্ক মেয়ে দেখলে
ভেসে আসত চটুল মন্তব্য আর হিন্দি গানের কলি। বাবা মা দু জনেই চাকরী করতেন। ওনাদের
ফেরার কোনো ঠিক ছিল না। শ্রেয়াই আগে ফিরতো।
শ্রেয়াদের
পাশের ফ্ল্যাটে থাকত রৌনক। পড়াশোনায় দুর্দান্ত ছেলেটা দেখতেও খুব সুন্দর আর
স্বভাবেও ভাল। এমবিএ করছিল রৌনক, তার সঙ্গে একটা এনজিও তে কাজ করতো।
শ্রেয়ার সঙ্গে একটা মিষ্টি মধুর সম্পর্ক ছিল রৌনকের এবং দুইবাড়ির সন্মতিতে ঠিক
হয়েছিল পড়া শেষ হলেই ওদের বিবাহ বন্ধনে বেঁধে ফেলা হবে। রৌনকের বাবা ছিলেন না। মা
একটা স্কুলে পড়াতেন। খুব স্নেহ করতেন শ্রেয়াকে। শ্রেয়া রৌনককে ঐ ছেলেগুলোর কথা
বহুবার বলেছিল। রৌনক এক দু দিন ওকে এগিয়ে এসে নিয়েও গেছে। কিন্তু রৌনক সব সময়
শ্রেয়াকে বলতো একা নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে শিখতে। স্বাবলম্বী হতে। তাই খুব প্রয়োজন
ছাড়া শ্রেয়া কখনো ওকে ফোন করত না। রৌনকের সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক থাকলেও রৌনক ছিল
খুব গম্ভীর ও রিজার্ভ। প্রচুর সুযোগ থাকলেও কখনো শ্রেয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার
চেষ্টা করেনি। ও নিজের পড়া আর এনজিওর কাজ নিয়েই থাকত। অন্যদিকে শ্রেয়া ছিল ভীষণ
রোম্যান্টিক, কল্পনা প্রবণ, আর
চঞ্চল।শ্রেয়া ছিল উচ্ছল একটা ঝরনার মতো আর রৌনক শান্ত গভীর এক দীঘি।
কদিন
ধরেই ছেলেগুলো খুব পিছনে লেগেছিল, কখনো অশ্লীল ইঙ্গিত কখনো পথ আটকান চলছিল।
সে দিন শ্রেয়ার একটু দেরি হয়ে গেছিল, ঝড় বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল
পথে। ওদিকে জল লেগে মোবাইলটাও কাজ করছিল না। বড় রাস্তা থেকে গলি পথে ঢুকতেই দেখে
লোডশেডিং। পথে এক হাঁটু জল। একটু দাঁড়িয়ে শ্রেয়া ভাবছিল যদি পরিচিত কাউকে পাওয়া
যায় যে এ পথে যাবে..... ।
প্রায় দশ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিন্তু ঐ জল ঝড়ের রাতে কেউ আসেনি।
ঘন ঘন বিদ্যুতের চমক বলছিল আবার বৃষ্টি এলো বলে। ঠাকুরের নাম স্মরণ করে এগোতে
যাচ্ছিল শ্রেয়া, তক্ষুনি সামনে চলে এসেছিল রাজা বলে ঐ বখাটে
ছেলেটা।
বলেছিল -" কি গো? আজ বডি-গার্ড নেই ?
চলো, আমিই এগিয়ে দিচ্ছি আজ। "
শ্রেয়া ভয়ে দু পা পিছিয়ে গেছিল।
রাজা
তাই দেখে বলেছিল -"আরে জানেমন, আমি তো তোমার জন্যই রোজ ওখানে
বসি। আজ তোমার দেরি দেখে এগিয়ে এসেছিলাম। " শ্রেয়া বুঝতে পারেনি তার কী করা
উচিত।
-"দিনকাল বড্ড খারাপ । এভাবে বড় রাস্তায় না দাঁড়িয়ে থেকে আমার সঙ্গে
চলো সুন্দরী।" এবার রাজা ওর হাতটা ধরেছিল।শ্রেয়া হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বড়
রাস্তার দিকে ফিরে গেছিল। ও পাশে আর একটা রাস্তা ছিল বাড়ি ফেরার। ভেবে নিয়েছিল সেই
ঘুরপথেই বাড়ি যাবে। ওদিকে তবু লোকজন চলত একটু। কয়েকটা দোকান ছিল। টোটোও পাওয়া যেত।
দ্রুত পায়ে ঐদিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে একবার পিছন ফিরে দেখেছিল রাজা তখনো দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। সব দোকান বন্ধ। বৃষ্টির জন্য সব শুনশান। টোটো বা রিক্সাও
চোখে পড়ে না একটা। বেশ কিছুটা আসার পর একটা বন্ধ কারখানা ছিল পথের পাশে, বিদ্যুতের
চমকে শ্রেয়া দেখেছিল এই ঝড়ের রাতেও কয়েকটা ছেলে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছিল শ্রেয়া। হঠাৎ কেউ বলে ওঠে -" আরে, এতো রাতে একা কোথায় চললে রানী। বললে পৌঁছে দেব
তোমায়। "
ও
প্রায় দৌড়ে পার হয়ে যাবে ভেবেছিল। আর দুটো রাস্তার মোড় পার হলেই বাড়ি পৌঁছে যেত ও।
কিন্ত ছেলেগুলো বাইকে করেই ওকে ঘিরে ধরেছিল। বৃষ্টিটাও তখনি শুরু হয়েছিল। একজন ওর
ওড়নাটা টেনে নিয়েছিল। দুজন ওকে টানতে টানতে বন্ধ কারখানাটার দিকে নিয়ে গেছিল।
বৃষ্টির আর মেঘের গর্জনের আওয়াজে ওর চিৎকার কারর কানে পৌঁছায়নি।
যতক্ষণ
পেরেছিল ওদের বাঁধা দিতে চেষ্টা করে গেছিল। কিন্তু ওর চিৎকার ঐ ঝড় জলের রাতে কেউ শোনেনি সেদিন। তিনটে জন্তু যখন
ওকে ছিঁড়ে খাচ্ছিল তখনি হঠাৎ পিছন থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পরেছিল রাজা আর নটে। ও যে ঐ পথে ফিরবে বুঝতে পেরে হয়তো রাজা এগিয়ে এসেছিল ওদিকে।
চরম সর্বনাশ হওয়ার আগেই দুই দলের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে
গেছিল। একটা ঘোরের মধ্যে ও বুঝতে পেরেছিল রাজারা ওকে উদ্ধার করতেই এসেছে। ওর শত
ছিন্ন পোশাকে লজ্জা নিবারণের উপায় ছিল না। রাজা নিজের শার্টটা ওর দিকে ছুঁড়ে
দিয়েছিল। তিনটে ছেলেই পালিয়ে গেছিল ভয়ে। আর রাজা আর নটেই ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল
বিধ্বস্ত অবস্থায়।
বাবা মা আগেই ফিরেছিল সেদিন, চরম উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল ওর জন্য। রাজাদের সঙ্গে ঐ অবস্থায় ওকে দেখে বাবা আর মা কথা
হারিয়ে ফেলেছিল। রৌনক আর ওর মাও এসেছিল ওদের কথা শুনে। রাজারা বলেছিল পুলিশে যেতে
কিন্তু রৌনক আর শ্রেয়ার বাবা মা মানা করেছিল। শ্রেয়া কিছু ভাবার মত অবস্থায় ছিল
না। মা বাবা যখন বারবার বলছিল ও কেন ঐদিক দিয়ে ঘুরে আসতে গেছিল ওর দুচোখ শুধু জলে
ভরে উঠেছিল। রাজাও চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। শ্রেয়া বুঝতে পারছিল না এই ঘটনার জন্য রাজা
দায়ী নাকি রাজাই ওর পরিত্রাতা !!! সব গুলিয়ে যাচ্ছিল। সারা গায়ের আঁচড় কামড়ের ক্ষতগুলোর
থেকেও গভীর ক্ষত হয়েছিল ওর মনে। বাথরুমে গিয়ে জলের ধারার নিচে দাঁড়িয়ে অনেক
কেঁদেছিল ও। সারা রাত জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকে চলেছিল।
এরপর
ও নিজেকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে ফেলেছিল। কলেজেও যেতো না আর। মা আর বাবা কেউ
একজন ওর কাছে থাকত। রৌনক আর ওর মা ও আসত। কিন্তু সবাই যেন বোবা, কেউ
ওকে কিছু জিগ্যেস করতো না। ঠিক কী হয়েছিল সে দিন ও কাউকে বলতেই পারেনি। কেউ শুনতেও
চায়নি। ও বহুবার ভেবেছিল ওর যে চরম সর্বনাশ হয়নি সেটা রৌনকের অন্তত জানা দরকার।
কিন্তু ও সুযোগ পায়নি।
প্রায় পনেরো দিন পর বাবা মা দুজনেই সেদিন অফিসে গেছিল, ও একাই ছিল। রাজা আর নটে বিকেলে এসেছিল ওর খোঁজ নিতে। এর আগেও দুদিন
এসেছিল ওরা। বাবা মা নেই শুনে দরজা থেকেই ফিরে গেছিল ওরা।আর তখনি এসেছিল রৌনক।
ওদের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়াকে জিগ্যেস
করেছিল -"কী ব্যপার ! ওরা এখানে কেনো?"
শ্রেয়া
ওকে ঘরে ডেকে বসিয়ে বলেছিল যে-" ওরা আসে মাঝে মধ্যে খোঁজ নিতে।"
রৌনক জ্বলন্ত চোখে বলেছিল -" ওদের বেশি মাথায় তুলিস না। ওরা
সবাই সমান।"
-"ওদের জন্যই সেদিন আমি বেঁচে ফিরেছিলাম। ওরাই সেদিন চরম
সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করেছিল আমায়........"
ওকে বলতে না দিয়েই রৌনক বলেছিল -" সর্বনাশের আর বাকি কী ছিল ?
ওদের বন্ধুরাই হয়তো সেদিন তোকে ধরেছিল, আমি তো
আর দেখিনি কে কে ছিল?"
শ্রেয়া অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, যে ছেলেটা তার
সারাজীবনের সাথী হতে চলেছিল তার কথায় এমন অবিশ্বাসের সুর !!
ওর ভেতরটা ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিল রৌনকের কথা গুলো। ছুটে চলে
গেছিল নিজের ঘরে। বিছানায় বালিশের গায়ে উজাড় করে দিয়েছিল অভিমান। একটু পরেই নিজের
শরীরের উপর রৌনকের ঘন হয়ে আসা টের পেয়ে ছিটকে সরে গেছিল। কান্নায় ফুলে ফুলে ওঠা
শরীরটাকে নিজের দৃঢ় বন্ধনে নিতে নিতে রৌনক বলেছিল-" রাগ করছিস কেন? আমি এমনি বলেছি। ভুলে যা ঐ ঘটনা। "
রৌনকের
হাত খেলা করছিল শ্রেয়ার সারা শরীর জুড়ে।শ্রেয়ার মনে হচ্ছিল শত শত বিষাক্ত সাপ
কিলবিল করছে ওর গায়ে। ধাক্কা দিয়ে রৌনককে সরাতে গেছিল। কিন্তু রৌনক ওকে চেপে
বিছানায় নিয়ে গেছিল, হাউস কোটটা মেঝেতে ফেলে নিজের শরীর দিয়ে ওকে চেপে
ধরেছিল বিছানায়। যা ভালবেসে চাইলে শ্রেয়া এমনিই দিয়ে দিত হয়তো তা জোর করে ছিনিয়ে ,আদায় করে নিয়েছিল রৌনক। ওর ঠোঁটে চেপে বসেছিল রৌনকের ঠোঁট। প্রবল
নিষ্পেষণে ও ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ঐ রাতের জন্তুগুলোই আবার ফিরে এসেছে।
অনেকক্ষণ ওকে ভোগ করার পর রৌনক নিজের পোশাক পরতে পরতে বলেছিল -"এঁটো পাতায়
সারা জীবন খাওয়ার আগে পরখ করে নিলাম। তুই সত্যিই আগুন রে। "
কাউকে
বলতে পারেনি শ্রেয়া এই ধর্ষণের কথা। যাকে এত ভালবেসেছিল সে এমন করতে পারে কল্পনাও
করেনি ও। ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে ভেবেছিল ভালবেসে চাইলে যে ফুল মন প্রাণ দিয়ে রৌনককে
দেবে ভেবেছিল তা কেন ও অমন ভাবে ছিনিয়ে নিলো।
রৌনকের শেষ কথাটা ওর মনের গভীরে যে আঘাত করেছিল তা আর ভরেনি। এর পর
নিজের প্রতি ঘৃণায় নিজেকে শেষ করে ফেলতে গেছিল মেয়েটা।
ওর
বাবা মা ভেবেছিলেন সেই রাতের ঘটনায় ও এমন বদলে গেছে। ওকে এই আশ্রমে এনে ওটুকুই বলে
গেছিলেন ওনারা। এই আসল ঘটনা পরে জেঠু চিকিৎসা করতে গিয়ে জানতে পেরেছিলেন।
ওকে দেখতে রৌনক কখনো আসেনি। এই ঘটনার পর রৌনক নাকি চাকরি নিয়ে
কেরালা চলে গেছিল। শ্রেয়ার বাবা মা কে যখন জেঠু এসব জানিয়েছিলেন ওনারা বিশ্বাস
করতে পারেননি।
ওর মা বলেছিলেন -"এসব ভেবে
আর লাভ নেই। এখন ভালোয় ভালোয় ওদের বিয়েটা হলে...., মেয়েটা
আমার সুস্থ হোক আগে।"
এই
কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছিলাম এ সব ক্ষেত্রে পুলিশ কেস না করে সবাই মেয়েকে
লুকিয়ে রেখে সন্মান বাঁচাতে চায়। আর বিয়ে দিয়ে সব ঝেড়ে ফেলতে চায়। আর্যর ক্ষেত্রেও
কেউ পুলিশে যেতে চায়নি। আরো অনেককেই দেখেছি। ডাক্তার জেঠু মনের রোগ সারাতেই বেশি
মনোযোগ দিতেন। উনি বলতেন পুলিশ কেস এসব ক্ষেত্রে করা উচিত ঠিকই, কিন্তু
আইন ব্যবস্থার প্রহসনে দোষী বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ছাড়া পেয়ে যায়। আর যে ভুক্তভোগী
তাকে নিয়ে সবাই তামাসা দেখে। সেই অত্যাচারিতাকে বিচারের নামে সবার সামনে প্রতিনিয়ত
ধর্ষণ করা হয়। তাতে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তার চিকিৎসার ও অসুবিধা হয়। জেঠু বলতেন আমাদের মনটাকে
বোঝানো দরকার যে এসব একধরনের দুর্ঘটনা, যা যত তাড়াতাড়ি ভোলা যায় ততই
মঙ্গল। সমাজটাকে বদলানো দরকার। ধর্ষণ কয়েকজন অপরাধী করে, কিন্তু
সেই খবর পড়ে, জেনে, রগরগে আলোচনা করে
সমাজে বাস করা প্রচুর লোক মজা পায় । এ অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার মতো । এদের
কোনো সাজা হয় না।কিন্তু থানা পুলিশ করলে বছরের পর বছর এসব নিয়ে টানা টানি চলে,
আর তাতে এই ঘটনা ভুলতে পারে না কেউ। অসুস্থ কে সুস্থ করাই ডাক্তার
হিসাবে ওনার প্রথম কর্তব্য ছিল।
শ্রেয়া
আস্তে আস্তে সুস্থ হলেও বাড়ি ফিরতে চাইত না। ওর বাবা মাও খুব একটা আসতেন না।আমার
ঘরেই আমার সঙ্গেই থাকত শেষ ছয় মাস ধরে। ও আমায় খুব ভালোবাসত। ওকেও জেঠু ছোট
বাচ্চাদের দেখা শোনা , আঁকা আর গান শেখানোর কাজ দিয়েছিলেন।
ওর মা বাবাও ওকে নিতে কোনো আগ্ৰহ দেখাতেন না, কারণ
রৌনক আর ফেরেনি। ওদিকেই বিয়ে করে নিয়েছিল এক বছর পর। ওর মাও অবসর নিয়ে ওর কাছে চলে
গেছিল। এ অবস্থায় শ্রেয়া ফিরে বাড়িতে গেলেই আবার হয়তো ডিপ্রেশনেই চলে যাবে এটাই ওর
বাবা মা ভাবত। কারণ সমাজ ওকে নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই, ওকে মুল
স্রোতে ফিরে স্বাভাবিক হতে দেবে না এই সমাজের সুস্থ লোকেরাই। এভাবেই অনেকেই এখানে
থেকে যেত। কাজের মধ্যে ডুবে অতীতকে ভুলে থকত। আমিও বোধহয় তাই চাইতাম। তাই বাড়ি
যেতাম না। এই আশ্রমকে ভালবেসে এখানেই থেকে গেছিলাম।
******* পঞ্চম পর্ব
বিকেলে
আমি যখন নদীর ঘাটে বসে গোধূলির আলোয় সোনা গোলা জলে জোয়ারের আগমন দেখছিলাম আর্য এসে
আমার পাশে বসেছিল। চুপ করে দুজনেই গঙ্গার ওপারে সন্ধ্যা নামা দেখছিলাম। আমি আর্যকে
বললাম -" এবার বিয়ে করে নিজের সংসার শুরু করো ভাই। আর কতদিন একা থাকবে এভাবে?"
ও উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে বলেছিল -"আমার মত অনাথদের বিয়ে হয় না
দিদিভাই;"
-"তুমি নিজেকে অনাথ ভাবছ কেনো? অনেকের
অল্প বয়সে মা বাবা চলে যায়। তারা একটু তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠে। এভাবে ভেবো না।"
-"ভয় পাই। বিবাহিত জীবনে আর একজনের দায়িত্ব নিয়ে যদি তাকে সুখী না করতে পারি
...!! সত্যি বলতে মেয়ে দেখলেই ভয় পাই আমি। "
-" আমিও তো মেয়ে....."
-" তুমি তো দিদি, সরমাদি মা এর মতো, এখানে যারা আছে সবাই আমার আত্মার আত্মীয়, কিন্তু
বাইরের পৃথিবীর সুস্থ মেয়েগুলো অন্যরকম। "
শ্রেয়া
ডাকতে এসেছিল, উপাসনা ঘরে গান শুরু হবে। আমি এসময় রোজ যাই না
অবশ্য। আজ আর্যর সঙ্গে গেলাম।
শ্রেয়ার
গানের গলাটা ভারি মিষ্টি, ও মন প্রাণ দিয়ে গায়। ওর গান শুনতে শুনতে হারিয়ে
যাচ্ছিলাম। দেখলাম আর্য খুব মন দিয়ে শুনছে।
সেদিন
শেষ গান গেয়েছিল আর্য, " আকাশ ভরা, সূর্য তারা,
বিশ্ব ভরা প্রাণ ............."
রাতে
আমার ঘরের বারান্দায় আমি আর শ্রেয়া বসে আকাশের তারা দেখছিলাম। আমার মনের মাঝে
আর্যর গানের অনুরণন চলছিল, সুর আর কথা গুলো ফিরে ফিরে আসছিল । নিস্তব্ধতা
ভেঙ্গে শ্রেয়া বলে উঠেছিল -" ভারি চমৎকার গাইল গো ....... কি সুন্দর গলা "
আমার
কানে ভাসছিল -"ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে, ছড়িয়ে
আছে আনন্দেরই দান....."
হঠাৎ মনে হয় সমাধান খুঁজে পেয়েছি। কবি তাই বলে গেছিলেন -" জানার মাঝে অজানারে, করেছি সন্ধান...."
বিস্ময়
আমার মনেও জেগেছিল যে ঐ ঘটনার পর পৃথিবীর সব ছেলেদের ব্যাপারে নিঃস্পৃহ মেয়েটা
আর্যর গান শুনে সেটা নিয়েই ভেবে চলেছে!! ও আর্যর কথা ভাবছিল !!
এটা একটা খুব সুন্দর পরিবর্তন। ডাক্তার জেঠুকে জানাতেই হবে। আমি
এতদিন ধরে শ্রেয়াকে দেখেছি, এতো গভীর ভাবে ওকে কিছু ভাবতে
দেখিনি।
রাতে
শুয়ে শুয়ে শ্রেয়াকে আর্যর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলেছিলাম সেদিন। ও চুপ করে
শুনেছিল।
পরদিন
সকালেই ডাক্তার জেঠুকে গিয়ে আমার যা মনে হয়েছিল বলেছিলাম। বলেছিলাম আমার বদলে যদি
শ্রেয়াকে আর্যর সঙ্গে মেশার সুযোগ করে দেওয়া হয় হয়তো ওরা দুজন বন্ধু হয়ে উঠবে। ওরা
একে অন্যের পরিপূরক হতে পারে। সমব্যথী ওরা দুজন দুজনের দুঃখ বুঝবে। যদি ওদের
ভবিষ্যৎ এক তারে জুড়ে যায় ওরা দুজনেই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে আবার।
জেঠু
আমার চিন্তাধারায় খুশী হয়েছিলেন। তবে বলেছিলেন আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে ওদের
বন্ধুত্বের সূচনা করে দিতে হবে। আর যেমন শ্রেয়াকে আর্যর কথা বলেছি, আর্যকেও
শ্রেয়ার কথা জানিয়ে ওর মনোভাব বুঝে নিতে হবে। আর আমরা ইচ্ছা করে ওদের কাছাকাছি
আনতে চাইছি এটা যেন ওরা না বোঝে। আমাদের আলোচনার মাঝেই আর্য এসেছিল জেঠুর কাছে।
জেঠু ওকে দেখেই সেই সুন্দর ভুবন ভোলানো হাসি হেসে বলেছিলেন -" এসো ভাই,
তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। আমাদের একটু সাহায্য দরকার ।"
-"আমি তো সর্বদা সাহায্য করতে প্রস্তুত। কী করতে হবে আমায় ?" ও উৎসাহ নিয়ে বলেছিল।
-" কয়েকদিন পর কবিগুরুর জন্মদিন, প্রতিবারের মতো একটা
ছোট্ট অনুষ্ঠান করবো। এদিকে প্রিয়া একটু অন্য কাজে ব্যস্ত আছে। শ্রেয়া আর তুমি
মিলে যদি একটু ওদিকটা দেখে নাও, ভাল হয়। "
-" কী করতে হবে, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি চলো।" বলে আমি
ওকে টেনে আনলাম। বকুল গাছের নীচে বেদিতে বসে বললাম -" শ্রেয়াকে তো কাল দেখলে।
তোমরা একটু গানের দিকটা দেখে নাও। আর শুভম দা মেহুলী দি আবৃত্তি করবে কবিতা। আরো
দু একজন আছেন গান গাইবেন। "
-" আমি গান গেয়ে দেবো, কিন্তু অন্য কারো সঙ্গে ..."
ও
একটু ইতস্তত করছিল দেখে আমি বললাম, -" আসলে শ্রেয়ার জীবনেও
একটা দুঃখের অতীত রয়েছে। ওকে তার থেকে বের করে আনতেই তোমার সাহায্য চাইছি। "
আস্তে
আস্তে ওকে জানিয়েছিলাম শ্রেয়ার ঘটনা। ও সব শুনে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেছিল -"
মেয়েটার গানের মধ্যে ওর দুঃখের সুর বেজে ওঠে। ওর গান শুনলেই মন কেমন করে...।"
আমি
ভগবান কে স্মরণ করে শ্রেয়াকে ডেকে বললাম জেঠু্র কথা। ওদের দুজন কে আলোচনা করে কী
করলে এখানকার সবাই আনন্দ পাবে ভাবতে বলেছিল। জেঠুর কথা মনে রেখে বলেছিলাম
-"সব আবাসিকের মনে আনন্দ দিতে সেদিন শুধু আনন্দর গান, বিশ্বাস
আর ভালোবাসার গান গাইবে। সেদিন কোনো দুঃখের গান হবে না।"
জেঠুর
কথা মত ওদের একা ছেড়ে এগিয়ে গেছিলাম আমার পরের কাজে। ওদের গান ওদের কাছাকাছি আনবে
এই ছিল আমার বিশ্বাস, বাকিটা সময় আর ভগবানের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম।
একটা
বাচ্চা মেয়ে তিতির এসেছিল এক সপ্তাহ আগে। খুব মিষ্টি মেয়ে কিন্তু ভয়ানক অবসাদের
শিকার।ওর মা বাবা চাকরী করতো। ও ঠাকুমার হাতেই মানুষ। ঠাকুমা হঠাৎ মারা যাওয়ায় ও ডিপ্রেশনে চলে গেছিল। আমি ওর সঙ্গে রোজ কিছুটা সময় কাটাতাম। ভেবেছিলাম তিতির কে একটা নাচ শেখাবো। একটা বড় চকলেট নিয়ে তিতিরের
কাছে গেছিলাম সেদিন। ও দোলনায় বসে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ বলল -" ঠাম্মি ওখানে চলে গেছে। ঐ জায়গাটা নাকি খুব ভাল। কেউ বকে না, রাগারাগি
করে না ।"
-" তোমাকে কে বলেছে এ কথা? " আমি হেসে জিজ্ঞেস
করলাম।
-" ঠাম্মি বলেছে। আমিও চলে যাব ওখানে ।"
-" কিন্তু ছোটরা ওখানে যেতেই পারে না। আর তুমি চলে গেলে মা বাবা
কাঁদবে।"
-" ঠাম্মি নিয়ে যাবে বলেছে। মা বাবা অফিস যায়,ওদের সময়
কই? ওরা কাঁদবে না ।"
-" ঠাম্মি তো চলেই গেছে। আর তো আসবে না। তুমি যেতে চাইলে আগে বড় হতে
হবে।"
-" ধুর, তুমি কিছুই জানো না। ঠাম্মি তো রোজ আসে। কত
গল্প করে আমার সঙ্গে। খেলা করে।"তিতিরের কথায় আমি বুঝতে পারি ও ঠাম্মিকে
কল্পনা করে নেয় ওর পাশে। আমি দু দিন ওকে একা খেলতে আর কথা বলতে শুনেছিলাম। জেঠুকে
জানিয়েও ছিলাম। ওকে বললাম -" ঠাম্মি তো আর আসবে না বেশি দিন। অত দূর থেকে
আসতে খুব কষ্ট হয় ওনার। তুমি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও।"
-" হ্যাঁ, বাথরুমে পড়ে খুব ব্যথা পেয়েছিল ঠাম্মি। আমি
মা কে ফোন ও করেছিলাম, কতো রক্ত.... লাল হয়ে গেছিল বাথরুম।
ঠাম্মি কথাও বলছিল না আর। মা কত্ত দেরি করে এসেছিল তাও, " ওর দুচোখে জল।
শুনেছিলাম
ওর ঠাকুমা বাথরুমে পড়ে মারা গেছিলেন। বললাম -" তুমি একটা নাচ শিখবে আমার কাছে? "
-'' না, আমার কিছু ভাল লাগে না আর।কিচ্ছু না, কাউকে না " কেমন গুটিয়ে যায় ছোট্ট মেয়েটা। উঠে চলে যায় নিজের
ঘরে।আমার দু চোখ ভরে আসে। ওর ঘরে গিয়ে দেখি ও একা একাই কথা বলছে ঠাকুমার সঙ্গে।
চলে আসছিলাম আমি, হঠাৎ ওর কয়েকটা কথা
কানে লাগায় দাঁড়িয়ে গেলাম। ও বলছিল -" মা তো অফিসে যাওয়ার আগে শ্যাম্পো
ছড়িয়ে ফেলেছিল তোমার বাথরুমে। আমি বলেছিলাম কেন ফেলছ ওগুলো। মা আমায় বকেছিল। তুমি
তো ফুল তুলছিলে তখন। আমি তোমায় বলতেই ভুলে গেছিলাম যে বাথরুমের মেঝে তে শ্যাম্পো
ফেলেছে মা। তাই তো তুমি পড়ে গেলে। বাবাকেও বলেছি। ওরা কেউ আমার কথা শোনেনি। "
আমার
পা দুটো মাটিতে গেঁথে গেছিল। ঘটনাটা আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছিল। ওকে নিয়ে
জেঠুর কাছে গেছিলাম তক্ষুনি। ওকে বলেছিলাম কী হয়েছিল সব বলতে। কিন্তু ও হকচকিয়ে
গেছিল। আর কথা বলেনি। অনেক চেষ্টা করেও বলাতে পারিনি আর। আমিই খুলে বলেছিলাম সব
ডাক্তার জেঠুকে।
উনি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেছিলেন উনি "এমনি কিছু একটা ভেবেছিলাম।
তিতিরের অবচেতন মন বুঝতে পেরেছিল ঠাকুমার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। আর তাই ও মানতে
পারছিলো না এই ঘটনা। সাধারণ মৃত্যু হলে ও মেনে নিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ওর বাবা মা
কে যদি পুলিশে ধরে তাহলে সেই ঘটনা দাগ কেটে যাবে ওর মনের গভীরে। অন্যদিকে ও
ঠিকঠাক সাক্ষী না দিলে বাবা মা এর সাজা হবে না। আবার কোর্টে ওকে নিয়ে টানা টানি
হলে ওর মনের ভিতর কী হবে কে জানে। আর বাবা মা এর জেল হলে ও থাকবে কোনো হোমে। আসলে
সাজা দেওয়া হবে ওকে।
অন্যদিকে যখন ও বুঝতে শিখবে ও নিজেই নিজের বাবা মা কে জেলে
পাঠিয়েছে এটাও ওর মনে ক্ষতর সৃষ্টি করবে। এই অবস্থায় ওদের সাজা দেওয়ার চেয়ে ওকে
সুস্থ করাটা অনেক বেশি জরুরি। ও বড় হয়ে একদিন নিজেই বাবা মা কে প্রশ্ন করবে,
শাস্তি হয়তো ওনারা তখন পাবেন যখন একমাত্র সন্তান দূরে চলে যাবে।
"
কিন্তু
আমি এই যুক্তি মানতে পারছিলাম না। জেঠু শ্রেয়া বা আর্যর মত ঘটনায় পুলিশ কেস করতে
কখনো ওদের বাড়ির লোককে চাপ দেয়নি , তখন মেনে নিয়েছিলাম ওদের
চিকিৎসার স্বার্থে, কিন্তু এই ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ
খুন কী করে মেনে নেব !! আমি আর একবার জেঠুকে বোঝাতে চাইছিলাম যে ওর বাবা মা এর
শাস্তি হলে ও হয়তো কোনো আত্মীয়র কাছে মানুষ হবে। আর হোম মানেই খারাপ নয়। ভাল হোমে
কি বাচ্চারা মানুষ হয় না !!! ন্যায় আর অন্যায় বলে তো একটা কিছু আছে।
জেঠু
আমায় বলেছিলেন -" তোর বয়স কম। রক্ত গরম। তোর বয়সে আমিও ওভাবেই ভাবতাম। জীবনে
বহু ভুল করেছি। এই শেষ বয়সে এসে বুঝেছি সবার উপর মানুষ, শাস্তি
দিয়ে যদি মানুষকে বদলানো যেত এত অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটত না। অপরাধীরা আসলে মনের দিক
থেকে অসুস্থ। ওদের শাস্তির পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসা দরকার।"
আমি
তবুও ভাবছিলাম একটা খুন হয়েছে জেনে চুপ করে বসে থাকবো। মন সায় দিচ্ছিল না। পরদিন
তিতিরের মা বাবা এসেছিলেন। আমি দূর থেকে দেখছিলাম ওনাদের, ওর
মা কে দেখে মনেই হচ্ছিল না উনি ঠাণ্ডা মাথায় এই কাজ করেছেন। আমি তিতির কে নিয়ে ওর
মা বাবার কাছে যেতেই ও শক্ত হয়ে গেছিল। একটা হাত দিয়ে আমাকে ধরে রেখেছিল। ওনারা
ওকে ডাকতেই মুখ ঘুরিয়ে ছুটে পালিয়েছিল। ওর মা কান্নায় ভেঙ্গে পরেছিল। ওর বাবা
জানতে চেয়েছিল কতদিন লাগবে ওর সুস্থ স্বাভাবিক হতে। জেঠু ওর ফাইলটা উল্টে পাল্টে
দেখে বলেছিল -" একটু সময় দিতে হবে। আসলে যে ঘটনাগুলো ওর মনে দাগ কেটেছে সেসব
ভুলতে একটু সময় প্রয়োজন। এতো কচি মনে যে চাপ পরেছে তাড়াতাড়ি তা ঠিক করতে গেলে
বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। "
ওর মা সজল চোখে তাকিয়ে ছিল।জেঠু ওর মা এর দিকে ঘুরে বলেছিলেন
-" আপনি আপাতত কদিন আসবেন না। আসলে আপনাকে দেখলেই ওর সব মনে পড়ে যাচ্ছে।
ঠাকুমাকে খুব ভালবাসত ও। তাই আপনার বিরুদ্ধে ওর মন বিদ্রোহ করছে। আসলে বাথরুমের
ঘটনাটা ও বুঝতে পেরেছিল।"
আমার মনে হল ওর মা এর চোখ দুটো একবার জ্বলে উঠলো এ কথায়। তারপর ওর
মা বলল -"আপনার কি মনে হয় ও ভাল হবে। না হলে অন্য কোথাও দেখাতাম ।"
আমি
বুঝতে পেরেছিলাম যে ওর মা বুঝেছে যে জেঠু সব জেনে গেছেন। তাই মেয়েকে এখানে রাখতে
চাইছিল না আর। জেঠু কিন্তু মাথা ঠাণ্ডা রেখেই উত্তর দিচ্ছিলেন, বললেন
-" আপনারা নিয়ে গেলে আমি তো জোর করে আটকে রাখবো না। কিন্তু যেখানেই যাবেন
সবাই ওর থেকে আসল ঘটনা জেনে যাবে। পুলিশ কেস ও হতে পারে। আর ও যদি সুস্থ হয় এখানেই
হবে। না হলে কোথাও হবে না।"
ওর
বাবা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে
বলল-" তা ওর জন্য কত টাকা জমা দেব দেখে বলবেন একটু!! কতদিন থাকবে জানতে
পারলে......"
-"দেখুন, প্রথমদিন বলেছিলাম এটা আশ্রম।
টাকা ওভাবে আমরা নেই না। কোনো বড় টেস্ট করাতে হলে, যা আমাদের
সাধ্যের বাইরে, আমরা আপনাদের জানাবো। একটা ট্রাষ্টের মাধ্যমে
এখানকার খরচ চলে। আপনি চাইলে ট্রাষ্টকে কিছু ডোনেট করতে পারেন। সেটা দশ টাকাও হতে
পারে, বেশিও হতে পারে। পাশের অফিসে গিয়ে ফর্ম ফিল-আপ করে
টাকা জমা করতে পারেন। না করলেও তিতিরের চিকিৎসা হবে। পারলে ওর মা এর একটু চিকিৎসা করাবেন।
" কথাগুলো বলে জেঠু উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ওরাও উঠে পড়েছিল বাধ্য হয়ে। মহিলার
চোখের দৃষ্টি নিচের দিকে, ধীর পায়ে বেরিয়ে গেছিল দুজন।
আমিও
পিছন পিছন বেরিয়ে এলাম। ভাবছিলাম ভদ্রলোক ঠিক কতটা দোষী।উনি কি পুরোটা জানেন !!!
******* ষষ্ঠ পর্ব
তিতিরের
সঙ্গে একটু খেলে ওকে ঘুম পাড়িয়ে ফিরে আসছিলাম। একটা গানের মিষ্টি সুর ভেসে আসছিল
ওপাশ থেকে। দেখলাম বড় হলে শ্রেয়া আর আর্য গান প্রাকটিস করছে, ওরা
দু জনে গাইছিল -"সেদিন দুজনে, দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা দুলনায়" এতটাই তন্ময় হয়ে গাইছিল ওরা আমি আর ব্যাঘাত
ঘটাইনি। আসলে আমিও চাইছিলাম ওরা ফুলডোরে দোল খাক আর বাঁধা পড়ুক হৃদয়ের বন্ধনে।
আসলে
সেদিন আমার মনটা খুব খারাপ ছিল। আগেরদিন তিতিরের বাবা মা চলে যাওয়ার পর ওর খুব
জ্বর এসেছিল। ওর মনে যে দন্ধ চলছিল হয়তো তার জন্যই। ও জ্বরের ঘোরে ঠাকুমার সঙ্গেই
কথা বলত। আর চলে যেতে চাইত ওনার কাছে।
একদিন
দেখে আমরা ওর বাড়িতে খবর দিয়েছিলাম। ওর বাবা মা আবার পরদিন এসেছিল, মেয়ে
তখন জ্বরের ঘোরে অচেতন। মাঝে মাঝে ঠাকুমাকে খুঁজছে। ওরা জোর করে ওকে কলকাতায় নিয়ে
গেছিল। জেঠু বারণ করলেও শোনেনি। তখন জেঠুই নিজের এক বন্ধুকে রেফার করেছিলেন বড়
মাল্টি স্পেসালিটি হাসপাতালে।পরদিন খবর এসেছিল তিতির আর নেই। মাথায় রক্তক্ষরণ হয়ে
ও চিরতরে ঠাকুমার কোলে চলে গেছিল। ওর বাবা মা যোগ্য শাস্তি পেয়েছিল।
আমি
শুধু ভাবতাম সবাই শাস্তি পায় কি !! কত লোক অপরাধ করে খোলা ঘুরে বেড়ায় । এই যে
আর্যর কাকিমা বা শ্রেয়ার জীবন যারা নষ্ট করেছিল ....... রৌনক, কে
জানে হয়তো পায়, পায়না......
আমার
জীবনেও একটা নোংরা অতীত ছিল, বড় হয়ে সেটা জেনে আমিও এদের মতোই আত্মহত্যা
করতে চেষ্টা করেছিলাম। আসলে নিজের প্রতি নিজের একটা ঘৃণা তৈরি হয়েছিল, আর তার থেকেই অবসাদ।
আমি
মুর্শিদাবাদে বড় হয়েছিলাম। আমার দুই দাদা আর এক দিদি, সবার
ছোট আমি তেমন ভাবে বাবা মা দাদাদের আদর পাইনি। এক দিদি, সে ও
সারাক্ষণ আমাকে অবহেলা করতো। দিদি আমার চেয়ে ষোলো বছরের বড়, দাদারা
আরো বড় । বাবা মা এর শেষ বয়সের সন্তান হলেও ছোটর থেকেই সব বিষয়ে তুখর ছিলাম।
জয়েন্ট ফ্যামেলিতে অনেক ভাই বোনের মাঝে এক সঙ্গে বড় হয়ে উঠেছিলাম। আমি যখন আট বছর
তখন দিদির বিয়ে হয়ে গেছিল বারাসতে। দাদারাও সব চাকরি নিয়ে বাইরে চলে গেছিল।
আস্তে আস্তে মুর্শিদাবাদের বাড়ি ছেড়ে বাবা বহরমপুরে নিজের বাড়ি করে
চলে এসেছিল। আমাদের বাড়ি মা এর সব কাজে সাহায্যের জন্য একজন মহিলা ছিল, আমরা বিন্তি মাসী বলে ডাকতাম। সে ও আমাদের সঙ্গে চলে এসেছিল এই নতুন বাড়ি।
আমি কলেজে ভর্তি হলাম। দিদির বিয়ের দশ বছর পার হয়ে গেলেও দিদির কোনো বাচ্চা হচ্ছিল
না। এদিকে দিদি কিছুতেই জিজুর সঙ্গে ডাক্তার দেখাতে যেতে চাইত না। এই নিয়ে খুব
অশান্তি হত। ও বাড়ি এসে মায়ের সঙ্গে ডাক্তার দেখাতো মাঝেমধ্যে। ডাক্তার নাকি
বলেছিল ওর কোনো অসুবিধা নেই মা হওয়ায়। জিজুকে একবার পরীক্ষা করানো উচিত।
সে দিন দিদিকে নিয়ে জিজু এসেছিল হঠাৎ। মা বাবাকে জিজু অনেক কথা শুনিয়েছিল সেই প্রথম। বলেছিল দিদির জন্য কলকাতার নাম করা ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছিল। ডাক্তার কিছু টেস্ট করে দেখাতে বলেছিলেন, দিদি
নাকি কিছুতেই টেস্ট করাতে বা ডাক্তার দেখাতে রাজি নয়। অন্যদিকে দিদির বক্তব্য
জিজুর আগে ডাক্তার দেখানো উচিত। যেটা জিজুর অপমানে লেগেছিল। জিজু কয়েক ঘণ্টা থেকে
বিকেলের ট্রেনেই চলে গেছিল। বলে গেছিল দিদি ডাক্তার না দেখালে ফিরে যাওয়ার দরকার
নেই আর।
আমার নিজেরও অবাক লাগত দিদির এই ডাক্তার ভীতি দেখে। কী হয়ে যাবে
ডাক্তার দেখলে বুঝতাম না। আরো অবাক লাগত মা বাবাও দিদিকে জোর করত না এই ব্যাপারে।
সেদিন
সন্ধ্যায় পড়তে পড়তে জল খেতে নিচে গেছিলাম। এই নতুন বাড়িতে নিচে বসার ঘর, রান্না
ঘর, খাওয়ার ঘর, আর একটা বেডরুম।উপরে
তিনটে বেডরুম আর ঠাকুর ঘর। দিদি নিচের ঘরে ছিল।আমার আর বাবা মায়ের ঘর উপরে,
পাশাপাশি। দিদির ঘরে মা বিন্তি মাসী আর দিদির কান্না ভেজা গলা
পাচ্ছিলাম। জলের মেশিনটা দিদির দরজার পাশে দেয়ালে। জল ভরতে ভরতে আমার নামটা
কয়েকবার কানে আসায় কান খাঁড়া হয়ে উঠেছিল। আমার স্বভাব এমন নয়, তবুও দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম দিদির ঘরের সামনে। আর প্রথম মা এর গলাটাই কানে
এসেছিল ।
মা বলছিল -" তাহলে জামাই কে ডেকে বল যে প্রিয়া তোর বোন না,
তোর নিজের পেটের মেয়ে। এ কথা শোনার পর ও কি তোকে ফেরত নেবে?"
-"আমি যে বাঁজা নয়, ও যে অক্ষম সেটা তো
মানবে ও। ডাক্তার তো আমায় পরীক্ষা করেই ওকে বলবে যে আমি এর আগেই মা হয়েছি। টেস্ট
করালেই অনেক কিছু ধরা পরবে।" দিদির গলায় এক রাশ বিরক্তি।
আমার পা মাটিতে গেঁথে গেছিল। আমি নিজের কানে যা শুনেছিলাম তা কি
সত্যি ! তাহলে আমার বাবা কে ?
ওদিকে
মা বলে চলেছিল-" যে কথা আজ এতো বছর আমাদের তিনজন আর তোদের বাবা ছাড়া কেউ জানে
না, সেটা সবাই জেনে যাবে। এত বড় কলঙ্ক কী করে লুকাবো!! তুই অন্য কোনো ভাবে
জামাইকে ডাক্তার দেখা।"
হঠাৎ বিন্তি মাসী বলে উঠেছিল -" আচ্ছা, প্রিয়ার জনমের ছনে এমন কিছু হয় নাই তো যাতে ওর মা
হইবার ক্ষেমতা চইলা গেসেগা!! অরে একবার দেইক্ষা লও তোমরা। কম অত্যাচার তো হয় নাই
ছেমরির উপর, বাইচা ফিরসিলো তোমাগো ভাইগ্য ভাল
বইলা....."
আমি
ওখানেই বসে পড়েছিলাম। এসব কী শুনছিলাম আমি। আর কিছু শোনার আগেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম।
জ্ঞান
ফিরতেই দেখেছিলাম আমি দিদির ঘরে, বিন্তি মাসী চোখে মুখে জল দিচ্ছিল,
মা বাতাস করছিল, দিদি আমার পায়ের কাছে বসে ।
আমার মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। সব শিরা ফেটে যাবে মনে হচ্ছিল। উঠে বসতে যেতেই মা
শুইয়ে দিয়েছিল। ধুম জ্বর এসেছিল আমার। দু দিন চোখ খুলিনি। তৃতীয় দিন ভোর রাতে চোখ
খুলে দেখেছিলাম দিদি আমার কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। আবার চোখ বুজেছিলাম। প্রায় এক
সপ্তাহ পর জ্বর কমেছিল। দিদি আর বিন্তি মাসীকে বহুবার জিজ্ঞেস করে উত্তর পাইনি
কোনো!!
অবশেষে মা মুখ খুলেছিল, মায়ের বাপের বাড়ি ছিল
বাংলাদেশে, বরিশালের কলসকাঠিতে। ৯২ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই
ছিল বড় মামার মেয়ের বিয়ে, মা দিদিকে নিয়ে গেছিল সেই বিয়েতে।
৮ই ডিসেম্বর বিয়ের শেষে ফিরে আসবে। লেগেছিল তুমুল দাঙ্গা। হিন্দু মুসলিম রায়েটে
সবাই ভিটা ছাড়া। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে ভারতেও শুরু হয়েছিল দাঙ্গা। যোগাযোগ বন্ধ
হয়ে গেছিল। মা আর দিদি আটকে গেছিল গ্ৰামের বাড়িতে। গ্ৰামগুলো জ্বলছিল, ভাঙ্গা হচ্ছিল মন্দির, অত্যাচার হচ্ছিল মেয়েদের
উপর। দিদিকে নিয়েই সবার ভয়।কয়েকদিন পর মাঝ রাতে ছোটমামা একটা নৌকা ঠিক করেছিল মাদের
শহরে পৌঁছে দেবে বলে। সেখানে বড় মাসীর বাড়ি, সেইমত মায়েরা
রওনা দিয়েছিল। কিন্তু কিছুটা পথ পার হয়ে বড় নদীতে আসবার মুখে নৌকাটা ঘিরে ধরেছিল
কিছু দাঙ্গাবাজ। ছোটমামার বন্ধু সাকিল আনোয়ার মাদের নৌকা চালাচ্ছিল। আর মা দিদি
সবাই বোরখা পরে ছিল। কিন্তু ওরা সবাইকে উঠতে বলেছিল ওদের নৌকায়। শেরওয়ানী আর টুপি
পরা মামা বাংলা আর উর্দু মিশিয়ে কথা বললেও মা আর দিদির পায়ের আলতা দেখে ওদের
সন্দেহ হয়েছিল। জোড় করে মুখের কাপড় সরিয়ে মা এর মাথার বড় করে পরা সিঁদুরটাও চোখে
পড়েছিল ওদের। পনেরো বছরের দিদিকে তুলে নিয়েছিল ওরা। মামা বাঁধা দিতেই তলোয়ারের
আঘাতে লুটিয়ে পড়েছিল। সাকিল মামা মাকে বাঁচাতে গিয়ে মাথায় রডের আঘাতে জলে ছিটকে
পড়েছিল। মা চেষ্টা করেছিল দিদিকে বাঁচানোর, কিন্তু একা মা
পারেনি ওদের সঙ্গে। দিদিকে নিয়ে চলে গেছিল দলটা। মা জ্ঞান হারিয়েছিল।
জ্ঞান
ফিরেছিল হাসপাতালে, দিদির কোনো খবর ছিল না। কয়েক দিনের চেষ্টায় ঢাকায়
বড়মাসীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল মা এর। বড় মামার বন্ধুরা মিলে অনেক খুঁজেছিল কিন্তু
দিদিকে কোথাও পাওয়া যায়নি। দলে দলে হিন্দুরা ঘর ছেড়ে ভারতে চলে আসছিল সে সময়। রোজ
কোথাও না কোথাও খুন ধর্ষণ। মা দু মাস বড়মাসীর বাড়িতেই ছিল।বাবাকে মা কিছুই জানায়নি
সে সময়। ফোনের সুবিধা ছিল না। ট্রেলিগ্ৰাফ অফিস বন্ধ হয়ে গেছিল। দলে দলে লোক দেশ
ছেড়ে চলে যাচ্ছিল সে সময়।
তিন
মাস পর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে মা চোখের জল মুছে ফিরে আসবে ভেবেছিল। একদিন
সকালে এক অচেনা মহিলার হাত ধরে দিদি এসে উপস্থিত হয়।
মা
দিদিকে ফিরে পেয়ে জড়িয়ে ধরে শুধু কেঁদেছিল। কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। দিদিকে বলেছিল সব
ভুলে যেতে। পরে দিদি বলেছিল যে মহিলা দিদিকে নিয়ে এসেছিল সেই বিন্তি মাসীই দিদিকে
উদ্ধার করেছিল।শেষ দু মাস ওনার কাছেই ছিল দিদি । ঢাকায় বড় মাসী আর মেসো দু জনেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার, ওনাদের নাম দিদি বিন্তিমাসীকে বলেছিল। দাঙ্গা থামতে
উনি খোঁজ করতে করতে দিদিকে নিয়ে এসেছিলেন। ওনারও এক মেয়ে ঐ দাঙ্গায় বলী হয়েছিল।
নিজের মেয়েকে পাগলের মত খুঁজতে খুঁজতে সে খুঁজে পেয়েছিল বিধ্বস্ত অবস্থায় দিদিকে ।
এক অবস্থাপন্ন মুসলিমের বাড়ি বাচ্চা দেখার কাজ করতো বিন্তি মাসী।
তারা জানত মাসীর মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের বাড়ি বিন্তি-মাসী নিজের মেয়ের
পরিচয়ে দিদিকে কোনোরকমে সব দাঙ্গা বাজেদের চোখের আঁড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল।
মা
বিন্তি মাসীকে ছাড়েনি। নিজের সঙ্গে এদেশে নিজের বাড়ি নিয়ে এসেছিল। দাঙ্গার রেশ এ
পারেও পরেছিল। মুর্শিদাবাদ ছেড়ে সবাই এদিক ওদিক সরে গেছিল সে সময়। বাবা কলকাতায়
চলে এসেছিল দাদাদের নিয়ে। কাকারা সবাই এলাহাবাদ আর বেনারস চলে গেছিল পরিবার নিয়ে।
ঠাকুমা নিজের বাপের বাড়ি জামশেদপুরে চলে গেছিল। কলকাতায় এসে দিদি কেমন বদলে গেছিল।
সারাক্ষণ চুপচাপ থাকত। কারো সঙ্গে কথা বলতো না। একাই থাকতে চাইত।
কলকাতায়
আসার কিছুদিন পর মা হঠাৎ টের পেয়েছিল দিদির পরিবর্তনগুলো। দাঙ্গায় ওর উপর যে অত্যাচার হয়েছিল তার চিহ্ন রয়ে গেছিল ওর শরীরে। বেশ দেরি
হয়ে গেছিল ততদিনে। মা বাধ্য হয়ে বিন্তি মাসীর সঙ্গে পরামর্শ করে দিদিকে নিয়ে চলে
গেছিল উত্তরবঙ্গে মা এর মেজভাইয়ের বাড়ি। বাবাকে কিছু বলে গেছিল শুধু।
মেজো-মামা বিয়ে করেননি। একার সংসার। এক ছোট্ট পাহাড়ি গ্ৰামে থাকতেন।
গ্ৰামের লোকের সেবায় দিন কাটতো। ঋষি প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সেখানেই দিদি জন্ম দিয়েছিল
এক অবাঞ্ছিত কন্যার, এক অনাহূতর জন্ম। কেউ চায়নি সেই
মেয়েকে। সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নষ্ট করতে পারেনি ঐ ধর্ষণের ফসল কে। জন্ম দিয়েই শরীর
থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল দিদি। কিন্তু ঐ টুকু শিশুকে কেউ ফেলতে পারেনি প্রাণে ধরে।
জন্মদাত্রীর মা যে কিনা সম্পর্কে দিদিমা, বাচ্চাটিকে কোলে
নিয়ে বলেছিল সেদিন থেকে ঐ মেয়ে তার মেয়ের পরিচয় পাবে। সমাজ কোনো প্রশ্ন তুলতে
পারবে না। এভাবেই আমার জন্ম। সবাইকে জানানো হয়েছিল যে মা এর আবার মেয়ে হয়েছে।
কয়েকমাস পর দিদি একটু সুস্থ হলে মা মেয়ে কোলে বাড়ি ফিরেছিল। একমাত্র বাবাকে
জানিয়েছিল মা।
দিদির
আমার প্রতি কোনো টান ছিল না। বাবাও সেভাবে তাকিয়ে দেখেনি। অত বড় দাদারা ঐ টুকু বোন
হওয়ায় লজ্জিত ছিল। কোনোদিন পরিচয় দেয়নি কোথাও। একটা আগাছার মতো বড় হয়েছিলাম ঐ
সংসারে। কিন্তু নিজের জন্ম বৃত্তান্ত মেনে নিতে পারিনি ঐ বয়সে।
****** সপ্তম পর্ব
সব
শুনে নিজের প্রতি একটা ঘেন্না এসেছিল। মনে হতো কতগুলো নোংরা রক্ত আমার শরীরে বইছে।
কেউ ছিল না আমার। সবার কাছে আমি কলঙ্কের বোঝা। একদিন রাতে হাতের শিরা কেটে দেখতে
গেছিলাম আমার গায়ের রক্তের রঙ কী? কিন্তু বিন্তি মাসী দেখতে পেয়ে আটকে
দিয়েছিল। কয়েকদিন পর ইঁদুরের ওষুধ খেয়েছিলাম। এবার হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। তবে বাবার
পরিচিতি ছিল বলে পুলিশ আসেনি। পাশের বাড়ির ঋজুদা আমায় পছন্দ করত জানতাম। একটা
মিষ্টি সম্পর্ক গড়ে উঠতে চলেছিল। ওর সঙ্গে কথা বলতাম না আর। বহুবার এসেছিল। ফিরে
গেছিল বারবার। এর এক সপ্তাহের মাথায় দিদি ফিরে গেছিল জিজুর কাছে। আমি বাড়ি ফিরে
গভীর অবসাদে ডুবে গেছিলাম।
তৃতীয় বার ঘুমের ওষুধ গুলো সব একসঙ্গে খেয়ে ফেলেছিলাম। তারপর সব
কেমন ছবির মতো। কেউ এই মনের ঠিকানার কথা বলেছিল মা কে। মা (!)আর বাবা (!!)আমায়
এখানে দিয়ে গেছিল।
প্রথম প্রথম ভাবতাম গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে শান্তি পাবো। কিন্তু সাঁতারে আমি
দারুণ ছিলাম। মুর্শিদাবাদের গঙ্গা এপার ওপার করতাম, তাই ডুবে
মরবো না জানতাম। কথা বহুদিন বন্ধ করেছিলাম। এখানেও বিশেষ কথা বলতাম না আমি। চুপচাপ
থাকতাম। ডাক্তার জেঠু সরমা দি সারাক্ষণ ভাল ভাল কথা বলতেন আমায়। জেঠু কত গল্প
বলতেন। বোঝাতেন জন্মটা আসল নয়। কর্মটাই আসল। একমাত্র আমরা এখনো এসব নিয়ে পড়ে আছি।
ভাল কাজের কথা বলতেন।
সে সময় একটা বাচ্চা ছেলে ঋক এসেছিল এখানে, সাত বছর বয়স, কথা বলত না। অথচ চার বছর পর্যন্ত নাকি সব কথা বলতে পারত। তারপর কথা কম বলতে বলতে একদিন বন্ধই করে দিয়েছিল কথা বলা । ওর মা বাবা চাকরী করত। ওরা হায়দ্রাবাদ থেকে এসেছিল। আসলে বাঙ্গালী, চাকরি করে ওখানে।
ঋক কথা না বললেও ওর মা এর থেকে জেঠু অনেক কিছুই জেনে নিয়েছিলেন। ওকে গান শোনালে ও ভয়ে কানে হাত দিত। চকলেট নিত না। একা একা ঘরে বসে থাকতে ভাল বাসত। আমিও কথা বলতাম না। ও আমায় দেখতো আমি ওকে। একদিন আমি ঘাটে বসে ছিলাম। ও এসে আমার পাশে বসেছিল। হঠাৎ রিনরিনে গলায় আমায় বলেছিল -" তোমাকেও ঘরে বন্ধ করে রাখে কথা বললে?"
আমি বুঝতে পারিনি ও কী বলতে চাইছিল। ঘুরে তাকাতেই দেখি ও বলে চলেছে-" আমায় কথা বললেই মেরে ফেলবে বলেছে। তুমি কিন্তু বলে দিও না যে আমি তোমায় বলেছি।"
আমি বুঝতে পারছিলাম ও আমায় কিছু বলতে চায়। বললাম -"কাউকে বলবোনা। আমিও কথা বলি না ওদের সঙ্গে। ওরা সব।পচা।"
-" রেখা আন্টি পচা। শুধু অন্ধকারে বন্ধ করে রাখে। ভুতের গল্প বলে ভয় দেখায়। খেতেও দেয় না। নিজে সারাদিন গান শোনে। কার্টুন দেখতে দেয় না।"
মেহুলী
দিকে আসতে দেখে ও চুপ করে গেছিল।
এর পর মাঝে মাঝে ও আমার সঙ্গে কথা বলত। ওর আয়া ওকে এমন সব ভয় দেখাতো
যে ও কথা বলতো না ভয়ে। আসলে আয়াটা টিভি দেখতো। ওকে দেখতো না কখনো। ওকে বন্ধ করে
রাখত অন্ধকার ঘরে। আস্তে আস্তে ওর জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল। ওর বাবা মা ওকে নিয়ে
এসেছিল আমি আসার প্রায় তিনমাস পর। ওর মা ওকে নিয়ে এখানেই ছিল কয়েক মাস। ও সবার নজর
এড়িয়ে আমার কাছে চলে আসত। ওর মায়ের ওপর ওর অভিমান ছিল। মা কেন ওকে আয়ার কাছে রাখত ?
তাই!!
কয়েকদিন
পর ডাক্তার জেঠু আমায় ডেকে পাঠালেন। প্রথম থেকেই উনি বলেছিলেন ওনাকে জেঠু ডাকতে।
সবাই তাই ডাকত এখানে। আমি শুধু শুনেছিলাম। উনি খেয়াল করেছিলেন ঋক আর আমার সখ্যতা।
ঋকের ব্যপারে আমার সাহায্য চেয়েছিলেন। আমি চুপ করে শুনেছিলাম।
পরদিন
জেঠু আমাকে লিলুয়ার কাছে একটা হোমে নিয়ে গেছিলেন। আমায় বুঝিয়েছিলেন যদি ওরা জন্মের
পর আমায় ফেলে দিত আমার ঠিকানা হত এমন কোনো অনাথ আশ্রম। আমি আমার জন্ম বৃত্তান্ত
জানতাম না কখনো। কারো ভালবাসা পেতাম না। পরিবার পেতাম না।
আবার
এমন ও হতে পারত কেউ আমায় দত্তক নিয়ে পরিবারের ছত্রছায়ায় মানুষ করত। আমার
জন্মদাত্রীর সঙ্গে যা ঘটে ছিল তা বহু মেয়ের সঙ্গে সেই সময় হয়েছিল। তাই কাউকে দোষ
দিয়ে লাভ নেই। জেঠুর নিজের একমাত্র বোনের সঙ্গেও কোনো এক দাঙ্গায় এমন ঘটনা ঘটেছিল।
সে লড়াই করে নিজের ছেলেকে মানুষ করেছিল একাই। সেই ছেলে এখন বিদেশে ডাক্তার। আমায়
এসব বলে সব সময় উৎসাহ দিতেন ওনারা।
জেঠু বলতেন -"আমরা সবাই ঈশ্বরের সন্তান। কাজের মধ্যে ফুটে
উঠবে আমাদের পরিচয়। কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকবো আমরা।
বয়স্ক
লোকটার কথা ধীরে ধীরে ভাল লাগতে শুরু করেছিল। সরমা দি মায়ের মতো ভালবাসতেন। আগলে
রাখতেন আমায়। ধীরে ধীরে পড়া শুরু করেছিলাম। প্রাইভেটে পড়ার ব্যবস্থা জেঠুই করে
দিয়েছিলেন। জেঠুর কথা মত ঋকের ব্যাপারেও সাহায্য করতাম। আস্তে আস্তে ঋক স্বাভাবিক
হচ্ছিল। এভাবেই আবার আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলাম। বাড়ি আর ফিরিনি। পরের বছর
শুনেছিলাম দিদির মেয়ে হয়েছিল। জিজু নিজেই ডাক্তার দেখিয়েছিল। আমায় মনে এসব আর
রেখাপাত করেনি। জেঠুর কথা মত কাজ করতাম শুধু।
খুব
সুন্দর রবীন্দ্রসন্ধ্যা উপহার দিয়েছিল শ্রেয়া আর আর্য। ওদের গানে সবাই মুগ্ধ
হয়েছিল সেদিন। সখ্যতা গড়ে উঠেছিল ওদের। আর্য ফিরে গেছিল কিন্তু শ্রেয়ার সঙ্গে
নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল।
গাছে
যেমন পাতা ঝরে যায় আবার নতুন পাতা গজায় সেভাবেই আমাদের আবাসিকরা আসত, সুস্থ
হয়ে ফিরে যেত। প্রচুর বাচ্চারা আসত । সবাই যে থাকত তা নয়। কাউন্সিলিং করে ছেড়েও
দেওয়া হত অনেক কে। আবার কাউকে থেকে যেতে হতো। পড়ার চাপে , খেলার
সময় না পেয়ে, শারীরিক অত্যাচারে, হিংসায়,
বাবা মা এর অবহেলায় নানা কারণে ছোটরাও অবসাদের শিকার হতো। খারাপ
লাগত খুব ওদের জন্য। বয়স্করাও আসত। কত রকম লোক যে দেখেছিলাম এই কয় বছরে ..........
এভাবেই
একদিন এসেছিল রোহণ। কর্পোরেটে কাজের চাপ আর উচ্চতায় ওঠার লড়াইয়ে জিততে গিয়ে জীবনের
লড়াইটাই হেরে গেছিল ও। আই টি ইঞ্জিনিয়ার রোহণ চেন্নাইতে কাজ করত এক বিদেশী
কোম্পানিতে। ভালবেসে বিয়ে করেছিল হিয়া কে। ছোটবেলার ভালবাসা হিয়া ওকে সব সময়
সহযোগিতা করতো। বিয়ের পর চেন্নাইতে গিয়ে হিয়া খুব একা হয়ে গেছিল। রোহণ তখন কেরিয়ার
তৈরিতে ব্যস্ত। হিয়ার জন্য ওর সময় কোথায় !! হিয়া চেষ্টা করতো মানিয়ে নিতে। রোহণের
ছুটি খুব কম। কাজের প্রেশারে ছুটির দিন গুলো ল্যাপটপের স্কিনে চোখ রেখেই কেটে যেত।
হিয়ার দিকে তাকাতে পারতো না।
একা
থাকতে থাকতে হিয়া ভেবেছিল যদি ওদের মাঝে একটা ছোট্ট প্রাণ আসে হিয়ার ও সময় কাটবে, আর
সেই টানে রোহণ হয়তো সময় দেবে। কিন্তু রোহণ কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি ছিল না সে সময়।
অবশেষে প্রায় দু বছর এভাবে কাটার পর হিয়ার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল। কোনো এক অসতর্ক
মুহূর্তে হয়তো রোহণ না জেনেই ভুলটা করে ফেলেছিল। কিন্তু জানতে পেরে রোহণ বলেছিল ওর
আর একটু সময় চাই। সেই সময় সে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত ছিল না। প্রায় জোর করেই হিয়াকে
রাজি করিয়ে বাচ্চাটা এবরশন করিয়েছিল সে।
এরপর
হিয়া কেমন বদলে গেছিল। ভীষণ ডিপ্রেশনে চলে গেছিল ধীরেধীরে সে। রোহণকে ডাক্তার বলেছিল
ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে আসতে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা বেবি নিতে।
হিয়াকে ভীষণ ভালোবাসতো রোহণ। ওকে হারাবার ভয়ে কয়েকদিন ছুটি নিয়ে উটি
গেছিল ওরা। নীলগিরির সৌন্দর্যে মুগ্ধ রোহণ দেখেছিল হিয়া কেমন নির্লিপ্ত। কিছুই আর
হিয়াকে নাড়া দিত না। পাহাড়ে মেঘের খেলা, লেকের জলে বোটিং,
বনের মাঝে হারিয়ে যাওয়ায় আর আনন্দ পেত না হিয়া। সব সময় উদাস হয়ে কী
যেন ভাবত। ফিরে এসেও স্বাভাবিক হয়নি সে। এভাবেই কেটেছিল কয়েক মাস, রোহণ চেষ্টা করতো সময় দিতে কিন্তু হিয়ার সব অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে গেছিল।
রোহণ একদিন বাড়ি ফিরে দেখেছিল হিয়া আর নেই। ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল সে।
আরো বড় ধাক্কা খেয়েছিল রোহণ যখন জানতে পেরেছিল হিয়া ছিল অন্তঃসত্ত্বা।
সারা
রাত বাচ্চার কান্না শুনতে পেত রোহণ। চোখ বুঝলেই হিয়াকে দেখতে পেত তার দিকে স্থির
তাকিয়ে রয়েছে। কোনো কাজ আর করতে পারতো না সে। কলকাতায় বাবা মা এর কাছে ফিরে
এসেছিল। হিয়ার স্মৃতি পিছু ছাড়েনি। অবসরে ডাইরি লিখত হিয়া। সেই লেখায় পাতার পর
পাতায় ফুটিয়ে তুলেছিল নিজের একাকীত্বের যন্ত্রণা। শেষ পাতায় লিখেছিল আবার সে
প্রেগন্যান্ট জানলে রোহণ আবার হয়তো শেষ করে দেবে ছোট্ট প্রাণটাকে। তাই জেনে শুনেই
সেই ছোট্ট প্রাণের হাত ধরে সে পারি দিয়েছিল ঘুমের দেশে, যেখানে
রোহণ তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
এই
ডাইরি নিয়েই রোহণ এসেছিল মনের ঠিকানায়। সারাদিন ডাইরি আঁকড়েই সময় কাটতো ওর। খুব
শান্ত ছিল। একাই থাকতে ভালবাসত। অনেক চেষ্টা করেও ওকে কথা বলাতে পারতোনা কেউ।
হিয়ার একটা ফটো নিয়ে ও বসে থাকত।
জেঠুর
চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল অন্য রকম। কাউকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে বা কড়া নার্ভের ওষুধ দিয়ে এখানে চিকিৎসা হত না। ভালবাসা দিয়ে গান শুনিয়ে গল্পের মাধ্যমে সবাইকে ভাল করা হত। খুব কম ওষুধের প্রয়োগ দেখেছিলাম এখানে।
রোহণ
গান শুনতে ভালবাসত দেখেছিলাম। আর ভালবাসত বাচ্চাদের। দুটো বাচ্চা ছিল এখানে সে সময়, তাদের
খেলতে দেখলে খুব খুশি হত ও।
বাচ্চাদের
হাত ধরেই ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। টুকটাক কথা বলতো ও আমার সঙ্গে। তখনি ওর থেকে
হিয়ার সব গল্প শুনেছিলাম। বেঁচে থাকতে যে মেয়েটা ওকে পায়নি মরে গিয়ে ওর পুরো
সত্ত্বাকেই গ্ৰাস করেছিল। জেঠুর কথা মত আমিও ওর সঙ্গে হিয়াকে নিয়েই আলোচনা করতাম।
হিয়া যা যা ভালবাসত আমিও তাই করতাম। খুব আস্তে আস্তে ও আমায় বিশ্বাস করছিল।
***** শেষ (অষ্টম )পর্ব
জেঠু একদিন আমায় ডেকে বলেছিলেন -" যে
দায়িত্ব নিয়েছিস পুরো করতে পারবি তো ? মাঝ পথে সরে এলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না। অন্যদিকে তোর মনের উপর
প্রতিনিয়ত যে চাপ পড়ছে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে হবে। কারণ একদিন ও সুস্থ হয়ে
হয়তো তোকে ভুলে যাবে। অথবা তোকেই আঁকড়ে ধরতে চাইবে। সব রকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি
থাকতে হবে কিন্তু।"
-" আমার কাছে ওকে সুস্থ করা
একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমি পারবো।" দৃঢ় গলায় বলেছিলাম।
-" এ খুব কঠিন খেলা মা। ও তোকে
হিয়া ভাবতে শুরু করবে!! বিবাহিতা স্ত্রীর মতো আচরণ করবে!! তখন তুই পালাতে পারবি
না। ভেবে দেখিস কিন্তু। "
-" আমি সব জানি। আমি সব ভেবেই
এগিয়েছে। আমার এ জীবনের কোনো দাম নেই। যদি ও ভাল হয় জানব একজনকে জীবন দিতে পেরেছি।"
-" আর একটা কথা, তুই তো বুঝিস যে আজ হিয়ার মৃত্যুর জন্য পরোক্ষ ভাবে দায়ী রোহণের অবহেলা। ঐ
ডাইরি পুলিশের হাতে পড়লে ও আজ সরকারের ঘরে থাকত হয়তো। তুই তো অনেক ব্যপারে আমার
পুলিশকে না জানানো নিয়ে প্রশ্ন করতিস, আজ তোর কি মনে হয় ?"
মিটিমিটি হাসছিলেন উনি।
বলেছিলাম -" ও ওর অপরাধের শাস্তি
পেয়ে গেছে। তাই আজ ও এখানে সাজা কাটছে। যাকে ভালবেসে ও একদিন সেই ভালবাসা প্রকাশ
করতে পারেনি, সেই চলে গেছে
ওকে শাস্তি দিয়ে। আর আমার মনে হয় এর জন্য দায়ী সমাজ। পরিস্থিতির চাপে ও অমন বদলে
গেছিল। "
-" ঠিক বলেছিস। এটাই তোর মুখে
শুনতে চেয়েছিলাম। আসলে পরিস্থিতি আমাদের অনেক কিছু ভাবতে শেখায়। আজ তোকে আমার
জীবনের একটা গল্প বলি, .... আমিও ভালবেসেছিলাম একজন কে।
চাকরি করতে গিয়ে সে অফিসে শ্লীলতা হানীর শিকার হয়েছিল। ছেড়ে দিয়েছিল চাকরি। অবসাদে
নিজেকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল আমার মনামী। আমি তখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। সব শুনে ওকে
রুখে দাঁড়াতে বলেছিলাম। প্রতিবাদ করতে বলেছিলাম। বুঝিনি ও ভুলতে চাইছিল ঘটনাটা।
জোর করে ওকে নিয়ে থানায় গেছিলাম। ও শুধু আমার কথায় সব করছিল। বিচারের নামে দীর্ঘ
দিন প্রহসন চলেছিল। এ সবের কি প্রমাণ থাকে!! মেয়েটার মুখের কথার কোনো দাম নেই
সেদিন বুঝেছিলাম। অন্যদিকে সবাই জেনে গেছিল এই ঘটনা, ও
কোথাও চাকরি পাচ্ছিল না। রাস্তায় সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করত।সমাজের একটা লোক ও ওর
পাশে দাঁড়ায়নি। ও হয়ে গেছিল একটা রগরগে আলোচনার বিষয়। অবশেষে ও নিজের জীবন দিয়ে
দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল। নিজের গায়ে আগুন দিয়ে মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে
ওদের নাম উল্লেখ করে গেছিল আমার মনামী। আমি সেদিন বুঝেছিলাম এ পোড়া দেশে পুলিশ আর
আইন কত ঠুনকো। নিজেকে ওর মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে হতো। আমি যদি ওকে টেনে বার না
করতাম ও হয়তো ধীর ধীরে ভুলে যেতো সব। হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতো। কিন্তু
আমার গরম রক্ত সেদিন ওকে ন্যায় বিচারের বদলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আমিও
খুনি। খুন করেছি আমার ভালবাসাকে। "
জীবনে প্রথমবার ঐ শক্ত বয়স্ক মানুষটার
চোখে আমি জল দেখেছিলাম। একটা অসহায়তা ফুটে উঠেছিল ওনার চেহারায়।
জেঠু আমায় আশীর্বাদ করেছিলেন সেদিন। এর পর
দ্বিগুণ উৎসাহে আমি রোহণের দিকে মন দিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেছিল। ও আমায় ডাকত পিয়া বলে।
সেদিন আর্য এসেছিল। শ্রেয়াকে বিয়ে করতে
চায় আগেই বলেছিল জেঠুকে। শ্রেয়ার বাবা মা কে জানান হয়েছিল। ওনারা অভিভূত। মেয়েকে
সন্মান জানিয়ে এত ভাল একটা ছেলে বিয়ে করছে এটা একটা বিশাল ব্যপার ছিল ওনাদের
কাছে। ফাল্গুনের এক গোধূলি লগ্নে ওদের চার হাত এক হয়ে গেছিল। ওরা দুজন ছিল দুজনের
পরিপূরক।
ধুমধাম করে ওদের বিয়েটা হয়েছিল। আর্য ছোট
একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান করেছিল আসানসোলে। আমরা সবাই খুব আনন্দ করেছিলাম সেই
অনুষ্ঠানে। বাড়তি পাওনা ছিল শ্রেয়া আর আর্যর গান। ওদের গানের রেশ মনের মাঝে নিয়ে
ফিরে এসেছিলাম রাতে।
সেদিন ফেরার পথে জেঠু বলেছিলেন উনি সার্থক, সার্থক ওনার চিকিৎসা। ওদের বিয়েতে সবাই খুব খুশি হয়েছিল।
রোহণ ধীরেধীরে অনেক স্বাভাবিক হয়েছিল, ওর মা বাবা এসেছিলেন ওকে দেখতে। বাড়ি
নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেঠু বলেছিল আরেকটু সময় লাগবে।
আমি একটা বিশাল দন্ধে ভুগছিলাম। একদিকে
আমার কাজের সাফল্য অন্যদিকে আমার মন, যে ভালবেসে ফেলেছিল রোহণ কে। মাঝে মাঝে আমি সত্যি হিয়া হয়ে যেতাম। রোহণের
স্পর্শে কেঁপে উঠতাম । ওর দৃঢ় আলিঙ্গনে নিষ্পেষিত হতে হতে নিজেকে ওর হাতেই ছেড়ে
দিতাম। ওর আদর সারা শরীরে মেখে হিয়ার মতো করে ওকে ভালবাসতে চেষ্টা করতাম।
ওর চোখে হারিয়ে যেতো আমার নিজস্ব সত্ত্বা।
এদিকে জানতাম ও একদিন ফিরে যাবে। আমি শুধু ওর স্মৃতি তেই বেঁচে থাকবো। মন ব্যকুল
হয়ে উঠতো, মন বলতো যদি অন্য
রকম কিছু হয়। জেঠু আমায় সব রকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে বলেছিলেন।
আমার গান শুনতে ভালবাসত রোহণ। হিয়ার প্রিয়
গানগুলোই আমি বারবার গাইতাম। ওর ডাইরি পড়েই জেনেছিলাম ওর সব গোপন কথা। ওর প্রিয়
গানের সঙ্গে আমার প্রিয় গানের এক অদ্ভুত মিল ছিল। তাই বোধহয় ওর সত্তার সঙ্গে মিশে
গেছিলাম বড্ড তাড়াতাড়ি। আমি জানতাম ও চলে যাবে। তাই অবুঝ মনকে বোঝাতাম আমি যা করছি
ওকে সুস্থ করার জন্য করছি। নিজেকে উৎসর্গ করেছিলাম ওর কাছে।
অবশেষে এলো সেই বিশেষ দিন। ওর বাবা মা ওকে
নিতে এসেছিল কিন্তু আমি সামনে যেতে পারিনি । দূর থেকে সব দেখছিলাম। ও গেল জেঠুর
ঘরে। কী কথা হয় শোনার জন্য আমিও পায়ে পায়ে পাশের ঘরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম ।
জেঠু ওকে দেখে বললেন -" এসো, আজ খুব আনন্দের দিন। তুমি আজ মা বাবার সঙ্গে
বাড়ি ফিরে যাবে। আবার এক সুন্দর জীবনে প্রবেশ করবে। ......"
-" আর হিয়া, ওকে তো সঙ্গে নিয়ে ফিরবো তো !! একা তো যাব না।" ওর এই উত্তরে ওর মা
বাবা তাকিয়েছিল জেঠুর দিকে। আমিও অবাক হয়েছিলাম, ও কি তাহলে
...
জেঠু এতদিনের অভিজ্ঞতায় অনেক কিছুই
বুঝেছিলেন, ওকে বলেছিলেন
-" তাই তো। যাও ওকে ডেকে আনো। একসঙ্গেই যাও তোমরা দু জন।"
-" না, দুজন
নয় তিন জন। আমি পিয়া আর হিয়া।"
ওর বাবা মা ভেবেই নিয়েছিল ছেলে সুস্থ হয়নি।
জেঠু এবার একটু অবাক হয়েছিলেন। বললেন
-" তিনজন !! আচ্ছা ডাকো ওদের........"
রোহণ পাশের ঘরে আমার উপস্থিতি বোধহয় টের
পেয়েছিল। আমায় টেনে নিয়ে গেছিল ঐ ঘরে, ওর বাবা মা এর কাছে। বলেছিল -" এ হল পিয়া। আজ ওর জন্য আমি সুস্থ। ওর
ত্যাগ আর সেবা আমায় বুঝতে শিখিয়েছে যে জীবনে ভালবাসার মূল্য কী। শুধু অর্থ উপার্জন
করেই বড় হওয়া যায় না। প্রয়োজন কারো ভালবাসার, আর সেই ভালবাসা
আমি হেলায় হারিয়ে ছিলাম। পিয়া আমার মধ্যে আবার সেই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল ,
ফিরিয়ে এনেছিল বেঁচে থাকার ইচ্ছা। আজ ওর হাত ধরেই আমি বাড়ি ফিরতে
চাই। ..."
-"আর হিয়া....." এ বার ওর
মা বলে ওঠে।
-" আছে। হিয়া আছে আমাদের সঙ্গেই।
" আমার দিকে তাকিয়ে রোহণ বলতে থাকে। ওর চোখে ফুটে ওঠে এক গভীর আত্মবিশ্বাস। ও
বলে -" আমার পিয়ার মধ্যেই হিয়া আছে। আর কয়েক মাস পর একটা ছোট্ট শিশুর রূপে সে
আসবে সকলের সামনে। আমার হিয়া ফিরে আসবে আমাদের সন্তানের মধ্যে দিয়ে।''
আমি বুঝে পাই না ও কি করে জানল এ কথা।
পরিবর্তনগুলো শুধু আমার চোখে ধরা পরেছিল। আমি কাউকে সাহস করে বলিনি। জেঠু বা
সরমাদিকে ও বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম ও চলে গেলে পরে বলব। আমি ওর ভালবাসার চিহ্নকে
একাই আগলে বড় করবো ভেবেছিলাম। এই শিশুটি হবে আমার বেঁচে থাকার উপলক্ষ। ওর করুণা
চাইনি। কিন্তু ও যে আজ আমায় অন্যভাবে গ্ৰহন করতে চলেছে। আমার অতীত না জেনেই ও আমায়
নিজের সঙ্গে ভালবাসার বন্ধনে বাঁধতে চলেছে।
আমি কিছু বলতে যেতেই ও বলেছিল -"
তোমায় ভালবেসে সারা জীবনের জন্য পাশে চাইছি। ফিরিয়ে দিও না আজ। কথা দিয়েছিলে পাশে
থাকবে চিরজীবন।আর কিছুই চাই না আমি।"
-"ওকে ফিরিয়ে দিস না মা। ও
অন্তর দিয়ে তোকে গ্ৰহন করেছে। ওর সঙ্গেই তুই বাঁধা পড়েছিস।" জেঠু বলেছিল।
আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। জেঠুর
দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম -" কিন্তু আমি তো এখানে সেবার মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দেব
ভেবেছিলাম। আর আমার অতীত ... আমার পরিচয়..." আর বলতে পরিনি। কান্নায় গলা বুজে
গেছিল।
-" আমি শুধু তোমাকে একটা নতুন
পরিচয় দিতে চাই। পরিচয় দিতে চাই আমাদের সন্তানের পিতা হয়ে। অতীত নয় ভবিষ্যতের
দিকে তাকাও পিয়া, একথা তুমিই বলতে সব সময়। অতীত যা দেয়নি
হয়তো ভবিষ্যতে পাবে। " বলেছিল রোহন।
ওর মা আমার হাত দুটো ধরে বলেছিল -"
তোমার ঋণ আমি কী করে শোধ করবো, তুমি আজ ওকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিলে মা। তুমি চলো আমার ঘরের লক্ষ্মী হয়ে
।"
জেঠু সবাইকে খবর দিয়ে ডেকে এনেছিলেন। এতো
কম সময়ে বাবা মা আসতে পারেনি। ফোনেই আশীর্বাদ করেছিল। ছোট্ট করে এক ঘরোয়া
অনুষ্ঠানে সিঁদুর পরিয়ে ও আমায় গ্ৰহন করেছিল। চলে যাওয়ার আগে ও বলল একটা ছোট্ট কাজ
বাকি আছে। আমায় নিয়ে ও নেমে গেছিল গঙ্গায়। হিয়ার ডাইরিটা ও ভাসিয়ে দিয়েছিল জলে।
জলের টানে ভেসে গেছিল হিয়ার সব অভিমান। আমার মনে হয়েছিল হিয়া বলছে, -"খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি
আমি।"
=================সমাপ্ত===================
Khub valo didi
উত্তরমুছুন