তিনদিনের জন্য তানিয়া বাপের বাড়ি গেছে। অমিত আজ সম্পূর্ণ স্বাধীন। অফিস থেকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বাড়ি এসেছে তাই।
রেহান শুনেই বলছিল-'' ভাগ্যবানদের বৌ বাপের বাড়ি যায় বস। এনজয়। ''
বৌয়ের রান্না করে যাওয়া ফ্রাইডরাইস চিলি চিকেন দিয়ে ডিনার সেরে একটা লার্জ পেগ হুইস্কি নিয়ে টিভিতে ফ্যাশন চ্যানেলগুলো দেখতে বসে অমিত। একটু পরেই চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। বেডরুমে ঢুকেই দেখে বিছানায় সেই চাদরটা পাতা। প্রথমবার চাদরটা দেখে কেমন একটা অস্বস্তি হয়েছিল অমিতের। সাপ লুডো। চাদরের প্রিন্টটা ওর বৌ তানিয়া খুব পছন্দ করে কিনলেও ওর ভালো লাগেনি। সাপ জিনিসটা বড্ড গা ঘিনঘিনে। ছোটবেলা দুটো সাপকে পিটিয়ে মেরেছিল অমিত।শীতল রক্তের প্রাণীদের ও ঘৃণা করে বরাবর। কিন্তু এত রাতে কে চাদর বদলাবে? মাথাটা গরম হয়ে যায়।অমিত জানেও না কোথায় থাকে চাদর। টলমল পায়ে ঐ একশো ঘরের সাপ লুডো চাদরেই ধপাস করে শুয়ে পড়ে অমিত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের গভীরে ডুবে যায় ।
মাঝ রাতে একটা শীতল স্পর্শে ঘুমটা ভেঙে যায়। সারা গায়ে একটা ঠাণ্ডা সরীসৃপের স্পর্শ, গা ঘিনঘিনে একটা অনুভূতি!! বিছানার মধ্যে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে যেন কয়েকটা সাপ। হঠাৎ অমিতের মনে পড়ে সে সাপ লুডো চাদরে শুয়ে আছে, আর সাপগুলো জীবন্ত হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছে যেন। ভয়ে একটা শীতল অনুভূতি শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকে, খালি গায়ে বুকের উপর শীতল স্যাঁতস্যাঁতে একটা শীতল একটা অমেরুদণ্ডী প্রাণী উঠে আসছে ধীরে ধীরে। পাশে মোবাইলের জন্য হাত বাড়াতেই হাতে ঠেকে সরু শীতল আরেকটা কিছুর লেজ। হিসহিস শব্দে ভয়ে চোখ বোঝে অমিত। যে কোনো মুহূর্তে একটা বিষাক্ত ছোবলের অপেক্ষায় সময় গোনে।
কতক্ষণ এভাবে দম বন্ধ করে ছিল ও নিজেই জানে না। একেকটা মূহুর্ত যেন একেকটা বছর। হঠাৎ ফোনের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। রঙ নম্বর। তবু ফোনটাকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে বসে অমিত। ঘামে ভিজে উঠেছে সারা শরীর। ঘিনঘিনে অনুভূতিটা এখনো রয়েছে।ভয়ানক দুঃস্বপ্ন। লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে যায় ও। ফ্রিজ থেকে একটু ঠাণ্ডা জল বার করে খায়, ঘড়িতে সাড়ে তিনটে। বিছানার দিকে দু পা এগিয়েই চমকে ওঠে অমিত। চাদরটা একই আছে, কিন্তু সাপগুলো আর নেই। সিঁড়িগুলো রয়েছে। কিন্তু এতগুলো সাপ কোথায় গেলো। বিছানার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে অমিত। কি হচ্ছে এসব। চাদরে ছাপা সাপগুলো কোথায় যেতে পারে ?
মাথা কাজ করে না। কেমন টলে ওঠে শরীরটা, শুয়ে পড়ে আবার।
সরসর শব্দ, একি চোখ খুলে দেখে সিঁড়ির মাথায় বিপজ্জনকভাবে ঝুলছে সে, একটার পর একটা সিঁড়ি লাগিয়ে অনেক অনেক ওপরে উঠে এসেছে সে। নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাঁশের সিঁড়িগুলো দিয়ে শুধুই ওপরে ওঠা যায়, নামা যায় না নিচে।
ভয়ে আতঙ্কে চোখ বুঝে ফেলে অমিত। উচ্চতা জনিত সমস্যা রয়েছে ওর।
হঠাৎ একটা খিলখিলিয়ে হাসির শব্দে চোখ খোলে আবার, শঙ্খমালা হাসছে। নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলছে -''উঠে আসুন সার। পড়ে যাবেন নাহলে। '' নিচের সিঁড়িগুলো ভীষণ নড়ছে। শঙ্খর হাতটা ধরে সরু একটা প্লাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে অমিত। কিন্তু শঙ্খ এখানে কি করে এলো ? ওকে তো ..... দার্জিলিং যাওয়ার পথে শঙ্খকে খাদের ধারে.... ছোট্ট একটা ধাক্কা....
খুব ভালো মেয়ে ছিল শঙ্খ। এতো গুছিয়ে কাজ করত, অমিতের প্রথম দুটো প্রমোশন ওর জন্যই। আস্তে আস্তে মেয়েটা জড়িয়ে গেছিল ওর সাথে। কিন্তু অমিতের নজর যে ছিল অন্যখানে। বিয়ের জন্য জেদ করছিল শঙ্খ। বাধ্য হয়েই ওকে নিয়ে অফিসের কাজে দার্জিলিং যাওয়ার পথে..... ড্রাইভার সাক্ষী দিয়েছিল ফটো তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা। অফিসে অমিতের তখন ভীষণ সুনাম। বেরিয়ে এসেছিল ক্লিন চিট পেয়ে।
ভয়ে সাদা হয়ে যায় অমিতের মুখ। ভাল করে তাকায় চারপাশে, ছেড়াছেড়া কুয়াশা ঘেরা এ পার্বত্য পথ যে ওর চেনা।
-''বাঁচাও '' বলে চিৎকার করতেই একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে চম্পা, -''আইয়ে সাব, মেরে সাথ আইয়ে। ''
এখন অত ভাবার সময় নেই, চম্পার হাত ধরে উপরে উঠে আসে অমিত। কি ঠাণ্ডা চম্পার হাত, বরফের মত শীতল।
-''কিউ সাব, আপনে তো বরফ ডাল দিয়া থা মেরে উপর। ''
হঠাৎ
মনে পড়ে অমিতের, চম্পাকে তো ইউমথাং এ বরফের মাঝে ধাক্কা দিয়ে ... গর্তটার উপর তাল তাল বরফ ফেলে বুজিয়ে দিয়েছিল ও একাই।
চম্পা মেয়েটা ছিল ভীষণ সরল। সিকিমেই পরিচয়। তখন একটা বড় প্রোজেক্টের কাজে মাস খানেক ছিল অমিত সিকিমে। কিন্তু ওকে তো আর বিয়ে করে শহরে নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে ইয়ুমথাংয়ে সলিল সমাধি। কেউ জানতেও পারেনি চম্পা এপিসোড।
নিজের হৃৎপিণ্ডের লাব ডুব শব্দ শুনতে পাচ্ছে অমিত। ফেরার পথ নেই।একদিকে মৃত্যু গহ্বর, অন্য দিকে কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়।
আমার হাতটা ধরো দেখি। শাখা পলা পরা হাতটার সাথে রিনরিনে গলার আওয়াজ। জিনিয়া। অমিত তাড়াতাড়ি জিনিয়াকে অবলম্বন করে উঠে আসে। পায়ে ঠেকে শীতল জল, বালিয়াড়ি। কোম্পানির সিইওর বড় মেয়ে জিনিয়া, বিয়ের পর সেই ঋষিকোণ্ডার বিচে। জিনিয়াকে আকণ্ঠ মদ খাইয়ে রাতের সমুদ্রে ঠেলে ফেলতে হাত কাঁপেনি অমিতের। লক্ষ্য তো ছিল তানিয়া। মোটা সোটা জিনিয়া তো ছিল তানিয়ার কাছে পৌঁছানোর সিঁড়ি।
দিদির দুঃখে জিজু যখন যায় যায় শালিই তো সামলেছিল তাকে।
হঠাৎ ঝনঝন করে বেজে ওঠে ফোনটা। তানিয়ার ফোন।ভোরে পাম্প না চালালে জল থাকবে না মনে করালো।
চমকে বিছানায় উঠে বসে অমিত। উফ এসব কি দেখছিল এতক্ষণ। এতগুলো দুঃস্বপ্ন একসাথে। কিন্তু এতদিন পর এভাবে!! ভালো করে চাদরটার দিকে তাকায়। সাপ লুডো। একটা নিরীহ সুতির চাদর। তানিয়া শখ করে কিনেছিল কদিন আগেই। তানিয়ে খুব সংসারী মেয়ে। গুছিয়ে সংসার করতে ভালোবাসে।বাপের বাড়ি যায় না পারত পক্ষে। গিয়েও শান্তি নেই। এই ভোর বেলা ফোন করে মনে করালো পাম্প চালাতে হবে। ফ্রিজে তিনদিনের রান্না করে ভাগে ভাগে রেগেছে। ফ্রিজের গায়ে লিস্ট ঝুলিয়েছে কখন কোনটা বার করে খাবে অমিত। কতক্ষণ গরম করবে সব লিখে গেছে। সব দিকে ওর নজর। তাই তো অমিত বিরক্ত হয়। এত দিকে নজর দেওয়ার কি দরকার?
এই যে ভোর বেলায় ফোনটা করল..… কিন্তু তা কি করে সম্ভব!! তানিয়া কি করে ফোন করবে? তানিয়াকে তো কাল সকালেই মেরে ঐ ছাদের বাড়তি ট্যাঙ্কটায় ভরে এসেছিল অমিত। বড্ড প্রশ্ন করছিল ইদানীং। জিনিয়ার ব্যাপারে খোঁজ করতে করতে একে একে অনেক কিছু জেনে ফেলেছিল। অফিস থেকে কি করে যেন শঙ্খমালার নামটাও জেনেছিল। চম্পার খোঁজটা অবশ্য পায়নি।
একটা সিগারেট ধরায় অমিত। আপাতত মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। কাল রাতে অতটা হুইস্কি খাওয়া ঠিক হয়নি। নেশা হয়ে গেছিল। অফিসের সবাই জানে ওর বৌ বাপের বাড়ি। কাল তানিয়া নিজেই কাজের মেয়ে মুনিকেও বলেছে দুপুরে বাপের বাড়ি যাবে। ওকে তিনদিন সকাল সকাল অমিত থাকা কালীন এসে কাজ করতে বলেছে। কাজের মেয়ে মুন্নিকে বেশ লাগে অমিতের।কদিন আগেই কাজে ঢুকেছে, বেশ গরম আছে, ঝুঁকে যখন ঘর মোছে... অবশ্য তানিয়া ওর পেছন পেছন থাকে। অমিত কখনো সুযোগ পায়নি মুন্নির কাছে ঘেঁষার। কিন্তু মুন্নি আসছে না কেন। সাড়ে সাতটা হয়ে গেলো তো। ছাদটা একবার দেখে আসলে হয়। আজ অমিত অফিসের কাজ নিয়ে জামশেদপুর চলে যাবে চারদিনের জন্য আগেই ঠিক করা আছে।তানিয়ার ফোনে কাল রাতে মেসেজ ও করে রেখেছে তাই। ফোনটা অবশ্য অফিস যাওয়ার সময় ভ্যাটে ছুড়ে দিয়েছিল। এতক্ষণে সিম সহ গুড়া হয়ে গেছে নিশ্চই।
পিং করে মেসেজ ঢোকে-''মুন্নি আজ আসবে না। খেয়ে এঁটো বাসন সিঙ্কে নামিয়ে দিও। '' তানিয়ার মেসেজ!
কিন্তু ফোনটা তো কাল ভ্যাটে....
মাথাটা টিপে বসে পড়ে সোফায় অমিত। আর ভাবতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব।
তানিয়ার নম্বরে ফোন করে, নট রিচেবল। তাই তো স্বাভাবিক? তবে মেসেজ কে করছে?
সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। বাথরুমে স্নান করতে ঢোকে, শাওয়ারের নিচে চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায়। কিন্তু জলটা এমন চ্যাটচ্যাটে কেন? চোখ খুলেই চমকে ওঠে, রুধির ধারা নামছে শাওয়ার দিয়ে। কিন্তু বডিটা তো পাশের ট্যাঙ্কে ফেলেছিল ও। মাথায় বারি মারায় এমন রক্তের ধারা নেমেছিল কপাল দিয়ে।
আবার পরিষ্কার জল আসছে। কোনো রকমে স্নান করে বেরিয়ে আসে অমিত।
পাখির ডাকে কলিং বেলটা বেজে ওঠে।মুন্নি এলো বোধহয়। ভেজা গায়ে টাওয়েল জড়িয়ে দরজা খুলেই চমকে ওঠে অমিত। কলকাতা পুলিশ !!
-''ভেতরে আসতে পারি মিঃ জানা। আমি ইন্সপেক্টর সাঁপুই, ক্রাইম ব্রাঞ্চ। '' পেছনে দুটো কনস্টেবল।
-''কি দরকার বলুন ?''
মুহূর্তে নিজেকে সামলে নেয় অমিত।
-''আপনার স্ত্রী....''
-''বাপের বাড়ি গেছে গতকাল। কেন ?''
-''স্মার্ট... আপনার স্ত্রী জিনিয়া দেবীর ব্যাপারে কথা বলতাম একটু। ''
বাধ্য হয়ে অমিত দরজা ছেড়ে দাঁড়ায়।অফিসার কে বসিয়ে দু মিনিটে পোশাক পরে আসে।
-''আপনার স্ত্রী তো বেশ গুছিয়ে কাজ করে। কি সুন্দর করে ফ্রিজের গায়ে কাগজে ইন্সট্রাকশন দিয়ে গেছে। ভাগ্যবান লোক মশাই আপনি। '' রাগে গা জ্বলে যায় অমিতের।
বলে -''আমি আজ টাটা যাবো অফিসের কাজে। তাড়া আছে। কি বলবেন বলুন। ''
-'' স্টিল তো বিকেলে, প্রচুর সময় এখন।'' অমিত সতর্ক হয়। সে যে স্টিলে যাবে তাও জানে লোকটা।
-''জিনিয়া দেবীর কেসটা রি ওপেন করতে চাইছে আপনার বর্তমান স্ত্রী তানিয়া দেবী। ''
মাথাটা গরম হয়ে যায় অমিতের। তানিয়া থানাতেও চলে গেছিল। মুখে বলে -''ওর মাথায় গণ্ডগোল আছে। আমি কথা বলব ওর সাথে। ওটা একটা এক্সিডেন্ট। ''
-''আপনার স্ত্রীকে ফোন করুন। কথা বলি। ''
-''ওর ফোনটা লাগছে না সকাল থেকে, '' আবার রিং কলে অমিত। আর ওকে অবাক করে ওপারে রিং হয়। ফোনটা পড়েই যাচ্ছিল। এসব কি হচ্ছে আজ!!
ও ধারে তানিয়ার গলা -''বলো... কি হয়েছে?''
-''প..পুলিশ এসেছে বাড়িতে। '' আর কথা খুঁজে পায় না অমিত।
-''ওদের ট্যাঙ্কটা দেখিয়ে দাও। ''
-''ক..কি বলছ?'' তোতলাতে থাকে অমিত।
ফোনটা কেটে যায়।
-'' অফিসার, আমাদের মধ্যে পারিবারিক ঝগড়া চলছে। ওর মাথার ঠিক নেই। তাই হয়তো থানায় গেছিল। প্লিজ, বিলিভ মি। সব ঘরেই অশান্তি হয়.....''
-''আর অশান্তি হলেই বৌকে মেরে ট্যাঙ্কে ফেলে দেয় না কেউ। চলুন ট্যাঙ্কটা দেখে আসি। ''
-''কি বলছেন এসব। এই তো কথা বলল তানিয়া। ট্যাঙ্কে কি দেখবেন আপনি?'' মরিয়া হয়ে চিৎকার করে ওঠে অমিত।
-''আহা, খেপছেন কেন? আসুন ছাদটা ঘুরে আসি, কতদিন বিয়ে হয়েছে আপনাদের? ''
-''ছয় মাস, কেন ?''
-''জিনিয়ার সাথে মোটে দুমাস ছিলেন। তানিয়া তবে লাকি, ছয় মাস একই মহিলার সঙ্গে....''
-''এসব কি যা তা বলছেন আপনি!! তানিয়া আমার স্ত্রী। ''
-'' আর শঙ্খমালা ... আচ্ছা আপনার এখনকার পিএ বনানীকে কেমন লাগে?'' অফিসার ছাদের দরজা খুলতে খুলতে হেসে বলে।
অমিত চুপ। বনানীর ব্যাপারটা খুব গোপনে এগোচ্ছিল। এ সেটাও জানে। আর কিছুই করার নেই। কিন্তু ট্যাঙ্কের ভেতর শুধু একটা গামছা পড়ে আছে। এটা দিয়ে তানিয়াকে জড়িয়েছিল কাল। তবে ভেতরটা ফাঁকা দেখে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল অমিতের। তানিয়া মরেনি। লুকিয়ে থেকে ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু মোবাইল টা? আজকাল অবশ্য অফিসে গিয়ে সিম হারিয়েছে বললে তক্ষুনি নিউ সিম দিয়ে দেয়। ও নতুন ফোন নিয়েছে তবে। এবার যথেষ্ট সেভ খেলবে অমিত।
কনস্টেবলকে ফোন করে ছাদে ডেকে সাঁপুই বলে -''এই গামছাটা এভিডেন্স হিসাবে নিয়ে নাও। ফরেনসিক টিমকে খবর দাও।''
-''এসব কেন ?'' চমকে ওঠে অমিত।
-''একটা ছোট্ট ভিডিও দেখবেন ? নিন, আপনার ফোনেই পাঠালাম। দেখুন ।''
পিং করে মেসেজ ঢোকে। ডাউন লোডিং হচ্ছে ভিডিও। ঘামতে থাকে অমিত।
ডাইনিং রুম, তানিয়ার মাথায় পিতলের ফুলদানি ছুড়ে মারছে অমিত। তানিয়া লুটিয়ে পড়ল। রক্ত পড়ছে কপাল বেয়ে। অমিত ফুলদানিটা ধুয়ে রাখছে। এবার তানিয়ার নাকে হাত দিল। না: পড়ছে না। একটা গামছায় জড়িয়ে ওকে নিয়ে চলল বাড়ির ছাদে, একটা বাড়তি জলের বড় ট্যাঙ্ক রয়েছে। ভেতরে অল্প জল। তানিয়াকে ওর ভেতর রেখে বন্ধ করে দিল।
কিন্তু কে করল ভিডিওটা, ঘরে কে ছিল? কি ভাবে সম্ভব। দু হাতে মাথাটা চেপে ধরে অমিত। কাল রাতে নেশাটা সত্যি বেশি হয়ে গেছিল।
-''চলুন এবার, যা বলবেন থানায় গিয়ে। উকিলকে ডেকে নিতেই পারেন। ''
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অমিত দেখে মুন্নি দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরনে পুলিশের পোশাক। একমাস হল ঠিকা কাজে ঢুকেছিল মেয়েটা।
-''মিস সেন ওয়েল ডান। আপনার ভিডিওটা কোর্টে কাজে লাগবে। তানিয়া দেবীকে আপনি ঠিক সময় উদ্ধার করেছিলেন বলে উনি বেঁচে গেলেন। আর আপনার দিদি শঙ্খের ফাইলটাও ওপেন হবে নতুন করে। ''
-'ষড়যন্ত্র!! সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে আমায় ফাঁসিয়েছে' একটা কথাই বিড়বিড় করে বলতে থাকে অমিত।
লকআপের ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে বসে গাটা কেমন ঘিনঘিন করে ওঠে। প্রায়ান্ধকার ঘরটার মধ্যে হঠাৎ শুনতে পায় কারো নিশ্বাস। আবছা একটা অবয়ব..... শঙ্খ...… বলছে -''আমি দু মাসের প্র্যাগনেন্ট ছিলাম আপনি জানতেন, তাও অমন করতে পারলেন ?''
চোখ কচলে তাকায় অমিত। এ তো চম্পা.... 'বাবুজি, আপ বাপ বননে ওয়ালে থে' ..... দু হাতে কান চেপে ধরে। জিনিয়া.... বিচের ধারে বসে বলছে ..... 'আমাদের মাঝে আসতে চলছে একটা নতুন প্রাণ।'
উফ..... চোখ বন্ধ করে অমিত। সরসর শব্দ হচ্ছে। পা বেয়ে উঠে আসছে একটা শীতল কিছু, হাতের উপর আরেকটা। পেটের কাছে একটা..…. ছোটবেলায় ঠাকুমা বলত সাপের স্বপ্ন দেখলে বংশধর আসে। সাপকে বড্ড ঘেন্না পেত অমিত। কিশোর বয়সে দুটো বাস্তু সাপকে শঙ্খ লাগা অবস্থায় পিটিয়ে মেরেছিল সে একাই।
আজ নিজের যাবতীয় পাপ সাপের মত করে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। গলায় পেঁচিয়ে ধরছে একটা শীতল পিচ্ছিল সরু দড়ির মত কিছু, দম বন্ধ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন