শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

কুষাণ সূর্যর অস্তরাগে


কুষাণ সূর্যর অস্তরাগে
দেবদত্তা বন্দ্যোপাধ্যায়






(১)
তুষার মরশুম প্রায় সমাপ্ত, বসন্ত সমাগত প্রাসাদ প্রাকারে দাঁড়ালে এখনো হিমালয়ের পর্বত সঙ্কুল গিরিবর্তের মাথায় শ্বেতশুভ্র তুষারের প্রলেপ দৃষ্টি গোচর হয় বৃদ্ধ সম্রাট হো-তি সেদিকে দৃষ্টি বিছিয়ে একাকী উদাস নয়নে দণ্ডায়মান আরেকটি শীতের সমাপ্তি সঙ্গীত সমাপনে বসন্ত জাগ্ৰত দ্বারে  অথচ রাজপুত্র হোয়ানের উদ্ধারের কোন পথ নেই গত পাঁচটি তুষার মরশুমের আগে ঘটেছিল সেই লজ্জাজনক ঘটনা ইদানিং মহারাণীর শারীরিক পরিস্থিতি ভালো নয় বৈদ্য বলছেন এবার আর কিছুই করার নেই কুমার হোয়ানের প্রত্যাবর্তন একমাত্র রাণীকে নব জীবন প্রদান করতে পারে একেক সময় সম্রাটের মনে হয় সমগ্ৰ চীনদেশে কি এমন একজন যোদ্ধা নেই যে ঐ অপমানের বদলা নিতে পারবে যে শুধু কুমার হোয়ানকে ফিরিয়ে আনবে তেমন নয় সঙ্গে  উপহার হিসাবে নিয়ে আসবে কুষাণ সম্রাটের মুণ্ডুটা
এই কুষাণ বংশ তো যাযাবর ইউ-চিদের বংশ এই দেশের মাটিতে জন্মেছিল ইউ-চিরাপেশায় যাযাবর ইউ-চিরা  হিউং-ন জাতির আক্রমণে পরাস্ত হয়ে অক্ষুনদীর তীরবর্তী স্থানে চলে গেছিল এরপর যাযাবর বৃত্তি ত্যাগ করে তারা কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হয় ওদের গোষ্ঠী পাঁচটি শাখায় বিভক্ত ছিল--কুই-সাং, কাও-ফু, হি-থুম, চুং-মো ও হিউ-মি কুজুল কদফিস প্রথম এদের সংঘবদ্ধ করেন এরপর তিনি কুষাণদের নেতৃত্ব হাতে নিয়ে প্রথমে হিন্দুকুশ পর্বতের দক্ষিণে পার্থিয়দের পরাস্ত করেন তারপর কাবুল, কান্দাহার, কাশ্মীর, পুরুষপুর প্রভৃতি জয় করে কুষাণ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন তারপর এই সিংহাসনে বসেছিলেন তাঁর পুত্র ভীম কদফিসেস তাঁর পর কনিষ্ক
কুষাণ সম্রাট হিসাবে এশিয়ার এক বিশাল ভূখণ্ড শাসন করে চলেছে এই কনিষ্ক আর্যাবত থেকে তুর্কী স্থান হয়ে কাশগড়, ইয়ারখন্দ, খোটান এসব জয় করেছিল কনিষ্ক সেনাপতি প্যানচাওর আমলে ভীম কদফিসেস পরাজিত হয়েছিল চীনের কাছে, এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জন্য কর দিতে বাধ্য হয়েছিল কিন্তু কনিষ্ক রীতিমতো যুদ্ধ করে ছিনিয়ে নিয়েছিল চীনের বেশ কিছু ভূখণ্ড রেশম পথের বেশ কিছুটা কনিষ্কের দখলে চলে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল চীন অবশেষে সন্ধির পথে হেঁটেছিলেন চীন সম্রাট হো-তে কিন্তু সন্ধির ফলে যে নিজের পুত্রকে জামিন রাখতে হবে একথা ভাবেননি কখনো প্রায় জোর করেই রাজকুমার হোয়ানকে পবন্দী নিয়ে গেছিল কুষাণ সৈন্য
-''সম্রাটের জয় হোক কুষাণ সাম্রাজ্য থেকে আমাদের এক গুপ্তচর সন্দেশ নিয়ে এসেছে '' মন্ত্রীর ডাকে সম্বিত ফেরে সম্রাটের
আর্যাবতের গুপ্তচর শুনে মনের কোণে একটু আশার আলো জ্বলে ওঠে তবে কি কুমার হোয়ানের কোনো খবর এলো এতদিনে সে কি বেঁচে আছে? অবশ্য জামিন হিসাবে পণ বন্দী করে কাউকে নিয়ে গেলে তাকে বাঁচিয়ে রাখাই রীতি
-'' বৌদ্ধভিক্ষুর ছদ্মবেশে আমাদের গুপ্তচর চ্যাং-ওয়া চার বৎসর আর্যাবতে কাটিয়ে কাল প্রত্যাগমন করেছে আপাতত সে অতিথিশালায় বিশ্রামরত সম্রাট আদেশ করলে তাকে এখানে নিয়ে আসতে ইচ্ছুক'' মন্ত্রী নিজের বক্তব্য পেশ করে
-'' আর্যাবতের পথ তো বিপদসংকুল এবং ভয়ানক কষ্টের যদি চ্যাং- ওয়া পথ ক্লান্তি কাটিয়ে ওঠে ওকে আমার সামনে নিয়ে এসো ''
-''পর্যাপ্ত বিশ্রামের পর একটু আগেই সে উঠেছে আদেশ পেলেই তাকে পেশ করা হবে''
-''তবে আর দেরি কেন?'' সম্রাট উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন
একটু পরেই মন্ত্রী গুপ্তচর চ্যাংকে নিয়ে আসে মহলের মন্ত্রণা কক্ষে
 -''সম্রাটের জয় হোক''
-''বলো, তোমায় যে কাজে পাঠানো হয়েছিল তুমি তার কতটা পালন করেছো কি সন্দেশ বয়ে এনেছ তুমি'' মন্ত্রী বলে
-''আমি বৌদ্ধভিক্ষুর বেশে কুষাণ সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছিলাম পুরুষপুর কুষাণ সম্রাটের রাজধানী সম্রাট বৌদ্ধধর্ম গ্ৰহণ করার পর পুরুষপুরে বৌদ্ধধর্মের জয়জয়কার রাজধানীর বুকে তেরো তল বিশিষ্ট এক কাঠের চৈত্য নির্মাণ করেছেন সম্রাট, সারা সাম্রাজ্য জুড়েই স্তূপ, বৌদ্ধ সংঘ, মঠের আধিক্য''
অধৈর্য হয়ে ওঠেন সম্রাট হো-তে বলেন-'' কাজের কথায় এসো গুপ্তচরকুমারকে কি অবস্থায় রাখা হয়েছে? তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য কি ব্যবস্থা গ্ৰহন করা উচিত বলো?''
মাথা নিচু করে গুপ্তচর বলে -''কুমার হোয়ানকে রাখা হয়েছে পুরুষপুরের মহলের ভেতরে রাজ অবরোধে সেখানে সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারে না এমন কি সাধারণ সৈন্যদের প্রবেশাধিকার নেই মহলের ভিতর কিছু নির্বাচিত তুর্কি প্রহরী রয়েছে তাদের কাছ থেকেই এক ওদেশীও সৈন্য মারফত খবর এনেছি কুমার দেশে ফিরতে উদগ্ৰিব আমি পুরুষপুরের নকশা, পাহারার বিবরণ, নিকাশি ব্যবস্থা সব এঁকে এনেছি কিন্তু মাঝে মাঝেই এসব রাজনৈতিক বন্দীদের মহল বদলানো হয় তাই টাটকা খবর ছাড়া এ কাজ বাস্তবিকই খুব কঠিন ''
-''আর অপমানের বদলা? কনিষ্কর মুণ্ডু যে আমার চাই তার কি ব্যবস্থা হবে?'' সম্রাটের এ প্রশ্নে আবার মাথা নিচু করে গুপ্তচর 
-'' গুপ্তহত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা এসব কি বন্ধ হয়ে গেছে কুষাণ সাম্রাজ্যে?'' মন্ত্রী প্রশ্ন করে
-'' সম্রাটের কোনো গুপ্ত শত্রু নেই ও দেশে?'' সম্রাট হো-তে গভীর বিস্ময়ে তাকায় গুপ্তচরের দিকে 
-''পুরুষপুর এবং সমগ্ৰ কুষাণ সাম্রাজ্য সম্রাটকে দেবতা মনে করেএক সঙ্গে সম্রাটকে নাকি দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় এতো বড় সাম্রাজ্যকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ক্ষত্রপ এবং মহা ক্ষত্রপ উপাধিধারী কিছু কর্মী নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে রাজকার্য পরিচালনা করেন সম্রাট  সম্রাট কনিষ্কের প্রধান মন্ত্রী মাথর একজন দক্ষ কূটনীতিক একমাত্র সে ছাড়া কেউ জানে না মহারাজ কোথায় থাকবেনপুরুষপুরে বেশ কয়েকটি মহল রয়েছে সম্রাটের আশ্চর্যর বিষয়, সব মহলেই সম্রাটকে নাকি দেখা যায় এমনকি একই সঙ্গে বাংলার উপকণ্ঠে, কাশ্মীরের পাহাড়ে আবার তুর্কী মুলুকে সম্রাটকে দেখা গিয়েছে এসব রটনা নয় আমি নিজেও সম্রাটকে এক সঙ্গে দু জায়গায় দেখেছি এই অবস্থায় গুপ্ত হত্যা কি করে সম্ভব?''
ভ্রু কুচকে মন্ত্রীর দিকে তাকান সম্রাট দু চোখে হাজার প্রশ্ন
 -'' এই তথ্য আমিও পেয়েছি সম্রাট কনিষ্ক নাকি একাধিক স্থান একসঙ্গে পরিদর্শন করেন এতো বড় সাম্রাজ্যের যে কোনো অংশে দ্রুত পৌঁছে যান তবে অনেক চিন্তা ভাবনার পর আমি একটা যুক্তি খুঁজে পেয়েছি সম্রাটের পরনের পোশাক আর মাথায় শিরস্ত্রাণের ফাঁকে দাঁড়িগোঁফের জঙ্গলটুকুই জনগণ দেখতে পায় সম উচ্চতার বেশ কয়েক জনকে একই পোশাকে ওভাবেই সাজিয়ে বিভিন্ন জায়গায় জনগণের সামনে পরিবেশন করা হয়প্রাচীন কালেও এভাবে সম্রাটদের আড়াল করা হত গুপ্তঘাতকের থেকে পুরুষপুরের সাত মহলা রাজপ্রাসাদের প্রতি মহলে হয়তো সাতজন সম্রাট উপস্থিত, আসল সম্রাট হয়তো তখন সোয়াট অঞ্চলে বা রাঢ় বঙ্গে রয়েছেন গুপ্ত ঘাতকের আক্রমণ এড়াতে এ বহু পুরানো পদ্ধতি '' মন্ত্রী বলে ওঠে
-''তবে উপায়...! আমাদের সম্মান রক্ষার কি  কোনো উপায় নেই?'' সম্রাটের গলায় কাতর আবেদন
-''উপায় নিশ্চই আছে সম্রাট গুপ্তচর, তুমি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দাও সম্রাটের কি নারীসঙ্গ দোষ আছে? আমরা কি এ সুযোগ নিতে পারি? ''
-" না, সম্রাট সংস্কৃতি মনস্ক তবে বদ গুন নেই তিনি ধার্মীক সম্প্রতি কুষাণ সম্রাট নিজেকে দেবপুত্র বলে অভিহিত করেছেন এক মহান বৌদ্ধসংঘতীর অনুষ্ঠিত হয়েছে এবার ঝিলম উপত্যকায় কনিষ্কপুরাতে এই সম্মিলনে সভাপতিত্ব করেছেন বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুমিত্র ও সহ সভাপতি ছিলেন অশ্বঘোষ''
-''পাটলিপুত্র জয়ের পর অশ্বঘোষকে বলপূর্বক পুরুষপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শুনেছিলাম!" মন্ত্রী বলে
-'' হ্যাঁ, তবে কুষাণরাজ গুণির কদর করতে জানেন অশ্বঘোষের কাছেই বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন সম্রাট উনি সসম্মানে রাজসভা অলংকৃত করে বিরাজমান এই বৌদ্ধসংঘতীতে বৌদ্ধধর্ম দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে, হীনযান ও মহাযানহীনযানরা নিরাকার বৌদ্ধ মতে বিশ্বাসী বৌদ্ধের কোনো প্রতিকৃতের চল নেই এদের ভেতর ত্রিপিটকের বাণী এদের আরাধ্য দেবতা আর মহাযানরা বৌদ্ধমূর্তির উপাসক গৌতম বুদ্ধকে দেবতার পর্যায় নিয়ে গেছে এই মহাযানরা বড় বড় পাথর কুঁদে বুদ্ধ মূর্তি তৈরি হচ্ছে কুষাণ সাম্রাজ্যে এমনকি মথুরা নগরীর কাছে সম্রাটের এক বিশাল মূর্তি তৈরি হচ্ছে এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার্থে মথুরায় দ্বিতীয় রাজধানী তৈরি হচ্ছে তিনটি পূর্ণিমা পার করে রাজধানী ও মূর্তির প্রতিষ্ঠা দিবস আসন্ন উৎসব উপলক্ষে মথুরা নগরী সহ সমগ্ৰ আর্যাবত সেজে উঠছে ধীরে ধীরে  দেব জ্ঞানে জনগণ সম্রাটের মূর্তি পূজা করবে এবার থেকে তবে সম্রাট ধর্ম সহিষ্ণু অন্যান্য ধর্মের প্রতি তাঁর উদার নীতি প্রশংসার দাবী রাখে আপনারা তো জানেন স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন রয়েছে কুষাণ সাম্রাজ্যে সেই স্বর্ণ মুদ্রায় গ্ৰিক, হিন্দু, বৌদ্ধ, জোরোস্ট্রীয় বিভিন্ন দেব দেবীর প্রতিকৃত খোদিত থাকছে সম্রাট তো আগেই দেবতা হয়ে গেছেন, তাই ওঁর প্রতিকৃত ও থাকছে শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প সবেতেই এই সাম্রাজ্য  এগিয়ে আচার্য চরকের মতো চিকিৎসক, সুশ্রুতের মত শল্যচিকিৎসক রয়েছেন রাজসভায় "
-''গান্ধার শিল্পরীতিতে বৌদ্ধমূর্তির প্রচলন আমি শুনেছি তবে মথুরায় নতুন রাজধানী ও স্বয়ং সম্রাট কনিষ্কর মূর্তির খবর আমি পাইনি এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক''
 চ্যাং তার জ্ঞানত যা যা জানে বিস্তারিত ভাবে জানায় এছাড়া পুরুষপুর সহ সমগ্ৰ সাম্রাজ্যের গল্প বলে চ্যাং কে বিদায় জানিয়ে মন্ত্রণা কক্ষের দরজা বন্ধ করে গুপ্ত আলোচনা শুরু হয় আরও কিছু গুপ্তচরকে দ্রুত নিয়োগ করা হয় এ কার্যে কনিষ্কর মুণ্ডুর জন্য গোপনে পুরস্কার ঘোষণা করেন সম্রাট হো-তে

() 

মর্মর সোপানের শেষ ধাপ পার করে অলিন্দে দাঁড়িয়ে দূরের হিন্দুকুশ পর্বতের দিকে দৃষ্টি বিছিয়ে নিজের জন্মভূমির কথা ভাবছিল হোয়ান পাঁচ বছর যাবত সে রাজনৈতিক বন্দী হয়ে রয়েছে এই কুষাণ সাম্রাজ্যে পিতা তাকে উদ্ধারের কি ব্যবস্থা নিয়েছেন কে জানে আর কি কখনো দেশে ফিরতে পারবে সে? আজ কতগুলো বছর তার পৃথিবী এই ছোট্ট মহলে সীমাবদ্ধ কয়েকজন রক্ষীর বাইরে মন্ত্রী মাথর আর নগর সেনাপতি জীবমিশ্র ছাড়া আর কারোর মুখ দেখেনি সে একেক সময় মনে হয় নিজের মহান বংশের কলঙ্ক সে একাই রাজকুমার হয়ে এভাবে পাঁচ বছর ধরে শত্রু শিবিরে বন্দী হয়ে থাকার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় পরক্ষণেই মায়ের করুণ মুখটা মনে পড়ে মা হয়তো আজও তার পথ চেয়ে বসে রয়েছে 
জলখাবার দিতে এসেছিল যে প্রহরী তার আচরণ কেমন যেন দুর্বোধ্য লাগছিল কুমারের এতদিন যাবত বন্দী রয়েছে সে, কোনো প্রহরী কথা বলে না এ মহলে এরা গ্ৰিক আর তুর্কী দেশীয় প্রহরী, ভাষা গত একটা ব্যবধান হয়তো রয়েছে কিন্তু আজ প্রথমবার প্রহরীটি খাবার নামিয়ে কেমন ইতস্তত এদিক ওদিক দেখছিল, যেন কিছু বলতে চায় তক্ষুনি আর দুজন প্রহরী এসে ওকে ডেকে নিয়ে যায়  খাবার খেয়ে পাত্রটা নামাতে গিয়ে কুমারের চোখে পড়ল জল ভাণ্ডের গায়ে খুব সূক্ষ্ম করে কিছু লেখা রয়েছে ভালো করে দেখলেন ব্যক্ট্রিক ভাষায় দুটো সংখ্যা নখের আঁচড়ে লেখাটা মুছে দিল হোয়ান তবে মাথায় রয়ে গেলো সংখ্যা দুটো 
মহল অভ্যন্তরে থাকলেও বাইরের কিছু শব্দ কানে আসে হোয়ানের ঢেরা পিটিয়ে রাজ প্রহরী, নগরপাল কত কি জানিয়ে যায় বাইরে কিছু কথা গবাক্ষ দিয়ে বাতাসে উড়ে আসে তার কক্ষে এমনি ঘোষণা থেকে কদিন আগেই হোয়ান জেনেছিল সম্রাট শীঘ্র উত্তর ভারতের দিকে রওনা হবেন মথুরায় তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় রাজধানী নগরী তার সিংহাসনে আপাতত বসবে যুবরাজ হুবিষ্ক এক বড় অশ্বারোহী দল ও উচ্চ পদস্থ সেনা নায়ক সহ সম্রাট মথুরা সহ আর্যাবতের বাকি অধিকৃত অঞ্চল পরিদর্শন করে ফিরবেন মাসাধিক কাল পর হোয়ান জানে সম্রাটের অবর্তমানে রক্ষীদের মধ্যে একটু শিথিলতা আসবে এই সময় যদি সে পালিয়ে যেতে পারত! সর্বদা সে সুযোগ খোঁজে
একবার ঐ পামির গ্ৰন্থী পার হলেই এক ছুটে সে চলে যাবে নিজের দেশে রোজ সেদিকে তাকিয়ে সে ভাবে পামির উপত্যকা পার করতে পারলেই সে মুক্ত
 দুদিন পর দুপুরের খাবার দিতে এসে সেই রক্ষীটি একটা চিরকুট দিয়ে যায় যাতে লেখা রয়েছে দুটো শব্দ যার অর্থ 'আজ রাতে' সহসা সেদিন সকালের সংখ্যা দুটো মনে পড়ে ইয়ানের ও দুটো কি সময় জ্ঞাপন করছে অর্থাৎ রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে কিছু হতে চলেছে 
বৈকালিক রক্ষী বদলের সময় নগর কোটাল খেয়াল করেনি চারজন নতুন রক্ষী আজ বন্দী মহলের দায়িত্বে এসেছে সম্রাটের মথুরা যাত্রা উপলক্ষ বেশ কিছু রদবদল হয়েছে নগরে শেষ কদিনে প্রসিদ্ধ  রেশম পথের পামির অঞ্চলে কিছু বিদ্রোহের খবর পাওয়া গেছিল মন্ত্রী মাথরের কথায় সেনাদের একটি দলকে সেখানে পাঠাতে হয়েছে সম্রাট নগরে নেই, তাই গুপ্ত হত্যা বা ষড়যন্ত্রর ভয় নেই এসময় চীনের রাজকুমার বেশ শান্তশিষ্ট বন্দী একে নিয়ে বিশেষ চিন্তার কিছু নেই রাত্রির প্রথম প্রহরে নগর কোটাল একবার সব ব্যবস্থা দেখে যায় এসে আজ রাতটা সে কাটাবে নগর নটী সাকিনার মহলে এমন সুযোগ খুব কম আসে জীবনে পোশাকে জাফরনী সুগন্ধি ছড়িয়ে একটা বড় অর্ধপ্রস্ফুটিত রক্ত গোলাপ সংগ্ৰহ করে সে রওনা দিতেই কয়েকজন তৎপর হয়ে ওঠে 
রত্নাকর বলে একটি রক্ষীর সদ্য পদোন্নতি হয়েছে , সে একটি বড় মদিরার পাত্র এনেছিল তাই রাত্রির দ্বিপ্রহরে দেখা গেল সব রক্ষীরাই প্রায় বেহুঁশ চারজন রক্ষীর তৎপরতায় মুহূর্তের ভেতর হোয়ান মহলের বাইরে চলে এলো ওর পরনে তখন যবন রমণীদের মতো মুখ ঢাকা পোশাক একটা শকট পাশের অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল এক যবন পুরুষ সেটা নিয়ে এগিয়ে এলো পিছনে আরেক বয়স্ক যবন রমণী, কোলে শিশুপুত্র কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই হোয়ানকে তুলে দেওয়া হল সে শকটে দ্রুত এগিয়ে চলল উষ্ঠ চালিত শকট উত্তরের গোপন পথ দিয়ে তা বেরিয়ে এলো পুরুষপুরের বাইরে দুই মহিলা ও শিশু দেখে কোনো রক্ষী বাধা দেয়নি কিছুটা আসার পর রাতের শেষ প্রহরে শকট চালক বলল সামনের বন পথ পার করে সে চলে যাবে কাবুলের দিকে রাজকুমারকে নামিয়ে দেবে বনের শেষে পামিরের কাছে একজন অপেক্ষা করে রয়েছে কুমারের জন্য একটা শুকনো খাবারের পুটলি দিয়ে কুমারকে নামিয়ে দিয়ে শকট এগিয়ে গেল 

(৩)

ওদিকে উৎসব নগরী মথুরায় তিনদিন সারা রাত ব্যাপী উৎসবের শেষ রাত সম্রাটের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নগর মধ্যে নতুন রাজধানীর ভার যুবরাজের হাতে দিয়ে সম্রাট নিশ্চিন্ত পাঁচ জন মন্ত্রী এবং অন্যান্য সম্মানীয় কূটনৈতিক রাজন্যবর্গ থাকবে মন্ত্রণার জন্য সম্রাট এবার তথাগতর চরণে আত্মনিবেদন করবেন পুরোপুরি বহুবছর তো এত বড় সাম্রাজ্য শক্ত হাতে শাসন করলেন এবার আস্তে আস্তে যুবরাজের হাতে তুলে দিতে হবে শাসনদণ্ড মথুরা সহ উত্তর ও মধ্য ভারতের দায়িত্ব প্রাথমিক ভাবে অর্পণ করে সম্রাট এখন দূর থেকেই লক্ষ্য রাখবেন এই উৎসব উপলক্ষে নগরে প্রচুর বিদেশী সমাগম হয়েছে বেশ কিছু বৌদ্ধ শ্রমণ এসেছে সম্রাটের মূর্তিটি দর্শনেভোর রাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে উঠে বসলেন সম্রাট সম্প্রতি তাঁর যে মূর্তির আবরণ উন্মোচিত হয়েছে কে বা কারা যেন তা টুকরো টুকরো করে ভাঙছে এই মূর্তি স্থাপনে ঘটনায় পরপর বেশ কিছু বাধা এসেছিল প্রথম থেকেই আসলে ভারতীয় হিন্দুরা ঈশ্বরের মূর্তি গড়ে পূজা করে সম্প্রতি মহাযান বৌদ্ধরাও বুদ্ধের মূর্তি পূজা শুরু করেছে, কিন্তু সম্রাটের মূর্তি গড়া নিয়ে অনেকের মনেই দ্বিধা ছিল মূর্তি গড়লে নাকি আয়ু ক্ষয় হয় এমন একটা কথাও উঠে এসেছিল সম্রাটের সুস্থ জীবনের কথা ভেবে বেশ কিছু শুভানুধ্যায়ী বাধা দিয়েছিল কিন্তু সম্রাট কনিষ্ক দেবপুত্র উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পর সবাই মেনেও নিয়েছিল অবশেষে দেবতার মূর্তি প্রতিষ্ঠা হতেই পারে
 কিন্তু নির্বিঘ্নে মূর্তি প্রতিষ্ঠার পর এধরনের স্বপ্নর অর্থ কি হতে পারে! সকালেই দুজন স্বপ্ন বিশারদকে ডেকে পাঠাবেন ভাবলেন সম্রাট
যমুনার ওপর লাল রঙের অরুণাভর আর্বিভাবের সঙ্গে সঙ্গেই পুরুষপুর থেকে মহামন্ত্রী মাথারের দূত এসে পৌঁছল পামিরের ইয়ারখন্দ নদীর কাছে রেশম পথের কিছুটা দখল নিয়ে বিদ্রোহ শুরু হয়েছেউৎসব শেষে বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট সশরীরে গেলেই সবচেয়ে ভালো হয় মন্ত্রীর মতে এতো বড় সাম্রাজ্য কে সুশাসনে রাখতে সম্রাট কনিষ্ক কে এভাবেই ছোটাছুটি করতে হয় আরেকবার নিজের মধ্যে সেই তেজ অনুভব করলেন সম্রাট অসির জোরে এতদিনের এতো বড় সাম্রাজ্যকে রক্ষা করে এসেছেন নিজেই সেনাপতিকে ডেকে দ্রুত সেনা তৈরি করতে বললেন মাত্র সাত হাজার সৈন্য নিয়ে সেদিনই ছুটে চললেন পামিরের অভিমুখে পথে আরও আট হাজার সেনার যোগদানের কথা
 বিতস্তার তীরে স্কন্ধাবার স্থাপন করা হয়েছিল সেদিন অস্তগামী সূর্যের শেষ অরুণিমের ছোঁয়ায় তখন বিতস্তার জল নববধূর সাজে সেজেছে, সেদিকে তাকিয়ে সম্রাটের আবার মনে পড়ল ভোরে দেখা স্বপ্নর কথা এ নিয়ে আর আলোচনা হয়নি কারো সঙ্গে কিন্তু স্বপ্নটা আরও দুবার দেখেছেন সম্রাট, মনের অবচেতনে কি মৃত্যুভয় দানা বাঁধছে! বয়সের সঙ্গে কি এসব চিন্তা ঘিরে ফেলছে তাকে?
 বহু দূর থেকে ধুলো উড়িয়ে দূতকে আসতে দেখে একটু অবাক হলেন মহারাজ পুরুষপুরে কি বিদ্রোহ শুরু হল! আবার দূত কেন? মহামন্ত্রীর শিলমোহর যুক্ত পত্র পাঠের পর মনটা আরও বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল চীনের পনবন্দী রাজকুমার পালিয়ে গেছে বন্দী শালা থেকে সারা নগর এমন কী বাইরের গ্ৰামগুলোও তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে কুমার হোয়ান যেন উবেই গেছে এখন দুদিকেই বিপদ সব শর্ত মেনে চীন যদি পনবন্দী কুমারকে ফেরত চায় কী জবাব দেবে কুষাণ সম্রাট? ওদিকে কুমার যদি কোনোভাবে দেশে ফিরে যায় সম্রাট হো-তে হয়তো সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করবে, ছিনিয়ে নেবে রেশম পথের অধিকার ঐ গিরিবর্তে যুদ্ধ করা সমতলের সৈন্যদের পক্ষে বেশ কঠিন বুকের বা দিকটা কেমন যেন চিনচিনে ব্যথা, কপালে ফুটে ওঠে স্বেদ বিন্দু একটা চাপ চাপ অন্ধকার ছায়া নেমে আসে চোখের সামনে কোমরবন্ধের গায়ে ঝুলন্ত অসি চেপে ধরেন সম্রাট পারতেই হবে এবার তাকে
 পরদিন থেকে পায়ে হেঁটে পাহাড় ভাঙতে হবে টানা দু দিন সম্রাটের দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে না চীনকে ওদের সীমানার ভেতর ঢুকে আটকাতে হবে এবার বুকটা চেপে ধরে উঠে পড়েন মহারাজ জোড়ে শ্বাস নেন কয়েকবার মুক্ত প্রাঙ্গণে বেরিয়ে আসেন অত্যধিক ক্লান্তি থেকেই বোধহয় এমন হচ্ছে আচার্য চরকের দেওয়া একটা ঔষধ পুটলি থেকে একটা ক্লান্তি নাশক বটিকা সেবন করে একটু ধাতস্থ হয়ে ওঠেন ধীরে ধীরে  
সারা রাত তুষারপাতে বিধ্বস্ত সেনারা পরদিন প্রভাতে শুরু হয় তুষার কেটে পথ চলা, দুর্গম এ গিরিবর্তের ওপারেই লুকিয়ে আছে বিদ্রোহীরা সরু গিরিখাত তুষারে আচ্ছাদিত, কোথাও পাশাপাশি দুজন হাঁটা যায় না, সৈন্য বাহিনী নিয়ে এপথে তরুণ কনিষ্ক ছুটে গেছে কয়েকবার কিন্তু এবার বয়স জানান দিচ্ছে বুকে চাপ ধরছে প্রকৃতির অসহযোগিতায় গতি কমে আসছে সেনাপতি মোট দশ হাজার সেনা নিয়ে এগিয়ে গেছে বাকি সেনা সহ সম্রাট চলেছেন পেছনে দু হাজার সেনা সহ এক সেনানায়ক পাহাড়ের গিরিবর্তে খুঁজে বেড়াচ্ছে রাজকুমার হোয়ানকে গুপ্তচরদের কাছে খবর রয়েছে হোয়ান এখনো দেশে ফেরেনি এই পিরপাঞ্জল আর পামিরের সংযোগ স্থলে তাকে দেখা গেছে এখানেই রয়েছে সে
সেদিন রাতে আবার একই স্বপ্ন দেখে এই প্রবল শীতেও ঘেমে স্নান করে উঠলেন সম্রাট তাঁর মূর্তির উপর কার এতো আক্রোশ? তবে কি এতো বড় সাম্রাজ্যের প্রজারা পছন্দ করে না সম্রাটকে? ভয়ে ভক্তি করে? কিন্তু তিনি তো ধর্ম সহিষ্ণু প্রজা প্রতিপালক! তবে কি বিদেশী শত্রু? কিন্তু একটা সামান্য মূর্তি ভাঙার মত নির্বুদ্ধিতা বিদেশী শত্রুর হবে কেন? হুবিষ্ক কে বলে পাহারা বাড়িয়ে দিতে হবে মথুরায় 



(৪)


ঠিক তখনি মথুরার মন্ত্রণা সভায় এক গুপ্ত মন্ত্রণা চলছিল তিনজন মন্ত্রী ও হুবিষ্কর মধ্যে চলছে এক গোপন আলোচনা
 মন্ত্রী শিয়া প্যাং কুষাণদের আরেকটি গোষ্ঠীর নেতা, সে বলে - "দেবত্ব আরোপিত হয়ে সম্রাটের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে ইতিহাসে ওঁর কীর্তির পাশে আপনার কথা কেউ মনেই রাখবে না যুবরাজ ''
মন্ত্রী পিহান বললেন -'' আর্যাবতে এতো সম্রাট রাজত্ব করেছে, সম্রাট অশোকেরও কোথাও মূর্তি নেই ঐ প্রস্তর মূর্তি মৃত্যুর পরেও সম্রাটকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজাদের মনে আপনাকে চিরকাল ঐ মূর্তির পদতলেই রাজত্ব করতে হবে ''
-''এই বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আপনাকে সারাক্ষণ বিদ্রোহ দমনের জন্য ছুটতে হবে একেকটা প্রান্তরে জনগণ ঐ মূর্তিকেই সম্রাট জ্ঞানে মেনে চলবে তাছাড়া আপনি কনিষ্ক পুত্র হিসাবেই পরিচিতি পাবেন '' মন্ত্রী পুষ্কর বলে
-''কিন্তু পিতার বর্তমানে...'' যুবরাজকে চিন্তিত দেখায়
-'' আপনি শুধু সম্মতি দিন মূর্তি ধ্বংস হবে গুপ্ত ঘাতকের হাতে আপনি নিষ্কলঙ্ক থাকবেন আপনার নাম জড়াবে না '' প্রথম মন্ত্রী শিয়া প্যাং বলে
-''একবার চিন্তা করুন যুবরাজ এই মহান বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুজুল কদফিসের মূর্তি তো সম্রাট বানাতে পারতেন কই? তা না করে জীবিত অবস্থায় নিজের মূর্তি!'' মন্ত্রী পুষ্কর বলে
-'' আপনি কি চিরকাল এই মথুরার সিংহাসন নিয়ে ঐ মূর্তির পূজা করেই কাটাবেন ভেবেছেন? সম্রাট আপনাকে শিশু সাজিয়ে রেখেছি এই যে পামিরের বিদ্রোহ দমন... আপনাকে পাঠাতে পারতেন ছোট্ট কাজ অথচ প্রজারা আপনার নামে গুণগান করত কিন্তু সম্রাট নিজে গেলেন কারণ নামের মোহ সম্রাট বিদ্রোহ দমন করেছেন বলবে সবাই একটু ভাবুন যুবরাজ একদিন আপনি বা আমি থাকব না কিন্তু ঐ মূর্তি থেকে যাবে ধ্বংস করুণ নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করুণ''
 মন্ত্রীদের জল্পনায় ধীরে ধীরে কঠিন হয় হুবিষ্ক বলে ওঠে -'' আপনারাই ব্যবস্থা নিন তবে গোপনে এখনি কোনোরকম অভ্যুত্থান আমি চাইছি না মূর্তি ধ্বংস হোক ''
আলো জ্বলে ওঠে তিন মন্ত্রীর মুখে তারা সফল, এবার ধ্বংস হবে মূর্তি দেবপুত্র হওয়ার সাধ ঘুচিয়ে দিতে হবে এরপর ধ্বংস হবে সাম্রাজ্য হুবিষ্ককে সরিয়ে ওরা তিনজন তিনভাগে ভাগ করবে কুষাণ সাম্রাজ্যকে 

(৫)

মথুরায় সম্রাট হো-তের তিন গুপ্তচর রয়েছে সুযোগের প্রতীক্ষায় হোয়ানকে উদ্ধার করার কাজ শুরু হয়ে গেছে এখন সম্রাটের মুণ্ডু সংগ্ৰহ করে দেশে ফেরা মথুরায় কাজটা সহজ হবে ভেবেছিল ওরা উৎসবের মরশুমে প্রহরা শিথিল থাকবে ভেবেছিলকিন্তু উৎসবের পরদিন মহারাজ রওনা হয়ে গেছেন পামিরের বিদ্রোহ দমনের জন্য ঐ পামির অঞ্চলেই লুকিয়ে রয়েছে রাজকুমার হোয়ান সম্রাটের সৈন্য দলে দুজন গুপ্তচর অবশ্য রয়েছে তবুও দুজন রওনা হয়ে যায় পামিরের দিকে হোয়ানকে বাঁচানোই ওদের উদ্দেশ্য 
তৃতীয় জন রয়ে গেছে মথুরায় কি যেন এক গোপন শলা চলছে মথুরা নগরীতে রাতের অন্ধকারে কয়েকদিন যুবরাজের মন্ত্রণা কক্ষে যাচ্ছে কিছু রাজপুরুষ তবে কি কোনো সেনা অভ্যুত্থান হতে চলেছে!
আচ্ছা রাজকুমারের অপমানের বদলায় যদি যুবরাজের মুণ্ডুটা নিয়ে যায় তবে কি সম্রাট হো-তে খুশি হবে! ভবিষ্যৎ সম্রাটের মৃত্যুতে কুষাণ বংশ শেষ হয়ে যাবে! রাতের দ্বিতীয় যামে এসব ভাবতে ভাবতে নগরীর শেষপ্রান্তে গণিকার গৃহ থেকে সরাইখানায় ফিরছিল গুপ্তচর এখানে তার পরিচয় সওদাগর তিব্বত থেকে ভেড়ার লোমের পোশাকের পশরা নিয়ে সে এসেছে
 কৃষ্ণ পক্ষর ম্লান চাঁদের আলোয় মথুরা চকের সামনে আসতেই ঠক ঠক বিজাতীয় আওয়াজে সর্তক হয় গুপ্তচর সামনেই এক চৈত্য কিন্তু মশাল এতো কম কেন? দেওয়াল গিরিও জ্বলছে না আজ!  চৈত্য পার করেই সম্রাটের মূর্তি যা কদিন আগেই স্থাপিত হয়েছে দেবপুত্র কনিষ্কর এ মূর্তির কথা ছড়িয়ে গেছে দেশে বিদেশে প্রতিদিন তা দর্শনার্থে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নগরে সমাগত হচ্ছে হাজার হাজার প্রজা
 কিন্তু পাহারা কোথায়? এই অঞ্চলে তো পাহারা থাকে রোজ!
আর একটু এগিয়েই গুপ্তচরের চোখে ধরা পড়ে দৃশ্যটা সম্রাটের অতবড় পাথরের মূর্তি ধ্বংস করতে উদ্যত কিছু দুষ্কৃত হাত দুটো কেটে ফেলেছে ওরা চিৎকার করতে গিয়েও সাবধান হয়ে ওঠে চৈনিক গুপ্তচর সমূলে উৎপাটিত হয়ে আছড়ে পড়ল অতবড় মূর্তি ঐ তো মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গড়িয়ে এলো
 আচ্ছা, এই শব্দ শুনে কোনো রক্ষী ছুটে আসছে না কেন? চকের কাছেই তো নগরের বিত্তবান শ্রেষ্ঠী ও মন্ত্রীদের গৃহতাদের নিজস্ব রক্ষী রয়েছে কোথায় তারা? এমন শব্দেও কেউ টের পাচ্ছে না
 চকিত তিন দুষ্কৃত পলায়ন করতেই গুপ্তচরের মাথায় একটা বুদ্ধি আসে সামনে গড়িয়ে আসা মস্তকটি তুলে নেয় সে আজ রাতেই শহর ত্যাগ করতে হবে তাকে নেপালয়া হয়ে তিব্বতের ভিতর দিয়ে বৌদ্ধ শ্রমণদের ছদ্মবেশে সে ফিরে যাবে দেশেএ বোধহয় তথাগতর ইচ্ছা, বিনা রক্তপাতে প্রতিজ্ঞা রক্ষা হয়ে যাবে এভাবেই 

(৬)

সকালে বাইরে একটা হট্টগোলে জেগে উঠে দ্রুত স্কন্ধাবারের বাইরে বেরিয়ে এলেন সম্রাট সারারাত তুষারপাতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল শ্বেত শুভ্র এক সেনানায়ক মহারাজকে দেখে এগিয়ে আসে
মাথা নিচু করে বলে -'' কুষাণ সম্রাটের জয় হোক সুপ্রভাত সম্রাট কিন্তু দুটো খারাপ খবর আছে সম্রাট''
চমকে উঠলেন কুষাণ নরেশ হুবিষ্ক ঠিক আছে তো? তার অবর্তমানে গাঙ্গেয় সমভূমি বা পাটলিপুত্রে বিদ্রোহীরা মাথা চারা দেয়নি তো!
 সহ সেনাপতি এগিয়ে আসে মাথা নিচু করে বলে -'' আমরা ক্ষমা প্রার্থী সম্রাট, রাজকুমার হোয়ানকে পাওয়া গেছে তবে জীবিত খুঁজে পাইনি পাশের গিরিবর্তে কাল রাতে তার দেহ পাওয়া গেছে তুষারপাতে ঠাণ্ডায় জমে... আমরা দেহটি সসম্মানে উদ্ধার করে এনেছি এখন করনীয়..?''
-'' দ্বিতীয় খবরটি কি সেনাপতি?''
-'' মথুরায় দু দিন আগে কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারের সুযোগে কিছু দুষ্কৃত 'দেবপুত্র'র মূর্তিটা ধ্বংস করেছে...''
-'' সম্রাট... '' সহ সেনাপতির কথনের মাঝে চিৎকার করে ওঠে আরেক সেনানায়ক জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছেন সম্রাট স্বেদ বিন্দুতে ভরে উঠেছে শরীর দ্রুত তাকে স্কন্ধাবারের ভেতর শয্যায় নিয় যাওয়া হয়
আচার্য চরকের এক উপযুক্ত শিষ্য  মানব সেনাদলটির চিকিৎসক হিসাবে সঙ্গে ছিল সে দ্রুত ছুটে আসে পরীক্ষা করেই বলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন মহারাজ সারাক্ষণ  শুশ্রূষা চলে দ্রুতগামী দূত বেরিয়ে পড়ে আচার্য চরক ও শল্যবিদ সুশ্রুতের উদ্দেশ্যে
 অসময়ে সেদিন গিরিবর্তে তুষারপাত শুরু হয় প্রকৃতি ঢাকা পড়ে বিষাদ চাদরে সারাদিন তুষার পাতে তাপমাত্রা হিমাংঙ্কের নিচে বিকেলেই নেমে আসে রাতের অন্ধকার মশালের নিবু নিবু আলোয় চিকিৎসক মানব নাড়ী ধরে বসে রয়েছে শিবিরে
সম্রাট একবার চোখ খোলেন.. ঘোলাটে দৃষ্টিতে অতি কষ্টে জড়ানো গলায় বলেন -'' ......বি..ষকওও...''
-''খবর পাঠানো হয়েছে যুবরাজকে একটা ভালো রয়েছে সম্রাট প্রধান সেনাপতি অঙ্গদ বিদ্রোহ দমনে সফল হয়েছে আটক হয়েছে বিদ্রোহীরা রেশম পথের অর্ধেক উদ্ধার হয়েছে '' সহ সেনাপতি বলে ওঠে
দু চোখ বুজে যায় ধীরে ধীরে
বাইরে হঠাৎ মেঘ কেটে পশ্চিম আকাশে ঝলসে ওঠে রক্তরাঙা দিবাকর কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখা যায় অস্তগামী সূর্যকে আস্তে আস্তে নাড়ী ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় চিকিৎসক মানব মাথা নাড়ে সেনা নায়কের দিকে চেয়েকুষাণ বংশের উদিত সূর্য অস্তমিত হয় সেখানেই যেই পথ দিয়ে একদা তারা প্রবেশ করেছিল এই ভারত ভূমিতে হুবিষ্ক তখন মথুরায় বসে আসন্ন ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাল রচনায় ব্যস্ত চৈনিক গুপ্তচর  প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে খণ্ডিত মস্তক নিয়ে তিব্বতের পথে ফিরে চলছে 






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে

  বদ্রীনাথের পথে প্রকৃতির টানে মহাপ্রস্থানের পথের খোঁজে প্রকৃতির কোলে দেবদত্তা ব্যানার্জী   একটু শীতলতার খোঁজে   গরমের ছুটির...