বসন্ত এসে
গেছে
(১)
বাড়িটার
সামনে পলাশ ফুলের গাছটা ফুলে ফুলে সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আগুন রাঙা ফুলের ফাঁকে খুব
ভালো করে দেখলে একটা দুটো সবুজ পাতা চোখে পড়তে পারে। গাছের নিচে কমলা
আর কালো রঙের কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছে ঝরে পড়া কিংশুক। গাছটার দিকে তাকিয়ে কত পুরানো
কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ইলোরার। কত গুলো বসন্ত চলে গেছে কিন্তু গাছটা
আজো ফুল দিয়েই চলেছে একই ভাবে।
-"আপনি....!! .... কাউকে খুঁজছেন কি? অনেকক্ষন থেকে এই
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন!! "
আচমকা
প্রশ্নে সম্বিত ভাঙ্গে ইলোরার। প্রশ্ন কর্তা ছিপছিপে লম্বা, এক মাথা কোকরা
চুল আর রিম লেস চশমা পরা এক যুবক। ফুল গাছটা যাদের বাড়ির ভেতর সেই বাড়ি থেকেই
বেরিয়ে এসেছে যুবকটি।
ইলোরা অবশ্য
এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল। বরঞ্চ প্রশ্নটা ওদিক থেকে আসায় ওর কাজটা সহজ হয়ে
গেছিল। ও একটু হেসে বলল -"নমস্কার, আমি ইলোরা, এই
বাড়িতে এর আগে যারা থাকতেন তাদের খোঁজে এসেছিলাম। "
-"কার সাথে কথা বলছিস নীল? কে এসেছে রে? " বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসে এক মহিলার
কন্ঠস্বর।
যুবক সেদিকে
একবার তাকিয়ে বলে -"আসুন , ভেতরে বসে কথা বলি। আমি স্বপ্নীল। "
ইলোরা ওর
সাথে ভেতরে ঢুকে আসে। দশ বছর আগে শেষ বার ঢুকেছিল এই বাড়িতে। অবশ্য এই দশ বছরে
বাড়িটার অনেকটাই বদলে গেছে, দোতলায় দুটো ঘর উঠেছে, সামনের বারান্দাটাকে দেওয়াল দিয়ে ঘিরে বসার ঘর করা হয়েছে। এক সাদার উপর ফুল ছাপ শাড়ি পরিহিতা মহিলা বেরিয়ে এসেছিল।
-"উনি ইলোরা, আর এই আমার মা। '' নীল
পরিচয় করায়।
ইলোরা
ভদ্রমহিলাকে নমস্কার করে বলে -"আসলে আমি এসেছিলাম মন্দিরা কাকিমার খোঁজে। এই
বাড়িতে ওনারা আগে থাকতেন। ওনার ছেলে রোহিত আমার বন্ধু ছিল । আমরা আগে এ পাড়াতেই
থাকতাম। "
ওকে বসতে বলে
ভদ্রমহিলা বলেন -"এই বাড়ি আজ প্রায় পাঁচ বছর হয় আমরা কিনেছি। তখন নীলের বাবা
বেঁচে ছিলেন। উনিই এই বাড়ি কিনেছিলেন লোহিত সেনাপতির কাছ থেকে । শুনেছিলাম ওনার মা
খুব অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য বাইরে নিয়ে যাবে বলে বাড়ি
বিক্রি করেছিল। আমরা তো এর বেশি কিছুই জানি না মা। "
-"বাইরে কোথায় গেছিল কিছু জানেন ?" ইলোরা খরকুটো
আকড়ে ধরার মতো করে জিজ্ঞেস করে।
-"না, তবে আশেপাশের বাড়ির লোকেদের জিজ্ঞেস করতে পারো।
"
এ পাড়ায় বাড়ি
গুলো বড্ড ফাঁকা ফাঁঁকা, এই বাড়িটার দু পাশেই নতুন বাড়ি উঠেছে,
পুরোনো তেমন কেউ নেই । ইলোরা আশাহত হয়। উঠতে গেলে ভদ্রমহিলা বলেন
-"প্রথম এলে, একটু কফি খেয়ে যাও। " জোর করে ওকে
বসিয়ে উনি ভেতরে চলে যান।
-"আপনি হঠাৎ এতদিন পর এভাবে ওনাদের খুঁজছেন ?" নীল
কৌতূহল চাপতে পারে না।
-"আসলে দশ বছর আগে আমরা এ শহর ছেড়ে চলে গেছিলাম। সে সময় সোস্যাল নেট
ওয়ার্কের এত রমরমা ছিল না। মোবাইল ফোনও এত সহজলভ্য ছিল না। আমি তখন সবে কলেজে
ঢুকেছি। নিজের ফোন ছিল না বলেই ওদের সাথে যোগাযোগ ছিল না
তেমন। তারপর যখন খোঁজ করলাম ওরা ততদিনে চলে গেছিল কোথাও। গত মাসে আমি এখানকার
স্কুলে চাকরী নিয়ে এখানে ফিরে এসেছি।পুরানো বন্ধু যে দুএকজন এখানে আছে কারো সাথেই
ওদের যোগাযোগ নেই। আমি সোসাল সাইটেও ওদের খোঁজ করেছি, কিন্তু কোথাও ওদের
পাইনি, ওরা যে কোথায় হারিয়ে গেলো জানি না।" ইলোরা ধীরে
ধীরে বলে।একটা শূন্যতা ওর চোখে মুখে ফুটে ওঠে।
-'' ওনারা তো অন্য কোথাও চলে গেছেন। সেখানেই চাকরী নিয়ে অথবা....."
নীলের কথার মধ্যেই ওর মা কফি নিয়ে আসনে। আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ইলোরা ফিরে
আসে।
(২)
ইলোরা রোজ
ফেসবুক আর টুইটারে রোহিতের খোঁজ করে। পুরানো কত বন্ধুকে খুঁজে পায় । কিন্তু ওদের
খবর পায় না। রোহিতের দাদাকেও পায় না কোথাও। বহুদিন পর সেদিন ফেসবুকে অতীনকে
পেয়েছিল হঠাৎ। ও হায়দ্রাবাদে থাকে। ও বলেছিল লোহিতদাও ওখানে থাকে । এক দু বার দেখা
হয়েছিল ওর সাথে। ইলোরা বারবার করে ওকে বলে একটু রোহিতের খোঁজ নিতে।
কিন্তু
অতীনের সাথে আর দেখা হয়নি লোহিত দার। প্রনব বলেছিল ও রোহিতকে দু বার কলকাতায়
দেখেছে। কথা হয়নি তেমন। পাড়া থেকে যে টুকু খবর ইলোরা জোগাড় করেছিল কাকিমার ব্রেন
টিউমার ধরা পড়েছিল। অপারেশনের জন্য অনেক টাকার দরকার ছিল। সে সময় বাড়ি বিক্রি করে
লোহিতদা ওদের নিয়ে যায় সাউথ ইন্ডিয়ায় , নিজের কাছে। এরপর ওদের খবর কেউ জানে
না।
রাতে ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল ইলোরা। সামনেই হুগলী নদী, হাওয়ায় একটা
ভেজা ভেজা ভাব।এই নদী দুই কিশোর কিশোরীর অভিমান, বন্ধুত্ব ,ভালবাসার সাক্ষী। নদীর সিঁড়িতে বসে কত অলস বিকেল কেটেছে গল্প করে। কত কথা
মনে পড়ে ইলোরার। মন্দিরা কাকিমার কাছে গান শিখতে যেত সে। রোহিত ওর থেকে এক ক্লাস
উপরে পড়ত। এই শহরে নতুন এসেছিল ওরা তখন। সহজেই বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল ওদের। এরপর হাসি
আনন্দ খুনসুটির মধ্যে দিয়েই কেটে গেছিল চারটে বছর।
প্রতি বছর
কাকিমার বাড়িতে ঐ পলাশ গাছের নিচে হত বসন্ত উৎসব, নাচে, গানে, কবিতায় বসন্তের রেশ ছড়িয়ে পড়ত মনের কোনে। সেবার বসন্তের শুরুতে এই ফুলে ঢাকা পলাশ গাছের নিচেই প্রথম
বার ইলোরার মনে হয়েছিল রোহিতের মত বন্ধুর হাত ধরা যায় সারা জীবনের জন্য।
কিন্তু মনের গোপন কথাটা লজ্জায় আর খুলে বলতে পারেনি রোহিতকে। এরপরেই হঠাৎ করে বাবার
বদলীতে শহর ছেড়ে ওরা চলে গেছিল শিলিগুড়ি। যাওয়ার আগের
তিনদিন দেখাই করেনি রোহিত। সেই অভিমানে ও আর রোহিতের সাথে যোগাযোগ
করে ওঠেনি। আসলে তখন তো ও বোঝেনি যে রোহিত এভাবে হারিয়ে যাবে !!
দশ বছর
অনেকটা সময় , ইলোরা ভাবে হয়তো রোহিত তার কথা ভুলেই
গেছে!! হয়তো আজ সে সংসারী, বৌ বাচ্চা নিয়ে এক সুখী গৃহকোন
রচনা করেছে। শান্তিতে জীবন কাটাচ্ছে। রোহিত তো কোনোদিন বলেনি সে অপেক্ষা করবে
ইলোরার জন্য। ইলোরার ভালো বন্ধু ছিল একসময়, কিন্তু কোনো
অঙ্গীকার করেনি কখনো। হয়তো সেদিনের সেই কিশোরীর কথা আজ আর মনেই নেই ওর।
সেদিন নিজের
পুরানো ইংরেজী সারের সাথে দেখা হয়েছিল বাজারে। দু চারটে সৌজন্য মুলক কথায় রোহিতের
কথা উঠে এসেছিল। সার নিজেই বললেন -"বড় ভালো ছিল ছেলেটা, কি যে হয়ে গেলো
পরিবারটার, বড় ছেলেটা জোর করে বাড়িটা বিক্রি করে নিয়ে গেলো ওদের।
কিন্তু পরে শুনেছিলাম ও সব টাকা নিয়ে মা আর ভাইকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। খুব কষ্টে ছিল
ওরা। "
ইলোরা বলে
-"কোথায় ছিল ওরা? এখন কোথায় থাকে?"
-"পাঁচ বছর আগে চেন্নাইতে ছিল কিছুদিন। আমার ছেলেও চেন্নাইতে ছিল সে সময়।
খুব আর্থিক কষ্টে ছিল। তারপর জানি না। "
ইলোরা আবার
রাস্তা হারিয়ে ফেলে।
(৩)
সারা রাতের
যুদ্ধে বিদ্ধস্ত বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রয়েছে মধ্য চল্লিসের বসুধা। মুখে
লেগে রয়েছে পরিতৃপ্তীর হাসি। বিতান আস্তে আস্তে উঠে পড়ে। বসুধার নগ্ন শরীরটা চাদরে
ঢেকে পাশের বাথরুমে ঢোকে। ঘড়িতে ভোর সারে পাঁচটা। রাত্রি জাগরণের রেশ চোখের কোনে।
শাওয়ারটা চালিয়ে অনেকক্ষণ ধরে তার নিচে দাঁড়িয়ে ক্লান্তি কাটাতে চায় বিতান। শরীর
ঠান্ডা হলেও মনের ক্লান্তি এতে কাটতে চায় না। বাথরুমে হাজারটা প্রসাধনের উপকরণ।
ভালো করে স্নান করে বিতান সাদা টাওয়েলে নিজেকে মুড়ে বেডরুমে ফেরে। বসুধা তখনো
ঘুমাচ্ছে। চাদর সরে গিয়ে ওর শরীরের উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। বিতান দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।
পাশের ছোট ঘরটায় ঢুকে নিজের জামা কাপড় পরে পার্সটা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে আসে। একবার
মনে হয় বসুধা কি জেগে ঘুমের ভান করছে!! ঘড়িতে সাড়ে ছটা। বিতান দরজাটা টেনে বেরিয়ে
যায়। দরজা লক হয়ে যায় ভেতর থেকে। একটু পরেই ওকে দেখা যায় বড় রাস্তার ধারে একটা
দোকানে ভাঁঁড়ের চা এ চুমুক দিতে। সাতটা নাগাদ বিতান একটা বাসে উঠে পড়ে।
বাউল মনের
সামনে যখন নামে ঘড়িতে সাড়ে আটটা। আজ ডাঃ বাসুর সাথে ওর দেখা করার কথা। আরো তিনজন
ওর মতো এসে বসে রয়েছে। শহরের বাইরে এই ছোট্ট মানসিক হাসপাতালটা বেশ পরিস্কার ও
ভালো। আবাসিকদের খুব যত্নে রাখে এরা। খুব ভালো চিকিৎসা হয় এখানে। দু বছর ধরে মা কে
এখানেই রেখে চিকিৎসা করাচ্ছে বিতান। এখন মা অনেক সুস্থ। অত বড় ধাক্কাটা কাটিয়ে
ওঠার পর মায়ের মাথাটা পুরো খারাপ হয়ে গেছিল।
ডাঃ বাসু
জানালেন ওর মা এখন অনেকটাই সুস্থ। এবার ওনাকে ও বাড়ি নিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সব সময় ওনার সাথে কাউকে থাকতে হবে। একা থাকলেই অবসাদ আসবে। ওনাকে আনন্দে
রাখতে হবে।
বিতান ভাবে
সে কিভাবে সময় দেবে!! তার কাজের কোনো ঠিক নেই। অনেক সময় বাইরেও যেতে হয় ট্যুরে।
ডাঃ বাসুকে বলে সে অসুবিধার কথা। উনি বলেন সে ক্ষেত্রে একটা নার্স বা আয়া রাখতে
হবে সাথে। কিন্তু বাড়িতে না গেলে উনি সুস্থ হবেন না। হাসপাতালে
বেশিদিন থাকলে এমনিতেই অবসাদ আসে। ওনার একটা শর্ট টাইম মেমরি লস হয়েছে। মাথায় একটা
বড় অপারেশনের ধকল রয়েছে। সব মিলিয়ে উনি একটু ঘেঁটেই আছেন। প্রয়োজনে ডাঃবাসু একটা দেখাশোনার
মেয়ে দিতেই পারেন।
বিতান এক
সপ্তাহের সময় চেয়ে নেয়। মায়ের কাছে যেতেই মাও ব্যাস্ত হয়ে ওঠে বাড়ি যাওয়ার জন্য।
বিতান মাকে বলে পরের সপ্তাহেই বাড়ি নিয়ে যাবে।
ওখান থেকে বেরোতেই দুপুর হয়ে যায়। একটা হোটেলে খেয়ে
বিতান সোজা নিজের ছোট এককামরার ফ্ল্যাটটায় আসে। পাঁচ তলার ছাদের উপর চারদিক খোলা
ফ্ল্যাটটা ওর ভীষণ পছন্দ। কিন্তু মা কে ও কোথায় নিয়ে রাখবে
ভেবে পায় না।এখানে মা থাকতে পারবে না। মা বাড়ি বলতে নিজের বাড়িই ভাবছে। হঠাৎ মোবাইলটা
সশব্দে নিজের উপস্থিতি নিয়ে নড়েচড়ে ওঠে। পর্দায় ফুটে ওঠে রিদ্ধিমার নাম। ফোনটা নিতেই
হবে। বিতানের খুব ক্লান্ত লাগে। ভেবেছিল আজ পুরো দিনটা ছুটি নেবে। কিন্তু টাকার
এখন খুব দরকার। মা আসলে আবার ছুটি নিতে হবে। আয়ার জন্য টাকা চাই।
বিতান ফোনটা তুলে ধরতেই ও পাশ থেকে অভিযোগ ভেসে আসে।
দু মিনিটে কাজের কথা বলে ফোনটা সে ছুড়ে দেয় বিছানায়। ফ্যানটা ফুল করে জামা কাপড়
ছেড়ে শুয়ে পড়ে খাটে।ঠিক পাঁচটায় পরের এপোয়েনমেন্ট।
কতক্ষণ এভাবে
শুয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ মনে হল ছাদের দিকের জানালার কোনায় একটা নীল ছায়া, ফ্যানের হাওয়ায়
পর্দাটা উড়ছে। ভালো করে তাকাতেই চট করে সরে গেলো দুটো কাজল কালো চোখ। সিঁঁড়িতে
পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই বিতান উঠে বসে, শরীরে একটাও সুতো
নেই। বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ছ ফুট মেদ হীন ছিপছিপে জিম করা শরীর,
ফর্সা গায়ের রঙ, এক মাথা কালো চুল , বড় বড় দুটো চোখ , এমন একটা চেহারার আশেপাশে এই বয়সে
মেয়েরা ঘুরঘুর করবেই। কিন্তু বিতানের ভাগ্যটাই খারাপ। একেক সময় ইচ্ছা করে আয়নাটা
ভেঙ্গে ঐ কাঁচ দিয়েই নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে। ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ যে রক্ত ক্ষরণ
চলছে তা একমাত্র সেই দেখতে পায়। বাথরুমে ঢুকে প্রচুর সময় নিয়ে স্নান করে বিতান।
ব্লু জিনস আর ব্ল্যাক টি শার্ট পরে পায়ে সাদা স্নিকার পরে সারা গায়ে পারফিউম
ছড়িয়ে একটু পরেই নিচে নেমে যায় সে। চার তলার 402 ফ্ল্যাটের দরজার আই হোল দিয়ে কাজল কালো চোখ দুটো যে ওই
সেকেন্ড কটা দম বন্ধ করে থাকে বিতান জানে। উল্টোদিকের ফুটপাত থেকে ওলায় ওঠার সময় নীল
চুরিদারকে বারান্দায় দেখতে পায় বিতান।
(৪)
ফেসবুকে
ইলোরার এক নতুন বন্ধু হয়েছে মেঘলা মন। খুব সুন্দর গল্প লেখে মন। ও
ছেলে না মেয়ে ইলোরা জানে না। তবে ওর লেখা গুলো বড্ড অন্য রকম। মন কেমন করে পড়লে।
খুব কম চ্যাট বক্সে আসে মেঘলা মন।
ওর গল্পে
ছেলেরা প্রাধান্য পায়। বাস্তব জীবনের গল্প লেখে ও। ওর শেষ গল্পটা পড়েই বন্ধুত্ব
করেছিল ইলোরা। নিজের সাথে গল্প গুলোর বেশ একটা মিল পায় সে।
হঠাৎ দেখে
নতুন বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠিয়েছে স্বপ্নীল। ছেলেটার সাথে সেদিন হাওড়া স্টেশনে দেখা
হয়েছিল। ও টুকটাক খবর জোগাড় করেছে কিছু। লোহিতদা সত্যি ঠকিয়েছিল রোহিত আর
কাকিমাকে। তারপর ওরা কলকাতায় ফিরেও আসে। কিন্তু বন্ধু বা আত্মীয় দের সাথে তেমন
যোগাযোগ করেনি ওরা। ও এগুলোর খোঁজ নিয়েছিল।
ইলোরা
অনুরোধটা রাখতেই চ্যাট বক্সে উড়ে আসে স্মাইলির সাথে ধন্যবাদ। টুকটাক কথা চলছিল।
নীল একটা ফটো চেয়েছিল রোহিতের। দশ বছর আগে মোবাইলের সাথে সবে ক্যামেরা আসছে। কথায়
কথায় ফটো তোলার চল তখন ছিল না। সেলফি কথাটার জন্মই হয়নি তখন।
ও খুঁজে
দেখবে বলেছিল।
বসন্ত উৎসবে
মন্দিরা কাকিমার বাড়ি ফাংশন হত। এছাড়া রবীন্দ্র জয়ন্তী তেও উৎসব হত। তার কয়েকটা ফটো
ছিল ইলোরার কাছে। অনেক খুঁজে রোহিতের একটা হলুদ বাটিকের পাঞ্জাবী পরা ফটো পেয়েছিল
সে। নীল বলেছিল সোসাল সাইটে ফটোটা দিয়ে খোঁজ করতে। কিন্তু ইলোরা দিতে পারে নি।
কারন আজ যদি রোহিত বিবাহিত হয় !! হয়তো ও সংসার করছে কারো সাথে।ওর বৌ এসব দেখলে কি
ভাববে!!
দু দিন পর
সিটি সেন্টারে হঠাৎ দেখা হয়েছিল নীলের সঙ্গে। ছেলেটা একটু গায়ে পড়া, ইলোরা এড়িয়ে
যেতে গিয়েও পারে না। দু জন এক পথেই ফিরবে। অবশ্য সময়টা ভালোই কাটে ওর সাথে।
নীলের
অনুরোধেই রোহিতের ছবিটা স্ক্যান করে ওকে পাঠিয়েছিল ইলোরা। পুরানো দু চারজন
বন্ধুরা তো কোনো খবর দিতে পারেনি। নীল যদি কিছু খবর দেয়। ওর মায়ের ডাকে
আরো একদিন গেছিল ওদের বাড়ি। নীল ঠিক কি চাকরী করে ইলোরা জানে না। সফটওয়্যার
ইঞ্জিনিয়ার শুনেছিল।ওর ব্যাপারে বেশি আগ্ৰহ ইলোরা দেখাতে চায় না। বরঞ্চ নীল নিজেই
ওকে সাহায্য করে চলেছে নিজের আগ্ৰহে।
ইলোরার আজকাল
বড্ড একা একা লাগে। কয়েক মাস হলো সে এখানে। বাবা মা শিলিগুড়ির বাড়ি ছেড়ে আসতে
চায়নি। বাবা ওর খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু বাবাকেও ও রোহিতের কথা বলতে পারেনি। দশটা
বছর দেরি করা উচিত হয়নি। আরো আগেই ইলোরার উচিত ছিল ওর খোঁজ করা। কিন্তু কিভাবে
এগোবে ভেবে পায়নি।
(৫)
একটা বাজে
স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেছিল রোহিতের। আজকাল নিজেকে বড্ড ক্লান্ত লাগে। বাবা মারা
যেতে মা এর গানের টিউশন আর জমানো টাকায় মোটামুটি ভালোই চলছিল। হঠাৎ করে মায়ের
ব্রেণ টিউমার ধরা পড়েই জীবনটা বদলে গেছিল। দাদা লোহিত ছুটে এসেছিল খবর পেয়ে।
রাতারাতি বাড়ি বিক্রি করে সব টাকা নিজের আ্যকাউন্টে নিয়ে মায়ের চিকিৎসার জন্য ওদের
নিজের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। মাকে রোহিত রাজি করিয়েছিল। দাদা তখন চেন্নাইতে একটা
চাকরী করছিল।
অবশেষে মাকে
নিয়ে দাদার বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেছিল ওরা। ওদের চেন্নাই স্টেশনে বসিয়ে গাড়ি
ডাকার নাম করে দাদা সেই যে চলে গেছিল আর আসেনি। অনেক থানা পুলিশ করেও
দাদাকে ধরতে পারেনি ওরা। আসলে না ছিল পরিচিতি, না ছিলো মাথা গোজার জায়গা। ভাষাটাও
জানতো না ওরা। মা অতবড় ধাক্কাটা নিতে পারেনি। মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছিল। হাতের অল্প
টাকা প্রায় শেষের পথে। বাধ্য হয়ে কলকাতা ফিরেছিল রোহিত
মাকে নিয়ে। চিকিৎসা আর হয়নি। আত্মীয় বন্ধুরাও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সেদিন। অনেক কষ্টে
হাওড়ার এক এঁদোগলিতে একটা এক কামরার ঘরে মা কে এনে তুলেছিল সে। বছর পঁচিশের ছেলেটা
রাতারাতি অভিজ্ঞ হয়ে গেছিল। চাকরীর বাজার সম্পর্কে ধারণা ছিল
আগেই। একটা শপিং মলে কাজ পেয়েছিল অনেক কষ্টে। কিন্তু ঐ চাকরীতে মায়ের চিকিৎসা করাতে
পারছিল না। ছুটিও পেত না একদম। ওদিকে মা এর অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছিল। পাগলের মতো
টাকার চিন্তায় পথে পথে ঘুরেছে। প্রয়োজনে সেদিন যে কোনো অন্ধকারে ঝাপাতে রাজি ছিল
সে।
অবশেষে পথ
খুঁজে পেয়েছিল ও। মাকে যে সারিয়ে তুলতে পেরেছিল এটাই ওর কাছে অনেক। পুরানো কারোর সাথেই আজ আর যোগাযোগ নেই। আসলে বিপদে যাদের
পাশে পায়নি তাদের ভুলতেই চেয়েছিল রোহিত।
মাঝে মাঝে
শুধু পলাশ গাছটার কথা খুব মনে পড়ে। দু বার দূর থেকে দেখেও এসেছে বাড়িটা। প্রতিবছর
ফুলে ফুলে সেজে ওঠে গাছটা বসন্তের আগমনে। শুধু ওর জীবনটাই থমকে গেছে। সেই
ধুসর জীবনে নেই কোনো রঙের ছোঁওয়া।
ফোনটা বেজে
উঠে ওর চিন্তা জাল ছিন্ন করে। বিকেলে একটা কাজ আছে। মায়ের জন্য এখন অনেক টাকার
দরকার। আরো বেশি করে কাজ করে যেতেই হবে চুপচাপ।
ফেসবুকেই
বহুদিন পর ইলোরাকে খুঁজে পেয়েছিল হঠাৎ করেই। এত গুলো বসন্ত পার করে আরো সুন্দর
হয়েছে মেয়েটা। রোহিতের ফেসবুকে ছবি বা নাম কোনোটাই নেই। ইলোরা ওকে চিনতে পারবে না
কখনো। তবে ইলোরা উত্তর পাড়া এসেছে দেখে অবাক হয়েছিল রোহিত। ও
যে রোহিতকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর ওয়ালের পোষ্ট পড়েই বোঝা যায়। অনেক পুরানো বন্ধুর
সাথে যোগাযোগ হয়েছিল ইলোরার। রোহিত শুধু নিরব দর্শক।
ওর আর ইলোরার
পথ কয়েক বছর আগেই আলাদা হয়ে গেছিল। আর ইলোরার জীবনে সে প্রবেশ করতে চায় না। ইলোরা
ভালো থাকুক দূর থেকে সে এটুকুই চায় শুধু। ধরা সে আর কোনো ভাবেই দেবে না। দশ বছর পর
হঠাৎ করে ইলোরা কেনো এখানে এল এটাই প্রশ্ন। তাদের ঠিকানা জানত ও। কখনো চিঠি
লেখেনি। যোগাযোগের কোনো চেষ্টাই করেনি কখনো!!
আবার ফোনটা
বাজছে। আজকাল ফোনটার উপর বড্ড রাগ হয়। যখন তখন বেজে উঠছে। ওকে শান্তিতে থাকতেই
দেবে না একটু।
(৬)
বালিতে গঙ্গার ধারে বাড়িটা পেয়ে গেছিল বিতান। ডাঃ
বাসু একটা মেয়েকে দিয়েছিলেন। প্রথমে এই অল্প বয়সের মেয়ে বিতানের পছন্দ ছিল না। ও
বয়স্ক লোক খুঁজছিল। কিন্তু মায়ের নাকি নিতাকেই পছন্দ। হাসপাতালে ও ছিল মায়ের
প্রাইভেট আয়া। মেয়েটার বাবা মা নেই। দাদার সংসারে আগাছার মতো পড়েছিল। ওর একটা থাকা
খাওয়ার কাজ দরকার ছিল। ডাঃ বাসু বলেছিলেন খুব অসুবিধা হলে উনি বদলে দেবেন। নতুন
বাড়ি দেখে মা অবশ্য কিছুই বলে নি। একটা বড় ভার নেমে গেছিল বিতানের। নিতাই সবটা
সামলেছিল।
বিতান মা কে বলেছিল তার অফিস মায়ের চিকিৎসায় এত টাকা
দিয়েছে তাই তাকে ডবল ডিউটি করতে হয়। দু তিনদিন পর বাড়ি আসতো ও। নিতা মা কে যত্নেই
রেখেছিল।
বিতান চাইত না পুরানো বন্ধুদের সাথে ওর দেখা হোক।
ট্রেন লাইনটা ও এড়িয়ে চলত। আসলে বিতানের দুনিয়া আলাদা। বসুধা, রিদ্ধিমা,
পরমা এদের দুনিয়ায় ওর পরিচয় অন্যরকম, এই ছেলেটাকে
কেউ চেনে না। খ্যাতি ও অর্থের
উচ্চ শিখরে বসেও ওরা নিঃসঙ্গ। ওদের সঙ্গ দিতে হয় বিতানদের মত ছেলেদের। রিদ্ধিমার সাথে সিসিটুতে গিয়ে হঠাৎ
দেখা হয়ে গেছিল এক বন্ধুর সাথে। আবার সেদিন সিসিওয়ানে বসুধাকে নিয়ে গেছিল , হঠাৎ
দেখে ইলোরা একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরছে। ইলোরা অবশ্য ওকে দেখেনি। মনটা কেমন বিস্বাদ
হয়ে গেছিল সেদিন।
এই পেশায় যার হাত ধরে এসেছিল সে শিখিয়েছিল এই দুনিয়ায়
কেউ কারো না। মন জিনিসটাকে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে এ পথে আসতে হবে।
এই দু বছর অক্ষরে অক্ষরে গুরুর কথা মেনে চলেছে বিতান।
পামেলা খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল ওর উপর। ঠিক সময় সুতো কেটে বেরিয়ে এসেছিল বিতান।
পামেলা আত্মহত্যা করেছিল গভীর অবসাদে। প্রথম কিছুদিন নিজেকে দোষী মনে হলেও কাটিয়ে
উঠেছিল সে। কিন্তু ইলোরাকে দেখার পর সব কেমন উল্টো পাল্টা লাগছিল।
লেখালেখির অভ্যাসটা ছোটর থেকেই ছিল বিতানের। আগে
কবিতা লিখতো। তবে আজকাল কবিতা আসে না, শুধুই নিরস গদ্য।
লেখা গুলো চিৎকার করে বিদ্রোহ করতে চায়।
মেঘলা মন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে ফেসবুকের পাতায়। সেখানেও
ইলোরার আনা গোনা।
(৭)
রোহিত লোহিতের ঠিকানা পেয়েছিল। কিন্তু ততদিনে লোহিত সর্বশান্ত।
ওকেও ঠকিয়ে শোধ তুলেছে বিধাতা। ওর সব বিশ্বাসের মুল্য চুকিয়ে ওর একাউন্ট ফাঁকা
করে ওর বৌ পালিয়ে গেছিল। রোহিত সব জেনেছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু কোনো করুণা হয়নি
দাদার প্রতি। যোগাযোগ করেনি আর।নিজের সত্বাটাই যে চুরি গেছিল ওর। মা কে নিয়েই ওর
চিন্তা ছিল। মা ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে, তাই ও আর কিছু
করে নি।
আজকাল আর নিজের পেশার প্রতি সৎ থাকতে পারছে না বিতান।
লেখার প্রতিও একটা অনিহা এসেছে মেঘলা মনের। আসলে মনের গোপন কুঠুরিতে যে ইচ্ছার
চারা গাছটা অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল হঠাৎ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পরমা ওকে নিয়ে
মন্দারমনি গেছিল দু দিনের জন্য। করপোরেট জগতে পরমা রাশভারী আর গম্ভীর একজন ডায়রেক্টর, কিন্তু
সেই পরমাই বিতানের কাছে একটা আদুরে বেড়ালের মত। যে সময়টুকু বিতানের সাথে কাটায়
সবটা উশুল করে নেয়। বিতানও নিজের সবটুকু উজার করে দিয়ে এসেছে এতদিন। কিন্তু এইবার
নিজেকে একটা রোবট মনে হচ্ছে। জীবনটাই বড্ড যান্ত্রিক।
সেদিন সাউথ সিটিতে একজন নতুন ক্লাইন্টের সঙ্গে গেছিল
।ওখানেই আবার দেখেছিল ইলোরাকে ঐ ছেলেটার সাথে। রাতে চ্যাট বক্সে ইলোরাকে জিজ্ঞেস
করেছিল তার জীবনে স্পেশাল কেউ আছে কি না। ইলোরা না বলে দিয়েছে। সব মেয়েরাই কি এমন
হয়!!
বসুধা বিরক্ত হয়। বলে -"আজ কার কথা ভাবছো এতো?দিন
দিন বড্ড বদলে যাচ্ছো তুমি !!"
বিতানে মেকি হাসি ফুটিয়ে তোলে
মুখে। বসুধাকে টেনে নেয় নিজের দিকে। কিন্তু আবার সব কেমন গুলিয়ে যায়। কিছুতেই
পারেনা ইলোরাকে মন থেকে সরাতে। এই নিয়ে তিনদিন ফেল করল সে।
পেমেন্টের খামটা আগেই পেয়ে গেছিল। জামা কাপড় পরে যখন
বেরিয়ে আসবে বসুধা এসে দাঁড়ায়, সাদা নেটের হাউস কোটে ওকে সর্গের
অপ্সরা মনে হচ্ছে। চোখ সরিয়ে নেয় বিতান। জুতোটা পরতে যেতেই বসুধা ওকে আকর্ষন করে
নিজের দিকে। ওর ঠোঁঁটের কাছে বসুধার
গোলাপের পাপরীর মত ভেজা ঠোঁট। ও চোখ বন্ধ করে। কয়েক সেকেন্ড.... বসুধা ছেড়ে দিতেই দরজায়
হাত রাখে বিতান। বসুধা আরেকটা খাম এগিয়ে দেয় । বলে -"আজকের পর তুমি এ পথে
থেকো না। এটা রাখো ।"
-"পেমেন্ট তো আগেই দিয়েছেন
।..." ও হকচকিয়ে যায়।
-"এটা পেমেন্ট নয়। তোমায় ভালবেসে
দিলাম। তোমার চোখ বলছে তুমিও কাউকে ভালোবাসো। ঘর বাঁধো এবার। "
দরজাটা বন্ধ করে দেয় বসুধা।
(৮)
ইলোরার মন ভালো নেই। এর মধ্যে দুদিন গেছিল নীলদের
বাড়ি। ওর মা ডেকেছিল। মন্দিরা কাকিমার অপারেশন কলকাতায় পিজিতেই হয়েছিল খবর পেয়েছেন
ওনারা। তারপরের খবর আর কেউ জানে না।
নীলকেও আজকাল বড্ড গায়ে পড়া মনে হচ্ছে। রোহিতের ব্যাপারে ওর এই অযাচিত সাহায্য
করা... নানা রকম পরামর্শ......
ছিঃ ছিঃ এসব কি ভাবছে ইলোরা!! নিজেকে ধমক দেয়। নীল
খুব ভদ্র ছেলে। কলকাতা পুলিশে ওর নাকি ভালো পরিচিতি ও খাতির আছে।
তাই অনেক সুবিধা ওর। ইলোরা এই শহরে একা আছে শুনে একটু সাহায্যই তো করছে। রোহিতের কথা
ভাবতে ভাবতে বড্ড স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে ইলোরা।
ফেসবুকে মেঘলা মন কে অন দেখে চ্যাট বক্স খোলে ইলোরা।
মনের নতুন গল্পটা বড্ড দুঃখের, পড়তে পড়তে চোখে জল এসে গেছিল। এই
প্রথম কোনো মেয়ের গল্প লিখছে মন। আজ ইলোরা প্রশ্নটা করেই ফেলে যে ও ছেলে না মেয়ে?
-"মনের কি জেন্ডার হয় ? মনের বয়স হয় না, লিঙ্গ হয় না। মন শুধুই মন।"
একটা স্মাইলী উড়ে আসে।
-"তবুও জানতে মন চায় যে মেঘলা
মনের মালিকটি কে ?" ইলোরা আবার
প্রশ্ন করে।
-"মনে করো তোমার বন্ধু। "
-''বন্ধু বলেই তো বন্ধু বৃত্তে রয়েছো।
কিন্তু ভারচুয়েল জগতের বাইরে তোমায় জানতে মন চায়। " ইলোরা মরিয়া হয়ে ওঠে।
-"সেটা বোধহয় না জানাই ভালো।
তোমার যে বন্ধুকে খুঁজছিলে তার খোঁজ পেলে ?'' মন কথা ঘোরায়।
-''না, কেউ যদি
ইচ্ছা করে হারিয়ে যায়, লুকিয়ে থাকতে চায় , তাকে পাওয়া যায় না। "
-"হয়তো সে হারিয়েছে কোনো অন্ধ
গলিতে, হয়তো সে পরিচয় দেওয়ার মতো নয়, হয়তো
সে আলোয় আসতে ভয় পায় ...'' মন উত্তর দেয়।
-" 'হয়তো'-এই
হয়তো শব্দটাই ভীষণ বাজে। "
একটা রাগের ছবি পাঠায় ইলোরা।
পাশেই নীলের চ্যাট বক্সটা
খোলে। পরের দিন দেখা করতে চাইছে নীল। ইলোরা জানায় সে ব্যস্ত। সময় করে জানাবে।
মন অফ হয়ে গেছে। ইলোরা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
ফ্ল্যাটটা গঙ্গার ধারে। নিজস্ব ঘাট রয়েছে। ছলাৎ ছলাৎ করে জল ভাঙ্গছে ঘাটের সিঁড়িতে, জোয়ার
আসছে। মনটা হঠাৎ বিষন্ন হয়ে ওঠে।'হয়তো' শব্দটা আঘাত করতে থাকে মাথার ভেতর।
বাবা ফোন করেছিল। কবে বাড়ি যাবে জানতে চাইছিল। ইলোরার
একেক সময় মনে হয় বাড়ি ফিরে সেই ছোটবেলার মত বাবার বুকে মাথা রেখে যদি একটু কাঁদতে
পারত , বেশ হাল্কা লাগত। সে কি সত্যি কখনো রোহিতকে খুঁজে পাবে!!
ঘুমের মধ্যে ছোটবেলায় ফিরে গেছিল ইলোরা। দু জনে গঙ্গার ঘাটে বসে ঝগড়া করছে, খুনসুটি
করছে। সাইকেলের রডে বসিয়ে ইলোরাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে রোহিত।
ইলোরা পলাশ ফুল কুড়াচ্ছিল মালা
গাঁঁথবে বলে। ফুলের ঝুড়িটা নিয়ে রোহিত ছুটে পালিয়েছে। মন্দিরা কাকিমা গান শেখাচ্ছে ওদের। দু জনে কোরাসে
গাইছে-" সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে
ফুলডোরে
বাঁধা ঝুলনায় ..."
ফোনের রিং টোনে গানটা বাজছিল। উঠে পড়ে ইলোরা। ভোরের
নরম রোদ জানালা গলে ওর ঘরে লুটিয়ে পড়েছে।
(৯)
'সংসারটাকে বাঁচাতে বৃষ্টি একদিন এই পথে নেমেছিল। আজ
বোনের বিয়ে দিয়েছে। মা এখন অনেক সুস্থ, ভাই চাকরী
পেয়েছে। মা চায় বৃষ্টির বিয়ে দিতে। সমুদ্র অনেক দিন ধরেই চাইছে বিয়েটা করতে।
কিন্তু বৃষ্টি বিয়ে করতেই চায় না। সমুদ্র সব জানলে ওকে ঘেন্না করবে বৃষ্টি জানে।
ওর ভয় সেটা নয়। বৃষ্টি ভয় পায় মা জানলে কি হবে!!
প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করে জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে
পারছিল না বৃষ্টি। ভাই বোনের পড়ার খরচ, মায়ের চিকিৎসা,
বাড়ি ভাড়া, মেয়েটা আর পারছিল না। বাধ্য
হয়েছিল একটা উপরি ইনকামের জন্য এ পথে আসতে। প্রচুর ভদ্র বাড়ির মেয়ে আদিম পেশার সাথে যুক্ত হয়ে সংসার
চালাচ্ছিল। অনেকে শখেই আসে এ পথে। আজ বৃষ্টির মাথা গোজার জায়গা রয়েছে, মা
ভাই বোনকে ভালো জীবন দিতে পেরেছে। এ সবের বিনিময়ে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করেছে।
বিয়ে করে সুখের, নিরাপত্তার জীবন ওর জন্য নয়। শুধু কিশোর
বেলার একটা ধুসর স্মৃতি মাঝে মাঝে বৃষ্টির মনের কোনে উঁকি দেয়। একজনের কথা খুব মনে
পড়ে। কিন্তু আজ সে খ্যাতির শিখরে। সেখান থেকে নিচে তাকালেও কিছুই দেখা যায় না।
বৃষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। '
-এতটা লিখেই বিতান ভাবতে বসে। এরপর বৃষ্টির
কি হবে? কোথায় যাবে? বৃষ্টি
কি পারবে এই জীবন থেকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে?
প্রশ্ন গুলো যে তার নিজের জীবনের সাথেও জড়িত। যতই
বসুধা বলুক আর সাহায্য করুক সে ফিরতে চাইলেই কি ফিরতে পারবে ? সমাজ
কি তাকে গ্ৰহন করবে? মাথাটা কেমন গুলিয়ে ওঠে বিতানের। ফোনটা
আজ দু দিন পর খুলেছে। 56 টা মিস কল। গুরুর ফোন তেরোটা।
বিতান ভাবে ব্যাঙ্কে যা আছে আর এই ফ্ল্যাটটা বিক্রি
করে যা পাবে তা দিয়ে মা ছেলের জীবন কি কাটবে? একটা ছোট ব্যবসা
যদি শুরু করে !!
নিতা চা জলখাবার নিয়ে এসেছে। মেয়েটা বড্ড চটপটে। একটু
লাজুক, মা ওকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে এই কয়েকদিনে। কাল মেয়েটা বিকেলে
বাজারে গেছিল তখন মা ওকে এসে বলেছিল নিজের ইচ্ছার কথা। মেয়েটাকে ছেলের বৌ করে নিতে
চাইছে মা। বিতান ভাবে মা এর চিন্তা ধারা কত সহজ সরল। ও হেসে এড়িয়ে গেছিল। কিন্তু
বেশিদিন মাকে এভাবে আটকে রাখা যাবে না।
আজ গল্পের পরের অংশটুকু লিখে পোষ্ট করতেই হবে। দু দিন
হল সে পোষ্ট দেয়নি। ইনবক্সে কত মেসেজ। একেক সময় মনে হয় ফোনটা হারিয়ে গেলে বেশ হয়।
এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এটাই।
হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে, রিদ্ধিমার
ফোন। আজ দেখা করতেই হবে। মেয়েটা খেপে উঠেছে। ওর বর ওকে একদম সময় দেয় না। অফিস ট্যুর
আর পার্টি। সন্তান নেই ওদের। টাকার পাহাড়ে বসে এই ব্যর্থ জীবনের দীর্ঘশ্বাস ফেলে
রিদ্ধিমা। বিতানের কাছে কেঁদে হাল্কা হয়। ওর বর জানে ওর এই লাইফের কথা। একবার একটা
রেষ্টুরেন্টে দেখা হয়ে গিয়েছিল সামনা সামনি। নিজের পিএর সাথে ঘনিষ্ঠ মিঃ সিনহা
নিজের বৌকে পর পুরুষের সাথে দেখেও পাত্তা দেয়নি। রিদ্ধিমা বিতানের কাছে একটা
সন্তান চেয়েছিল। কিন্তু বিতানদের এথিক্সের বাইরে এসব। গুরু বলেই দিয়েছিল এসবে
জড়াতে না। বিতান ওকে বুঝিয়েছিল এই ঐহ্যিক জীবনে কেনো আবার আরেক জনকে জড়ানো!! সে ও
তো বাবার ভালবাসা পাবে না কখনো। এভাবে একটা প্রাণকে আনার কোনো যুক্তি নেই।
বিতান উঠে পড়ে। আজ রিদ্ধিমার সাথেও শেষ বার দেখা
করবে। গল্পটার বাকি টুকু পোষ্ট করে স্নানে চলে যায়।
(১০)
দোতলার খোলা ছাদে এসে
দাঁড়িয়েছিল নীল। বসন্ত শেষের পথে। একটা দুটো করে পলাশ খসে পড়তে পড়তে গাছটা নেড়া
হয়ে এসেছে। বাগানের ফুল গুলোও শুকিয়ে এসেছে।
চারদিকে একটা বিষন্নতার ছোঁওয়া।
ইলোরার চোখ দুটো মনে পড়ে, সেখানেও
বিষন্নতার ছায়া!! এই কয়দিনেই মেয়েটা মনের কোনে জায়গা করে নিয়েছে । নীল জানে না ওর খোঁজার শেষ কোথায়। কিন্তু সারা জীবন ওর
খোঁজার সঙ্গী হতে মন চায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ইলোরার জন্য খোঁজ খবর নিয়ে চলেছে।
কিন্তু ও জানে ইলোরার মন প্রাণ জুড়ে একজনই রয়েছে।
তবুও অবুঝ মন বোঝে না।
নীলের মাঝে মাঝে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। ভাবে ইলোরা
কি ওকেও খুঁজবে এভাবেই?
হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। আজকাল ফোন
বাজলেই মনের কোনে একটা অজানা ভয় উঁকি দেয়। হাতটা কেঁপে ওঠে ফোনটা ধরতে গিয়ে। মনের
মধ্যে এক অন্য রকম দোলাচল।
ফোনের কথা শেষ করে অনেক্ষণ একাই অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল
নীল।যে খবর গুলো ওর ইনভেষ্টিগেশনে উঠে এসেছিল পর পর গুছিয়ে নিচ্ছিল। ইলোরার মুখটা
বার বার মনে পড়ছে।
মেয়েটা কিন্তু বড্ড ভালবাসে রোহিতকে। এদিকে মা ও বড্ড
ভালবেসে ফেলেছে মেয়েটাকে। মনের মধ্যে একটা দন্ধ চলতে থাকে নীলের।
একবার ভাবে ইলোরাকেই সবটা খুলে বলবে। ও নিজেই বেছে
নিক নিজের পথ। কিন্তু যদি ইলোরা মুখ ঘুরিয়ে নেয় !! এটাই ভয় পায় ও!!
(১০)
মেঘলা মনের লেখাটা পড়ে চুপ করে বসেছিল ইলোরা। কোথায়
যেন একটা সুক্ষ মিল।
বৃষ্টি কি করবে এখন। সমুদ্রকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ।
কিন্তু সেদিন একটা মিটিং এ আচমকা দেখা পৃথিবীর সাথে। না, পৃথিবী
ওকে চিনতে পারেনি। পনেরো বছরের রোগা দুই বেনি দুলানো কিশোরীর সাথে আজকের স্টেপ কাট
চুল, ফর্সা, সুন্দরী, স্মার্ট বৃষ্টির কোনো মিল নেই শুধু নামটা ছাড়া। অবশ্য পৃথিবী ও বদলে
গেছে। সেই রোগা ছেলেটা আজ করপোরেট জগতে একটা গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় আছে। বৃষ্টিকে ওর
বস পৃথিবীর ঘনিষ্ঠ হতে বলেছে। অনেক খবর বার করে আনতে হবে। এই কাজ বৃষ্টি আগেও
করেছে। ওর নতুন কনসাইনমেন্ট এটাই।
বৃষ্টিরো কেমন জেদ চেপে গেছিল। পৃথিবী কে দেখে । একটা
বার ওর মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছিল। আজ অবশেষে সেই দিন এসেছে। হোটেলের নীলচে আলোয়
পানীয়ের গ্লাস হাতে বৃষ্টি আর পৃথিবী পাশাপাশি, কাছাকাছি।
এখানেই শেষ করেছে মন। পরের পর্বে গল্প শেষ করবে বলেছে। অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসেছিল
ইলোরা। মনকে ম্যাসেজ করেছে। কোথায় যেন বৃষ্টির জন্য কষ্ট হচ্ছে। ওকে জিতিয়ে দিতে
ইচ্ছা করছে। মন কি ভাবছে, কে জানে !!
হঠাৎ পিং করে আওয়াজ চ্যাট বক্সে। নীল আবার দেখা করতে
চায়। এই ছেলেটাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ও। বন্ধুর মতো মিশলেও ওর চোখেও মাঝেমাঝে
ইলোরা একটা অন্য ছবি দেখতে পায়। তবে ওর সাহায্যেই হয়তো রোহিতের খোঁজ পাবে ইলোরার
মন বলে। পরদিন ও একটা রেষ্টুরেন্টে দেখা করবে বলে জানায়।
মন আজ আর অন লাইনে আসবে না মনে হয়। ইলোরা গল্পটা সম্পর্কে নিজের মতামত
জানায়। বৃষ্টি পরিস্থিতির শিকার। ওকে জিতিয়ে দিতে অনুরোধ করে। পৃথিবীর সাথে
বৃষ্টির মিল দেখতে চায়। বার বার অনুরোধ করে বৃষ্টিকে ওর ভালবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।
পরদিন নীলের সাথে পার্কষ্ট্রিটের একটা রেষ্টুরেন্টে
বসেছিলো ইলোরা। নীল বলছিল একটা হেরে যাওয়া ছেলের গল্প। শূন্য থেকে শুরু করে এক মা
কে নতুন জীবন দেওয়ার গল্প। একটা ছেলের জীবন যুদ্ধের গল্প। একটা ছেলের অন্ধকার
দুনিয়ায় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলার গল্প। বিতানের গল্প। এক পতিত পুরুষে গল্প।
ইলোরা কফির কাপটা চামচ দিয়ে নেড়েই চলেছে। কফি জল হয়ে
গেছে ততক্ষণে। নীল ওয়েটারকে ডেকে নতুন করে কফি দিতে বলে। সময় নিক মেয়েটা। একটা বড়
যুদ্ধ চলছে ওর ভেতর। ওর ভবিষ্যত ওকেই বেছে নিতে হবে। নীল না হয় অপেক্ষা করবে।
মেখলা মনের প্রোফাইল ঘেঁঁটেই নীল পেয়েছিল বিতানের খোঁজ। ওর পেশায় এটা সহজ কাজ। কিন্তু বাকি চমকটার জন্য ও
প্রস্তুত ছিল না।
(১১)
আজ গল্পের শেষটা লিখবে মেঘলা মন। ইনবক্সে প্রচুর
অনুরোধ। বেশির ভাগ চেয়েছে বৃষ্টিকে সমুদ্রের সাথে বিয়ে দিয়ে নিরাপত্তার জীবন দিয়ে জিতিয়ে দিতে। কেউ কেউ ওকে নিরুদ্দেশে
পাঠিয়েছে। কেউ আবার ওকে হারিয়ে দিয়ে ঘুমের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কয়েকজন বিদ্রোহ করেছে
বৃষ্টির হয়ে। কেউ এক্সিডেন্ট ঘটিয়েছে বৃষ্টি
আর পৃথিবীর গাড়ির।
ইলোরার ম্যাসেজে চোখ আটকে যায় মনের। লিখেছে
-"আমি যদি পৃথিবী হতাম বৃষ্টিকে বুকে টেনে নিতাম। পৃথিবীর তো প্রথমেই
বৃষ্টিকে চেনা উচিত ছিল। প্রথম প্রেম কি কেউ ভুলতে পারে? বৃষ্টিকে যদি পৃথিবী না বোঝে তাহলে এ গল্প ব্যার্থ।
ব্যার্থ ওদের ভালোবাসা। "
চোখে জল এসে যায় বিতানের। মেঘলা মন বৃষ্টি হয়ে ঝরে
পড়ে শেষবারের মতো। কলিং বেলের আওয়াজে সম্বিত ফেরে। ওর ঘরে তো কেউ কখনো আসে না।
চারতলার একটা মেয়ে ওকে লুকিয়ে দেখে ও জানে। ঘরে তো কখনো আসে না। অবাক হয় বিতান।
ঘড়িতে রাত আটটা। আবার অসহিষ্ণু কলিংবেল বেজে ওঠে।
দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিতান। ইলোরাকে এখানে
এভাবে দেখবে ভাবেনি কখনো। ও কি স্বপ্ন দেখছে? ইলোরার পিছনে ঐ
ছেলেটাকে দেখে আরো অবাক লাগে। ইলোরা ঘরে ঢুকে পড়েছে ততক্ষণে।
মেঘলা মন নামটা ইলোরাই বলেছিল
নীলকে কে। আসলে মন ছেলে না মেয়ে জানতে
আগ্ৰহী ছিল সে।নীল লালবাজারের সাইবার ক্রাইম বিভাগে কাজ করে শুনে কথায় কথায় একদিন দেখিয়েছিল প্রোফাইলটা
ওকে। আসলে রোহিতকে নানারকম ভাবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় খুঁঁজছিল নীলের সাহায্যে। আর সেখান
থেকেই....
ওদিকে ইলোরার দেওয়া ফটোটা অদ্ভুত ভাবে মিলে গেছিল এক জিগলোর সাথে। আর মেখলা মনের প্রোফাইলের আইপি এড্রেস খুঁজে
নীল পেয়েছিল বিতানের ঠিকানা, ফোন নম্বর, কিন্তু
সিমটা আবার রোহিত সেনাপতির নামে।
বাকিটা ওর কাছে খুব সোজা ছিল। লালবাজারের সাইবার ক্রাইম বিভাগে স্বপ্নীল একজন সফল অফিসার।
যদিও কাজটা ও ব্যাক্তিগত ভাবেই করেছিল।
ইলোরা তখনো চারদিকে তাকিয়ে দেখছে অবাক চোখে। দশ বছর, অনেকটা
সময়!!
ওর রোহিতকে এভাবে খুঁজে পাবে ভাবে নি কখনো। ওর দু
চোখে অভিমান, দুঃখ, রাগ,
ক্ষোভ আর ভালোবাসার এক অন্যরকম রামধনু। রোহিত কোনো কথা খুঁজে পায়
না। পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে।
নীল আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিয়ে নীচে নেমে আসে।ওদের একটু
একা থাকা দরকার। দশ বছরের হিসেব মেলাচ্ছে মেয়েটা, অনেক
ঝড় জল পার করে পৌঁছেচে এই ঠিকানায়। আজ আর নীলের জন্য কেউ অপেক্ষা করে নেই। তার পথ এখানেই শেষ না
শুরু, সময়ই বলবে সে কথা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন